

সরকার সংকট নেই বললেও জ্বালানি তেল কিনতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ভোক্তাদের। এরই মধ্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম এক ধাক্কায় প্রতি কেজিতে বাড়ল ৩২ টাকা ৩০ পয়সা। এতে বাসাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা থেকে ৩৮৭ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা হয়েছে।
দাম এক লাফে এতটা বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের খরচের চাপ বাড়বে। সেইসঙ্গে রয়েছে বাজারে বাড়তি দামের বোঝা। কারণ যে দামই নির্ধারণ করা হোক না কেন, ভোক্তাদের কিনতে হয় তার চেয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে। গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন এ মূল্য ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), যা আজ সন্ধ্যা থেকে কার্যকর হবে। বিইআরসি বলেছে, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে এপ্রিল মাসের জন্য এ দর ঠিক করা হয়েছে।
বিইআরসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কোনো পর্যায়ে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিক মূল্যে এলপিজি/অটোগ্যাস বিক্রি করা যাবে না।
কিন্তু বাজারে বাড়তি দামে কিনতে হওয়ায় ভোক্তাদের হতাশা বেড়েই চলেছে। বারবার বিষয়টি আলোচনায় এলেও বাড়তি এ খরচের হাত থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছেন না ভোক্তারা। তদারকি অভিযান চললেও বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি থামছে না।
রাজধানীর কদমতলী এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম। বেসরকারি চাকরির সীমিত আয়ের টাকায় হিসাব করে সংসার চলে তার। এর মধ্যে রান্নায় দরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের পেছনে ব্যয় অন্যতম। কিন্তু এই ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। একদিকে সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য বাড়ছে, অপরদিকে বাজারে অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে।
কথা হলে সাইফুল বলেন, ‘এতদিন নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। অথচ বাজারে কিনতে হয়েছে ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের চেয়ে আমাকে ৩০০ টাকার বেশি খরচ করতে হয়েছে। এখন আবার নির্ধারিত দাম ৩৮৭ টাকা বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ বাজারের বাড়তি খরচসহ আমার খরচ ৬৮৭ টাকা বেড়ে যাবে।’
একই এলাকার অটোরিকশাচালক মো. কাশেম মোল্লা বলেন, ‘রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের বাজারের এই অনিয়মের কারণে আমাদের বাড়তি খরচের বোঝা বইতে হচ্ছে। আমার মতো সীমিত আয়ের ভোক্তারা বাজারে জিম্মি হয়ে আছে। দীর্ঘদিন এ অনিয়ম চললেও আমরা এ থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি না।’
কথা হলে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘রান্নায় ব্যবহৃত এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও নমনীয় হওয়া উচিত। কারণ এক লাফে দাম এতটা বাড়লে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের খরচের বোঝা অত্যধিক বেড়ে যায়। তাদের টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে দাম নির্ধারণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নির্ধারিত মূল্য কীভাবে কার্যকর হবে, সেজন্য কঠোর পদক্ষেপ থাকতে হবে। কিছুদিন পরপর যে অভিযান চালানো হয়, তা কাজে আসছে না। এ জন্য প্রয়োজন বাজারের প্রতিটি ধাপে নিবিড় মনিটরিং।’
এর আগে ফেব্রুয়ারির শুরুতে ১২ কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। এরপর এলপিজির আমদানি শুল্ক কমানোর পর ২৪ ফেব্রুয়ারি দাম সমন্বয় করে ১৫ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৩৪১ টাকা করা হয়।
বিইআরসি বলছে, এখন থেকে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৪৪ টাকা ৪ পয়সা। এই হিসাবে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত হবে।
সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা এলপিজির সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির (অটোগ্যাস) দাম প্রতি লিটার ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে দাম ছিল ৬১ টাকা ৮৩ পয়সা।
মার্চে ১২ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৯৭ টাকা, যা এপ্রিলে বেড়ে ১ হাজার ৮০১ টাকা হয়েছে। ৫ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৬১৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭৯২ টাকা হয়েছে। বড় সিলিন্ডারগুলোর দামও একই হারে বেড়েছে। রেটিকুলেটেড পদ্ধতিতে সরবরাহ করা বেসরকারি এলপিজির দামও বেড়েছে। তরল অবস্থায় প্রতি কেজির দাম মার্চের ১০৭ টাকা ৯৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা ২৯ পয়সা করা হয়েছে। গ্যাসীয় অবস্থায় প্রতি ঘনমিটারের দাম ২৩৯ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩১১ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। আর প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম মার্চের ৬১ টাকা ৮৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে এপ্রিলের জন্য ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা করা হয়েছে।