

সতেরো বছরের বেশি সময় নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় তার এ প্রত্যাবর্তন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো নেতার প্রবাস জীবন শেষে ফিরে আসা মানেই নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু একজন নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের দীর্ঘদিনের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষার অবসান। নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে তিনি যখন ফিরে আসছেন তখন দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে পতিত ফ্যাসিবাদী হাসিনার পতনের পর চব্বিশোত্তর বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিপুল প্রত্যাশার বলয়। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই ব-দ্বীপ এখন এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখছে, যেখানে তারেক রহমান হবেন সেই স্বপ্নের অগ্রপথিক। কারণ, শুধু একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার ফেরা নয়, বরং একে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন।
তারেক রহমানের রাজনীতি শুরু হয়েছিল তৃণমূলকে কেন্দ্র করে। ‘তৃণমূল সম্মেলন’-এর মাধ্যমে তিনি যেভাবে গ্রামগঞ্জের মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে থেকেও তিনি ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দলের প্রতিটি স্তরের নেতাকর্মীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দেশে ফিরে তিনি আবার সেই তৃণমূলভিত্তিক রাজনীতিকে চাঙ্গা করবেন। মানুষ চায় এমন একজন নেতাকে, যিনি শুধু ঢাকা থেকে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করবেন না, বরং যার শিকড় থাকবে গ্রামের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে।
তারেক রহমান এমন এক সময় ফিরছেন যখন বাংলাদেশ এক যুগ সন্ধিক্ষণ তথা ইতিহাসের কঠিন বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় দেড় দশকে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সামাজিক-রাজনৈতিক বিশেষ করে সব গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের। এরপর শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। গত ১১ ডিসেম্বর আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তবে চারদিকের পরিস্থিতি ও ঘটনপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ নিয়ে চতুর্মুখী চক্রান্ত এখনো থেমে নেই। ঠিক যেন এক অস্থির সময়ে দেশে প্রত্যাবর্তন হলো আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের।
বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের ক্ষত হলো প্রতিহিংসা। এক দল অন্য দলকে নিশ্চিহ্ন করার যে অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সাধারণ মানুষ তা থেকে মুক্তি চায়। তারেক রহমান তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে বারবার ‘রেইনবো নেশন’ বা রংধনু জাতির কথা বলেছেন, যেখানে সব মত ও পথের মানুষের সহাবস্থান থাকবে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, তিনি দেশে ফিরে প্রতিহিংসার রাজনীতির কবর দেবেন এবং সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি ‘জাতীয় ঐক্যের সরকার’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করবেন। পতিত স্বৈরাচার সরকারের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে চব্বিশোত্তর বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়তে হবে তারেক রহমানকে। তবে এটি খুব সহজ নয়। দেশের সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ মনে করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে জবাবদিহিমূলক রাজনীতির সূচনা হবে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে তিনি একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ করবেন—এমনটাই সাধারণের প্রত্যাশা। বিশেষ করে যুবসমাজের কাছে তিনি একজন ‘আইকন’, যারা মনে করেন তারেক রহমানের আধুনিক চিন্তা ও প্রযুক্তিবান্ধব পরিকল্পনা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে এগিয়ে নেবে।
বিগত বছরগুলোতে অর্থ পাচার এবং ব্যাংক খাতের লুটপাট দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, তারেক রহমান দেশে ফিরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করবেন। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে আনাই হবে তার নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষকরা প্রত্যাশা করছেন এমন এক পরিবেশ, যেখানে চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট থাকবে না। তারেক রহমান বরাবরই জেন্ডার ইকুয়ালিটি বা লিঙ্গ সমতায় বিশ্বাসী। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর বেশিই নারী। তারা চায় কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ। তারেক রহমানের কাছে নারীদের প্রত্যাশা—তিনি এমন আইন ও কাঠামো তৈরি করবেন, যা সহিংসতামুক্ত এবং নারীবান্ধব বাংলাদেশ নিশ্চিত করবে। এ ছাড়া বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালনার দাবিও জোরালো।
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথায় উপনীত হওয়া যায় যে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি একটি জাতির পুনর্জন্মের ক্ষণ। এটি একটি রাজনৈতিক দর্শনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দীর্ঘ সংগ্রামের পর তিনি যখন দেশের মাটিতে পা রাখবেন, তখন তার কাঁধে থাকবে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ভার। ফ্যাসিবাদের শত অত্যাচার, নিপীড়ন এবং জেল-জুলুম সহ্য করে তিনি যেভাবে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, তা তাকে একজন পরিণত জননেতায় রূপান্তরিত করেছে। দেশ ও বিদেশের লাখো মানুষের যে পাহাড়সম প্রত্যাশা তার ওপর অর্পিত হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। জনমানুষের এ বিপুল প্রত্যাশাকে তিনি যখন সঠিক নেতৃত্বে রূপান্তর করতে পারবেন, তখনই সার্থক হবে তার এ দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। তবে তারেক রহমানের অদম্য সাহসিকতা এবং জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকলে বাংলাদেশ আবারও বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সবুজ-শ্যামল এ বাংলায় ইনসাফ কায়েম হবে, ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারবে—তারেক রহমানের ফিরে আসার মধ্য দিয়েই রচিত হবে সেই আগামীর বাংলাদেশ।
ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম
উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি