সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:১৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ঐক্য-মুক্তি ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ

ঐক্য-মুক্তি ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ

ইতিহাসের একটি ব্যর্থ শাসনকালের সমাপ্তি ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে চরম স্বেচ্ছাচার আর বিশৃঙ্খলার দায়ে করুণ ও নিষ্ঠুর পরিণত ভোগ করতে হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। তারপর ওই বছরের ৭ নভেম্বর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার বিপ্লব সংঘটিত হয়, যা জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এ দিনটি দেশপ্রেমিক সেনা ও সাধারণ জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রতীক, যা জেনারেল খালেদ মোশাররফের তিন দিনের সামরিক অভ্যুত্থানের পতন ঘটায় এবং বন্দিদশা থেকে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে। এটি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র সুরক্ষার এক অবিস্মরণীয় অঙ্গীকারের দিন, যা আজও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা জোগায়।

এ দিবসের অর্জনকে বিশ্লেষণ করলে মোটাদাগে পাঁচটি দিক স্পস্ট হয়। যেগুলো এ দিবসটি আমাদের প্রেরণার উৎস করে তুলেছে।

প্রথমত ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের প্রতীক: ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ ও সেনাবাহিনী ঐক্যবদ্ধ হলে যে কোনো অপশক্তি বা ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করা সম্ভব।

দ্বিতীয়ত গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা: এ দিবসটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আপসহীন সংগ্রাম করতে হয়। এটি বহুদলীয় গণতন্ত্র নিশ্চিত করার এবং জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা দেয়।

তৃতীয়ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: এ বিপ্লবের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার লড়াইয়ের অবসান ঘটে, যা গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।

চতুর্থত ঐক্যবদ্ধতার আহ্বান: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মূল চেতনা হলো আধিপত্যবাদী ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম। এ চেতনা আজও জাতিকে স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও জুলুমতন্ত্র মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করে।

সর্বশেষ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তি: বিপ্লবের ফলে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান পরবর্তীকালে রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যা এ দিবসটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। মূলত রাষ্ট্রপতি হিসেবে জেনারেল জিয়াউর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের দায়িত্ব নিয়েই তিনি পুনর্গঠনের কাজে মনোনিবেশ করেন। তার উন্নত ও সময়োপযোগী চিন্তাধারা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশকে পরিচিতি করিয়ে দেয় খুব কম সময়ে। জিয়াউর রহমান পরিচিতি পান একজন ভিশনারি-প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই রাতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা আত্মগোপনে চলে যান। সাধারণ জনগণ দিশেহারা হয়ে পড়েন। এমন ক্রান্তিলগ্নে ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম রেডিও স্টেশন থেকে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দেন মেজর জিয়াউর রহমান। দিশেহারা জাতি পথ খুঁজে পায়। এ সময় ‘উই রিভোল্ট’ বলে জিয়াউর রহমান যে বিদ্রোহের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন একজন সমর নায়ক হিসেবে, সেটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে পাল্টে দিতে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। বন্দি করা হয় জনগণের প্রিয় সেনাপতি সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। বাংলাদেশ হয়ে পড়ে সরকারশূন্য। এভাবে একটি অন্ধকার সময় আবার নেমে এলে জনগণ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা ভাবে, মুজিবের আমলের সেই দুর্ভিক্ষ আর ক্ষুধা ফের বুঝি নেমে এলো। দুর্নীতি আর দুঃশাসনের দিন ফেরার অজানা আশঙ্কায় বিচলিত হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। সেইসঙ্গে রুশ-ভারতের তাঁবেদারির যুগের প্রত্যাবর্তনের আশঙ্কাও প্রবল হতে থাকে। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে এ মানুষটি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে হতবিহ্বল জাতির প্রাণে প্রতিরোধের শিখা প্রজ্বালিত করেছিলেন। সেই মানুষটিকে যারা বন্দি কিংবা হত্যা করতে পারে, তারা আর যাই হোক; বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অস্তিত্বের বন্ধু হতে পারে না। এমনি এক শঙ্কা ও নৈরাশ্যের দুর্যোগে ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর বিপ্লবী সৈনিকদের কামানের গোলার গর্জন কুচক্রীদের সব চক্রান্ত ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার রাজপথে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। ট্রাকে ট্রাকে সৈনিকরা আকাশের দিকে গুলিবর্ষণ করে তাদের বিজয়ের কথা জানান দেয়। সৈনিক ও জনগণ মিলে আনন্দ মিছিল বের করে। সেনা ট্যাংকে ফুলের মালা পরিয়ে জনগণ সিপাহি বিপ্লবকে অভিনন্দিত করে।

মেজর জিয়া সেদিনও রেডিওতে কথা বলেছিলেন। ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’—তার কণ্ঠের এমন উচ্চারণ সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করল। অজানা আশঙ্কা কেটে গেল। নির্ভার জনতা সারাদিন আনন্দ-উৎসবে মেতে রইল রাজপথে। শহর-নগর-গ্রামের সবখানে জিয়ার স্তুতি আর ভবিষ্যতের সোনালি সূচনার প্রত্যাশা নিয়ে জনগণ ফিরে গেল ঘরে।

চব্বিশের ৫ আগস্টও আমরা একটি বিপ্লব দেখলাম। দেশের সাধারণ ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে টানা ৩৬ দিনের যে আন্দোলন সফল করল, সেখানেও এই দেশপ্রেমিক সিপাহিদের অবদান অসামান্য। রাজধানীর প্রবেশ পথগুলোতে সাধারণ জনগণের যে স্রোত, তা তারা আটকায়নি। বরং পথে পথে সেনাদের সঙ্গে সাধারণ জনগণের দোস্তি গড়ে উঠেছে। ট্যাংকের ওপর ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দিয়েছে সাধারণ মানুষ। সারিবদ্ধ সিপাহিদের রাইফেলের ট্রিগারের আঙুল নেই। তাদের কঠোর হাত কোমলতার সঙ্গে মিলিত হচ্ছে ছাত্র-জনতার হাতের সঙ্গে। মুখে বিজয়ের হাসি। কোথাও কোথাও জনতার উচ্ছ্বাসের সঙ্গে উচ্ছ্বসিত সিপাহিরা নাচছে। রণসংগীতে গলা মেলাচ্ছে বাংলা মায়ের এসব দামাল ছেলে।

সিপাহি-জনতার এই যে ঐক্যবদ্ধতার আহ্বান, সে তো পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের পরম্পরা। জনতার সঙ্গে সিপাহিদের এমন দৃঢ় মেলবন্ধন যে কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তিকে রুখে দিতে পারে; এ উদাহরণ তো সৃষ্টি হয়েছিল সেদিনই, যেদিন জেনারেল জিয়াউর রহমানকে দেশের প্রয়োজনেই কারাগার থেকে মুক্ত করা হয়েছিল। তারপরের ইতিহাস, সে তো বাংলাদেশকে পাল্টে দেওয়ার ইতিহাস। আমরা সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে চলেছি। এগিয়ে যেতে চাই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দেখিয়ে দেওয়া পথে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: বিএনপির গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আজ রাতে তেহরান পুড়বে : বেন-গাভির

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইসরায়েলজুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি

ভূমিকম্পের সময় যে দোয়া পড়বেন

বাসচালককে মারধর ও ছাত্রদল কর্মীকে কোপানোর অভিযোগ  

দেশের যেসব জেলায় ভূমিকম্প অনুভূত, উৎপত্তিস্থল যেখানে

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত

খেলতে গিয়ে প্রাণ গেল দুই শিশুর

চা শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের দাবিতে ইউএনওর কাছে স্মারকলিপি

আরও বাড়ল ই-ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়

লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে আবারও যুদ্ধে নামব : ইরান

১০

‘বিশ্ব এলপিজি দিবস-২০২৬’ উদযাপন করল ফ্রেশ এলপি গ্যাস

১১

আর্জেন্টিনা যেন মিনি হাসপাতাল!

১২

বিশ্বকাপ এলেই রং বদলান নেইমার

১৩

রামিসা হত্যাকাণ্ডের রায়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়লেন জামায়াত আমির

১৪

সাতক্ষীরা পৌর নির্বাচনে নতুন সমীকরণ, আলোচনায় নাসিম ফারুক খান মিঠু

১৫

বিশ্বকাপে সেদিন আবির্ভাব হয়েছিল এক ‘ফুটবল দেবতার’, নাম তার ম্যারাডোনা

১৬

লাশ নিয়ে থানা ঘেরাও, এস আই প্রত্যাহার

১৭

বাজেট ২০২৬-২৭ / মানবসম্পদ উন্নয়নের রূপরেখা চান বিশেষজ্ঞরা

১৮

সেই তিন ভাইয়ের অ্যাকাউন্টে জমা হলো ১২ লাখ টাকা

১৯

চমেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা, ইনডোর ও আউটডোর শাটডাউনের হুঁশিয়ারি

২০
X