

মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস তৈরিতে নেওয়া ‘স্ট্রেংদেনিং রিডিং হ্যাবিট অ্যান্ড রিডিং স্কিলস অ্যামাঙ্গ সেকেন্ডারি স্টুডেন্ট’ কর্মসূচি শুরুর সাত বছর পরও লবডঙ্কা অবস্থা। এ সময়ে শুধু বই বিতরণ করেই শিকেয় তুলে রাখা ছিল পুরো প্রকল্প। এরপর মেয়াদ বেড়েছে আরও তিনবার। শেষবার চার মাসের জন্য বাড়া মেয়াদের বাকি তিন মাসেই অবশিষ্ট প্রায় ৭৩ কোটি টাকা খরচ করে কর্মসূচিটি শেষ করতে শুরু হয়েছে তোড়জোড়। এই টাকা খরচ করার রূপরেখাও তৈরি হয়েছে এরই মধ্যে। ২০১৯ সালে ৭২৮ কোটি টাকায় নেওয়া কর্মসূচি ছয় বছরে অগ্রগতি ছিল যৎসামান্য। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফা বাড়িয়ে ১৭৪ কোটি টাকায় আনা হয়। এ যাত্রায় ১০১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা খরচের পর বাকি ৭৩ কোটি টাকা খরচে তৃতীয় দফায় তিন মাসের জন্য বাড়ানো হয় মেয়াদ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে কর্মসূচি সাত বছরেও শেষ করা সম্ভব হয়নি, যেটা তিন মাসে শেষ করা কতটা যৌক্তিক। এ সময়ে তাড়াহুড়ো করে বই পড়ুয়াদের পরীক্ষা নিয়ে তাদের পুরস্কার দেওয়াসহ অন্যান্য কাজ করতে গেলে জগাখিচুড়ি অবস্থা তৈরি হবে। যদি কর্মসূচিটি পরিকল্পিতভাবে সমাপ্ত করা না হয়, তাহলে কর্মসূচির মোট ১৭৪ কোটি টাকাই জলে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি ৭২৮ কোটি ৭ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয়ের এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়। কর্মসূচির মাধ্যমে ২০২৩ সালের শেষদিকে দেশের ৩০০ উপজেলার ১৫ হাজার ৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২৫ লাখ শিক্ষার্থীর মন ও মনন সমৃদ্ধ হবে—এমন ৮৮টি করে ৩০ লাখ ৮০ হাজার বই বিতরণ করা হয়। শিক্ষার্থীরা এসব বই পড়ার পর বইগুলো থেকে পরীক্ষা নিয়ে প্রণোদনামূলক পুরস্কার দেওয়ার কথা। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আওতাধীন এই কর্মসূচির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই বছর চুক্তিতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কাজ শুরু করে। তবে এক বছর পর সেই চুক্তি বাতিল করা হয়। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই কর্মসূচি ছিল, সেই প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক সংগঠক হিসেবে কাজ করেন।
সূত্র জানায়, এই কর্মসূচির মাধ্যমে ৪৭ কোটি ২১ লাখ টাকা খরচ করে নির্বাচিত বইগুলো বিতরণ করা হয়। কিন্তু বই বিতরণের পর থমকে যায় গোটা কর্মসূচি। পরিচালকদের গাফিলতি আর অদক্ষতাসহ নানাবিধ কারণে শিক্ষার্থীদের বইগুলো পড়া শেষে পরীক্ষা কিংবা তাদের পুরস্কৃত করা হয়নি। এমনকি যেসব শিক্ষক সংগঠক হিসেবে এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাদের দেওয়া হয়নি সম্মানীও। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই বিতরণ ছাড়া কর্মসূচির আর কোনো কাজই হয়নি।
কর্মসূচির সর্বশেষ অগ্রগতি : কর্মসূচি সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথম দফায় ২০২৩ সালের ৩০ জুন কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হয়। তবে ওই সময়ে সব কাজ শেষ না হওয়ায় তা আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়। এই সাড়ে ৬ বছরে বরাদ্দকৃত ৭২৮ কোটি ৭ লাখ ৩১ হাজার টাকার মধ্যে খরচ হয়েছে মাত্র ১০১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এই টাকার মধ্যে ৪৭ কোটি ২১ লাখ টাকার বই কেনার বাইরে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে এক বছরের জন্য দেওয়া হয় ৪৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। বাকি ৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে কর্মসূচির কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা ও অফিসের সরঞ্জামসহ আনুষঙ্গিক খাতে। সর্বশেষ গত অর্থবছরেও এই কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ ছিল ৯০ কোটি ১ লাখ ৯১ হাজার টাকা। কিন্তু খরচ হয়েছিল মাত্র ১ কোটি ৯৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, যা কর্মসূচির কর্মকর্তাদের পেছনেই ব্যয় হয়েছে।
এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, দ্বিতীয় দফায় কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গত বছরের জুলাই মাসে আরেক দফা দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু কর্মসূচিটি পর্যালোচনা করে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি মাত্র চার মাসের জন্য মেয়াদ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। অর্থাৎ আগামী ৩০ জুনের মধ্যে কর্মসূচির মেয়াদ শেষ করার নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে কর্মসূচির বরাদ্দ ৭২৮ কোটি ৭ লাখ ৩১ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১৭৪ কোটি ২৮ লাখ ৬৫ হাজার আনা হয়। এর মধ্যে আগের দুই মেয়াদে ১০১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা খরচের পর বাকি থাকা প্রায় ৭৩ কোটি টাকা এই সময়ের মধ্যে খরচ করে এই কর্মসূচি শেষ করতে হবে।
৩ মাসে ৭৩ কোটি টাকা খরচের রূপরেখা
কর্মসূচিটির অবশিষ্ট টাকা খরচ করার জন্য এরই মধ্যে একটি রূপরেখা তৈরি করেছেন কর্মসূচি সংশ্লিষ্টরা। সূত্র বলছেন, এই ৭৩ কোটি টাকার মধ্যে বই পড়া শেষে পুরস্কারের ২ লাখ ২৫ হাজার কপি বই কেনার জন্য ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা ও ব্যাগ কেনার জন্য ৯ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা, সংগঠকের সম্মানী ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা, তিন মাসের জন্য একজন কনসালটেন্টের জন্য ১২ লাখ টাকা খরচ করা হবে। বাকি টাকা পরীক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়া ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
কর্মসূচির এক কর্মকর্তা বলেন, পুরস্কারে কোন বই দেওয়া হবে, তা বাছাই করার জন্য একটি কমিটি করা হবে। এরই মধ্যে সার্চ কমিটির মাধ্যমে কাদের এই বাছাই কমিটিতে রাখা হবে, তার একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই কমিটি অনুমোদনের পর তারা পুরস্কারের বইয়ের তালিকা দিলেই বই কেনা হবে। পুরস্কারের বই ও ব্যাগ কেনা হলে পরীক্ষা নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।
কর্মসূচির বই বাছাই করা হয়েছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়
শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য যে ৮৮টি বই বিতরণ করা হয়েছিল, তার অধিকাংশই কেনা হয়েছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়। বইয়ের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসব বইয়ের মধ্যে ২০টির মতো বই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট। বাকি বইগুলোর মধ্যেও অধিকাংশ বই মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের মন ও মনন উপযোগী নয়।
কয়েকজন সংগঠক বলেন, মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের পড়ার জন্য যে বই দেওয়া হয়েছে, তা তাদের মনন উপযোগী নয়। এখানে অনেক বই আছে, যা গবেষক কিংবা সিরিয়াস পাঠক ছাড়াও অন্যরা পড়তে আগ্রহী নন। আবার রাজনৈতিক বইগুলোও শিক্ষার্থীরা পড়তে চায় না। এ বয়সের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, উপন্যাস, গল্পের বই বেশি পড়ে। কিন্তু কেন তাদের ঘাড়ে এত সিরিয়াস বই চাপিয়ে দেওয়া হলো, তা বোধগম্য নয়।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, মূলত বিগত সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব বই কিনেছিল। আওয়ামী লীগপন্থি লেখক ও প্রকাশকদের বই বেশি কেনা হয়েছিল।
পরীক্ষাসহ সমাপনী পদ্ধতি নিয়ে ধোঁয়াশা
কর্মসূচি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী বই পড়ে না—এটা ধরে নিয়েই পরীক্ষার রূপরেখা সাজানো হয়েছে। প্রতি ক্লাস থেকে ৪০ জন করে একটি স্কুল থেকে ২০০ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। প্রতিটি উপজেলায় পাবলিক পরীক্ষার মতো এই কর্মসূচির সমাপনী পরীক্ষা নেওয়া হবে।
তবে কর্মসূচি সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সংগঠন জানান, এই পরীক্ষা কোন পদ্ধতিতে হবে, তা তারা জানেন না। আবার কর্মসূচি যখন শুরু হয়েছিল তখন তারা আগ্রহ নিয়ে শিক্ষার্থীদের বইগুলো পড়িয়েছিলেন। তারপর সংগঠক সম্মানী না দেওয়া এবং প্রকল্প নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ না থাকায় তা গতি হারায়। এ ছাড়া যে বইগুলো দেওয়া হয়েছিল, তা শিক্ষার্থীদের মনন উপযোগী না হওয়ায় অনেকেই বই পড়তে আগ্রহী হয়নি। আবার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক বইগুলো পড়তেও শিক্ষার্থীরা আগ্রহী নয়।
তারা আরও জানান, কর্মসূচি শুরুর পর বই পড়া অনেক শিক্ষার্থী এরই মধ্যে এসএসসি পাস করে বিদ্যালয় ছেড়েছে। আবার কেউ কেউ ওই সময় বই পড়লেও বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ভুলেও গেছে। এখন পরীক্ষা নিলে কীভাবে নেওয়া হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। এত কম সময়ে নতুন করে বইগুলো পড়ানোর জন্যও কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। যদি নির্দেশ দেওয়া হয়, তাহলে এত কম সময়ে শেষ করা সম্ভব হবে না।
সার্বিক বিষয়ে কর্মসূচির পরিচালক ড. ফিরোজ আলম বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক বই দেওয়া হয়েছিল, এটা সত্য। তবে এই বইগুলো এখনো পড়ানো হবে কি না, তা আমরা বিশেষজ্ঞ কমিটি ও মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাইব। এ ছাড়া শিগগির একটি সার্কুলার দিয়ে পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন, কোন কোন বই থেকে পরীক্ষা নেওয়া হবে এবং পরীক্ষার তারিখ জানাব।
তিনি আরও বলেন, আমরা এই সময়ের মধ্যে কর্মসূচিটি শেষ করতে আগ্রহী। পুরস্কারের বই ও ব্যাগ কেনা হলেই পরীক্ষা নেওয়া হবে। এর জন্য সব প্রস্তুতি নেওয়া আছে। তবে নির্ধারিত সময়ে কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।