

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিল্লুর আর খান বাংলাদেশের রাজনীতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তার রচিত গ্রন্থের উপশিরোনাম দিয়েছেন, ‘Crisis to Crisis’। বাস্তব অর্থে তাই সত্য। অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের সংকট যেন শেষ হওয়ার নয়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র এই মুহূর্তে একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। ২০২৪ সালের গণবিপ্লবের পরবর্তী প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণে বাংলাদেশ একটি কর্মপরিকল্পনা তথা উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে ধাবিত হচ্ছে। জাতির ভবিষ্যৎ প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের লক্ষ্যে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের জন্য জাতি গভীর প্রত্যাশায় অপেক্ষা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অনিশ্চয়তা ও অসমাপ্ত অবস্থার পরিবর্তনের নিশ্চয়তা চায় জনগণ। সংকটময় সময় থেকে উত্তরণ চায় জাতি। বাংলাদেশের সব সংকটের প্রতিটি ঘটনায় নিয়তি যেন নির্ধারণ করেছে জিয়াউর রহমান এবং তার উত্তরাধিকারকে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রকে অনিবার্য সংঘাত থেকে রক্ষা করেছেন। তার সহধর্মিণী খালেদা জিয়া ১৯৯০ সালে আপসহীন নেত্রী হিসেবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১/১১-এর সংকটকালে আপস না করে গণতন্ত্রের সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। ১৭ বছর অন্যায়, অত্যাচার ও জেল-জুলুম ভোগ করে গণতন্ত্রের মা অভিধায় অভিষিক্ত হয়েছেন। অবশেষে ২০২৪ সালের গণবিপ্লবের নেপথ্যে নেতৃত্ব দিয়ে জিয়াউর রহমানের রক্তের ও আদর্শের উত্তরাধিকার তারেক রহমান জাতিকে যথার্থ লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছেন। নির্বাচ-পূর্ব এ অস্থির সময়ে নিশ্চিত গণতন্ত্রের জন্য গোটা জাতি আবারও অপেক্ষা করছে প্রত্যাশিত রাষ্ট্রনায়কের প্রত্যাবর্তনে।
২৫ ডিসেম্বর সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ জাতির প্রত্যাশিত রাষ্ট্রনায়ক প্রত্যাবর্তন করছেন। লাখ লাখ মানুষ তাকে স্বাগত জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করতে চায়, জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার যেথা এক দেহে হলো লীন, সেই তারেক রহমান তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের দিশারী। ‘তারেক জিয়া বীরের বেশে আসবে ফিরে বাংলাদেশে’—তার নেতৃত্বের জন্য অপেক্ষমাণ জাতি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান একটি অনিবার্য নাম। বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। এ অবস্থানটি প্রশংসা ও প্রশস্তিতে তার প্রতি আরোপিত হয়নি। তিনি অর্জন করেছেন এ নাম, দীর্ঘ দিবস ও দীর্ঘ রাতের কর্মফলের মাধ্যমে। বিগত প্রায় দুই দশক ধরে তিনি নিবেদন করেছেন নিজেকে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে, গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় এবং মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার রক্তাক্ত সংগ্রামে। শহীদ জিয়াউর রহমান কখনো উত্তরাধিকারের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু তার নিষ্ঠুর-নির্মম নিয়তির পর অনিবার্যভাবেই উত্তরাধিকারের আলোয় স্থাপিত হয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। শহীদ জিয়ার সহধর্মিণী খালেদা জিয়া নিস্পৃহ ছিলেন, নিষ্ক্রিয় ছিলেন রাজনীতিতে। কিন্তু দেশ-জাতি-রাষ্ট্রের বাস্তবতা তাকে সক্রিয় করে, স্থাপিত করে ক্ষমতার পাদ-প্রদীপে। সে সময়ে তারেক রহমান শুধুই একজন কিশোর, শুধুই একজন যুবক, শুধুই একজন নাগরিক। হয়তোবা পিতার রক্তক্ষরণের আবেগ তাকে উজ্জীবিত করেছে রাজনীতির অঙ্গন-প্রাঙ্গণে। নিজ বিদ্যা, বুদ্ধি, কুশলতায় ধাপে ধাপে নিজেকে তৃণমূল থেকে অবশেষে ক্ষমতার শীর্ষে স্থাপন করেছেন। তার রাজনৈতিক দর্শন, দেশপ্রেম, উন্নয়ন কৌশল অবশেষে তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে। সেই গন্তব্য ক্ষমতার আবাহন নয়, বরং জনমানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের নিরন্তর প্রয়াসে নিজেকে নিবেদিত রাখা।
তার পিতা জিয়াউর রহমান এবং মাতা খালেদা জিয়া কখনোই কোনো সময়ই রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত ব্যবহার করেননি। বক্তব্য ও বিবৃতিতে সৌজন্য সভ্যতা ও ভদ্রতা অতিক্রান্ত করেননি কখনো। বিগত ১৭ বছরে তারেক রহমান সেই উত্তরাধিকারের উত্তম উদাহরণ হয়ে আছেন। তার অনুপস্থিতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত যেসব বক্তব্য এসেছে, তার উপস্থিতির পর দেশ জাতির কাছে হয়তো উত্তম কিছু দৃশ্যমান হবে। ১৭ বছরে তার নেতৃত্ব পরিপক্বতা অর্জন করেছে। তিনি দেশত্যাগ করেছিলেন তেজ প্রদীপ্ত বীর তরুণ হিসেবে। আর ফিরে আসছেন একজন প্রাজ্ঞ পুরুষ হিসেবে।
দেশবাসী গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তার প্রত্যাশিত নেতৃত্বের জন্য। সে নেতৃত্ব শুধু রাষ্ট্রিক দায়িত্ব নয়, বরং গোটা জাতির নেতা হিসেবে। একজন পরিণত রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি পেশ করেছেন। অনেকেরই ধারণা ছিল যে, বিরোধী আন্দোলনের স্বার্থে তিনি সব দল ও মতকে নিয়ে চলার জন্য জাতীয় সরকারের কথা বলছেন। নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে তার দলের যখন সর্বত্রই জয়-জয়কার, সে সময় তিনি আবারও জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলে আস্থা ও দূরদর্শিতার প্রমাণ দিলেন। তার মহান পিতা একটি বিভাজিত রাজনৈতিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। তার রাজনীতিতে ডান-বাম সবারই যথোপযুক্ত স্থান ছিল। জিয়াউর রহমান সারা দেশ থেকে ভালো মানুষদের একত্রিত করে ভালো পদে নিয়োজিত করেছিলেন। সে কারণে বাংলাদেশ সেই সময়ে উন্নয়নের শীর্ষে আরোহণ করেছিল। গোটা জাতির নেতৃত্ব তার জন্য যেমন সম্মানের, তেমনি চ্যালেঞ্জের। তার পিতার সময়ের চেয়ে এখন বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র অনেক ভঙ্গুর। অনৈক্য, অরাজকতা ও বিভাজনে বিদীর্ণ দেশ। এ ছাড়া রয়েছে পতিত স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকট। রাজনৈতিক সংকটের চেয়ে বাংলাদেশে সবসময়ই অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর থেকেছে। পতিত স্বৈরাচার বাংলাদেশকে আবার তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করে গেছে। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তাকে যথার্থ অর্থনীতি ও উন্নয়ন কৌশল অনুসরণ করতে হবে। আশার কথা এই যে, এরই মধ্যে তার প্রণীত পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কর্মসূচি জনমনে আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের আরেকটি দুর্ভাগ্যজনক দিক হচ্ছে দুর্নীতি। এ দেশে দুর্নীতি যেন প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করেছে। এমন কোনো অফিস-আদালত ও সেক্টর নেই যে দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। বাংলাদেশের মানুষ বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতির ফলে এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। প্রতিটি মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে। ব্যক্তিগতভাবে যখন প্রয়োজন হয় দুর্নীতির সীমা অতিক্রম করে। জনমনসতত্ত্বের এ কঠিন দ্বৈধতা তারেক রহমানকে অতিক্রম করতে হবে। ২০২৪ সালের গণবিপ্লবের পর ১৬ মাস ধরে বিএনপিকে নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। দুর্নীতি দমন ক্ষেত্রে তারেক রহমানের দৃঢ়তা মিলেছে। সরকারে আসীন হওয়ার পর একটি দুর্নীতিগ্রস্ত জাতিকে নতুন করে পরিচ্ছন্ন করবে তারেক রহমান—এ আশা জনগণের।
বিগত কঠিন বছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রধান দল বিএনপিকে শাসক দল শতভাগ নিঃশেষ করতে চেয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলে ফাটল ধরাতে পারেনি কেউ। তবে নির্বাচন কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় যে বিপরীত প্রবণতা দেখা দিয়েছে, তা দলের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। অবশ্য বিএনপির মতো খুব বড় দলের ঐক্য ও সংহতি বিধান একটি চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। মানুষ বিশ্বাস করে যে, তারেক রহমানের আগমন পরবর্তী সময়ে তিনি যথার্থভাবেই এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হবেন।
বাংলাদেশ সংকটময় সময়ের দেশ। সে সংকট থেকে উত্তরণের উদাহরণও রয়েছে। জিয়া পরিবার বাংলাদেশকে প্রতিটি সংকটে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশের সামনে গণতন্ত্রের যে অগ্নিপরীক্ষা অপেক্ষমাণ, সেই সংকট থেকে জাতিকে উদ্ধার করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেবেন তারেক রহমান, এ প্রত্যয় গোটা জাতির।
আবদুল লতিফ মাসুম
অধ্যাপক (অব.), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়