

অবশেষে দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এক মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হলো গোটা দেশ। তার এই ফিরে আসা শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নয়, বরং এটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের এক নতুন ইতিহাস। ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে এবং সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তার এই ফিরে আসা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে এক স্বর্ণালি অধ্যায়। গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় রাতে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হন তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার মাটিতে পা রাখার কথা তার।
তারেক রহমানকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত সোয়া ১২টায় দেশের উদ্দেশে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর ত্যাগ করে। তার সঙ্গে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান ছিলেন। জানা গেছে, রাত ৮ টার পর দেশে আসার জন্য লন্ডনের বাসা থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেন তারেক রহমান। রাত সোয়া ১০টায় তিনি বিমানবন্দরে পৌঁছান। পরে ‘চেক-ইন’ করে বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশ করেন তারেক রহমান। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগে বিশেষ সহকারী আবদুর রহমান (সানি) এবং জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন, ইউরোপের সমন্বয়ক কামাল উদ্দিন বিমানবন্দরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের লাগেজগুলো ‘চেক-ইন’ করান। তারেক রহমানকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি আজ প্রথমে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। এরপর সেখান থেকে বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে ঢাকার হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। ২০০৮ সালে এক অনিশ্চিত যাত্রায় দেশ ছাড়ার পর থেকে তাকে বারবার রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বিদেশের মাটিতে থেকেও তিনি এক মুহূর্তের জন্য দেশের মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। প্রযুক্তির সহায়তায় তৃণমূলের প্রতিটি কর্মীর কাছে পৌঁছে গেছেন তিনি। আজ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি বাঁকে মিশে রয়েছে দেশ ও জনগণের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বিদেশের মাটিতে অবস্থান করলেও তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে সব সময়ই ছিল বাংলাদেশ। একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে সুসংগঠিত রেখে দীর্ঘ ১৮ বছর রাজপথে টিকিয়ে রাখা এবং দূর দেশ থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। দেশপ্রেমের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি যখন বাংলার মাটিতে পা রাখতে চলেছেন, সেই মুহূর্তে চারদিকে জনতা ও সমর্থকদের মাঝে বইছে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস।
নির্বাসিত জীবনের অবসান: মূলত ২০০১ সালের নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনীতিতে তারেক রহমানের সক্রিয় আগমন ঘটে। এক-এগারোর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম দিকে ঢাকা সেনানিবাসে শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ দুর্নীতির একটি মিথ্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দেওয়া হয় এক ডজনের বেশি মিথ্যা মামলা। যৌথ বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় তারেক রহমান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ভর্তি করা হয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএমইউ)। সেখান থেকে উচ্চ আদালতে জামিনে মুক্ত হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সেই যাওয়া সরকারের বিধিনিষেধ আরোপে তার নির্বাসন জীবন শুরু হয়। দেড় যুগের এই নির্বাসনে লন্ডন থেকে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে দলের নেতৃত্ব দেন।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেই জীবন যেমন ছিল কষ্টের, তেমনি চ্যালেঞ্জের। আমাদের নেতা রাত নেই, দিন নেই, ঘণ্টা নেই অবিরাম কাজ করেছেন প্রবাসে থেকে দেশ ও মানুষের জন্য। আমরাও আমাদের নেতার অপেক্ষায় আছি। তিনি যেমন নির্বাসিত ছিলেন দেড় দশক, আমিও ছিলাম ৯ বছর। সেজন্য আমি প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে অনুধাবন করি নির্বাসিত জীবন কত কষ্টের ও বেদনার।
দেশপ্রেমের মাশুল ও ব্যক্তিগত ত্যাগ: তারেক রহমানের নির্বাসিত জীবনের নেপথ্যে ছিল তার আপসহীন জাতীয়তাবাদী চেতনা। তৃণমূল পর্যায়ে দলকে সুসংগঠিত করার যে অনন্য নজির তিনি স্থাপন করেছিলেন, সেটিই তাকে তখনকার শাসকগোষ্ঠীর প্রতিহিংসার লক্ষ্যে পরিণত করে। নির্বাসনের দেড় যুগে তাকে চরম ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি একমাত্র ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর সময় তিনি পাশে থাকতে পারেননি। বর্তমানে তার মা বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পারিবারিক এই দূরত্ব ও শোক তাকে দমাতে পারেনি; বরং দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে তাকে আরও সংকল্পবদ্ধ করেছে।
ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে ফেরা: নির্বাসনে থাকলেও তারেক রহমান নিজেকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে একজন দূরদর্শী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর উপদেষ্টা প্রকৌশলী মোস্তাফা-ই জামান সেলিম কালবেলাকে বলেন, ‘তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা ও নেতিবাচক প্রচার চালানো হলেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তিনি একজন ধৈর্যশীল নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। তার বিরোধীরা তাকে রাজনৈতিক ময়দান থেকে মুছে ফেলতে চাইলেও জনগণের হৃদয়ে তার স্থান ছিল অটুট। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তার এই প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরূকরণ সৃষ্টি করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারেক রহমানের দেশপ্রেম কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়; বরং তার দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের এক জ্বলন্ত দলিল। তিনি এমন এক সময়ে ফিরেছেন যখন দেশ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অপেক্ষায়। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, তারেক রহমান তারুণ্যের শক্তি এবং অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটিয়ে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধশালী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করবেন। দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ এই জননেতা এখন দেশের মানুষের শেষ ভরসাস্থল। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এমনটাই বিশ্বাস কোটি কোটি মানুষের।’
লন্ডন থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় ফিরবেন তারেক রহমান: বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, তারেক রহমানকে বহনকারী বিমান লন্ডন থেকে আসার পথে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে সমবেত ও ভিড় না করার জন্য দলের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাগত জানাতে যত আয়োজন: বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট (বিজি-১০২) ঢাকায় পৌঁছাবে সকাল ১১টা ৫৫ মিনিটে। এই ফ্লাইটে রয়েছেন তারেক রহমান এবং তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে প্রথমে ফুল দিয়ে তাকে স্বাগত জানাবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। এরপর বুলেটপ্রুফ মার্সিডিজ জিপে চড়ে যাবেন ৩০০ ফিটের কাছে সংবর্ধনার অনুষ্ঠানস্থলে। এখানে বিশেষ মঞ্চে উঠে নেতাকর্মীসহ দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। এই ভাষণ যাতে সবাই দেখতে পারে সেজন্য ৩০টি এলইডি বড় পর্দার স্ক্রিন ও অনুষ্ঠানস্থলসহ চারপাশে ৯ শতাধিক মাইক বসানো হয়েছে।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমান যাবেন এভারকেয়ার হাসপাতালে মাকে দেখতে। সেখান থেকে গুলশান অ্যাভিনিউর ১৯৬ বাসায় উঠবেন তিনি। এই বাসাতেই সপরিবারে থাকবেন তারেক রহমান।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের সময়টি যাতে দেশবাসী ও প্রবাসীরা দেখতে পারেন সেজন্য বিএনপির মিডিয়া সেল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিএনপির ফেসবুক পেজ, বিএনপি মিডিয়া সেল এবং ‘আওয়ার বিএনপি’ এ তিনটি ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার হবে।
স্মৃতিসৌধ, জিয়ার মাজার ও হাদির কবর জিয়ারত: তারেক রহমানের ফেরা প্রসঙ্গে গতকাল দুপুরে গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে করেছে বিএনপি। এসময় দলের স্থায়ী কিমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দুপুরে বিমানবন্দরে নামার পর দলের সিনিয়র নেতারা তারেক রহমানকে স্বাগত জানাবেন। এরপর তিনি জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে তথা ৩০০ ফিট রাস্তায় সংবর্ধনাস্থলে যাবেন। সেখানে অপেক্ষায় থাকা নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। এরপর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন। সেখান থেকে বিমানবন্দর সড়ক হয়ে কাকলির মোড় হয়ে গুলশান দুই নম্বরে বাসভবনে চলে আসবেন। সেদিন আর অন্য কোনো অনুষ্ঠান হবে না।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শুক্রবার জুমার নামাজের পর তারেক রহমান বাসভবন থেকে প্রথমে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করবেন। সেখান থেকে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। এরপর শনিবার দুটি কর্মসূচি রয়েছে। ওইদিন জাতীয় পরিচয়পত্রের কাজ করবেন তিনি। এ জন্য তারেক রহমান সশরীরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন অফিসে যাবেন কি না, সেটা পরে জানানো হবে। ওইদিনই ভোটার হতে সব কাজ করবেন। এরপরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাবেন। শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত শেষে সেখান থেকে রাজধানীর শ্যামলীতে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের দেখতে যাবেন তারেক রহমান। এরপর আরেকটি অনুষ্ঠান হবে সেটার বিস্তারিত পরে জানানো হবে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিন স্তরের নিরাপত্তা, সহযোগিতা করছে সরকার: তারেক রহমানের জন্য সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি বিএনপির বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পূর্বাচলে ৩০০ ফিট সড়কে যে সংবর্ধনা মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে তার চারপাশে তিন স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকবে বলে জানিয়েছেন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্ব থাকা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম। গতকাল গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দলের পক্ষে থেকে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সেটার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হবে।