রাজকুমার নন্দী
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:১৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

গৃহবধূ থেকে ‘জাতির ঐক্যের প্রতীক’

ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর সময় খালেদা জিয়া ছিলেন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। তবে স্বামীর মৃত্যুর সাত মাস পর দলের প্রয়োজনে সেই গৃহবধূ অবস্থা থেকেই হাল ধরেন ‘বিপর্যস্ত ও দিশেহারা’ বিএনপির। পরবর্তী সময়ে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দলকে নিয়ে আসেন ক্ষমতার চূড়ায়।

১৯৮২ সালে রাজনীতিতে আসার দশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯৯১ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, যিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীও। তবে ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। তাই রাজনীতিতে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। আর দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে শেষ জীবনে তিনি হয়ে ওঠেন জাতির ‘ঐক্যের প্রতীক’, জাতির অভিভাবক।

অবশ্য জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন, তখন খালেদা জিয়াকে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যেত না। তাই খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসাটা অনেককে চমকে দিয়েছিল। সিনিয়র সাংবাদিক শফিক রেহমান তার ‘সংগ্রামী নেত্রী খালেদা জিয়া’ শীর্ষক লেখায় তাকে বর্ণনা করেছেন এভাবে—‘জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হলেও লাজুক গৃহবধূরূপে তার দুই ছেলে তারেক রহমান (পিনো) এবং আরাফাত রহমান (কোকো)-কে নিয়ে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন।’

খালেদা জিয়ার জন্ম অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে, ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর খালেদা জিয়ার পরিবার পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের দিনাজপুর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা জিয়ার বিয়ে হয়।

গৃহবধূ থেকে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন খালেদা জিয়া। সেদিন তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের কয়েক মাস পরই তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হন। এ সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর ১৯৮৪ সালের ১০ মে খালেদা জিয়া বিএনপি চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধা পাওয়া খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর। তিনি পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী; আর বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন দুইবার। অবশ্য গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে নাম লেখানো খালেদা জিয়ার চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের বড় সময় কেটেছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজপথের আন্দোলনে। তিনি অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন, ছয়বার কারাবরণ করেছেন; তবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে কখনো তিনি হারেননি।

খালেদা জিয়ার নির্বাচনী ইতিহাসে একটি শব্দ কখনোই জায়গা পায়নি, সেটা হলো ‘পরাজয়’। তার নির্বাচনী রেকর্ডের সঙ্গে কেউ পাল্লা দিতে পারেনি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে তিনি কখনো পরাজয়ের মুখ দেখেননি। পাঁচ নির্বাচনে বগুড়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনার ২৩টি আসন থেকে প্রার্থী হয়ে প্রতিটিতেই জিতেছেন। ব্যালট পেপারে তার নাম মানেই যেন জয়ের নিশ্চয়তা। এ এক অনন্য রেকর্ড। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া পাঁচটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পাঁচটিতেই জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের প্রথম নির্বাচনে (ষষ্ঠ সংসদ) তিনি আবারও পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে তিনি আবারও পাঁচটি আসনে জয় পান। এই ধারা ২০০১ সালেও অব্যাহত থাকে। তিনি আবারও পাঁচটি আসনে জিতে ক্ষমতায় ফেরেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যখন মাত্র ৩০টি আসন পায়, খালেদা জিয়া তখনো তিনটি আসনে প্রার্থী হয়ে প্রতিটিতেই বিজয়ী হন।

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করলে জানানো হয়, বগুড়া-৩, ফেনী-১ ও দিনাজপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচন করবেন খালেদা জিয়া। গত সোমবার ছিল নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। বিএনপির অন্যান্য প্রার্থীর সঙ্গে খালেদা জিয়ার নামেও তিন আসনেই মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়। তার পরদিনই গতকাল মঙ্গলবার এলো তার মৃত্যুর খবর।

খালেদা জিয়াকে দেশের ইতিহাসে ‘গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল এক শোকবার্তায় বলেন, রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া ভীষণভাবে সফল ছিলেন। তিনি কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলোয় তিনি পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে তিনি যে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, সেখানেও তিনি জয়লাভ করেছিলেন।

রাজনীতিবিদ এবং শাসক হিসেবে খালেদা জিয়াকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান কালবেলাকে বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর সময়ের প্রয়োজনে তার সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজের অনিবার্যতা প্রমাণ করেন। এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে আপসহীন অবস্থানে থেকেই তিনি দেশবাসীর আকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছেন এবং তাদের কাছ থেকেই তিনি সম্মানিত হয়েছেন ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধায়। আর এই যে গণতন্ত্রের লড়াই, সেই লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবেই দেশবাসী তাকে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী করে সরকার গঠনের সুযোগ দিয়েছিলেন।

অধ্যাপক সিদ্দিক বলেন, খালেদা জিয়ার এই যে অব্যাহত যাত্রা, সেই যাত্রাটাকে রাজনৈতিক জীবনে তিনি পরিপূর্ণ করেছেন চার দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপিকে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে। আর সরকারে থেকে তিনি সাংবিধানিকভাবে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মতো অসংখ্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি নারীর ক্ষমতায়নে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে একটা অসামান্য অবদান রেখেছেন।

এই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলেন, দেড় যুগ ধরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রহীন সমাজ-রাষ্ট্রে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করতে গিয়ে তিনি ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সন্তানকে হারিয়েছেন, কারাভোগ করেছেন। কিন্তু তিনি কোনো রকমের আপস করেননি। গণতন্ত্রের এ লড়াই করতে গিয়ে তিনি ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’, ‘ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ অভিধায় ভূষিত হয়েছেন। তিনি কোনো দলের নেত্রী হিসেবে নয়, জাতির অভিভাবক, জাতীয় নেত্রী হিসেবেই তার মহাযাত্রা হয়েছে। এখানেই একজন খালেদা জিয়ার অনন্য সফলতা। খালেদা জিয়ার এই মৃত্যুতে শারীরিকভাবে তার প্রস্থান হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে তার যে অবস্থান, তিনি যে রাজনৈতিক আদর্শ রেখে গেছেন—বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, গণতন্ত্রকামী দেশপ্রেমিক মানুষ ততদিন সেটা স্মরণ করবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রায় পড়া চলছে

রামিসা হত্যা মামলা / আদালত প্রাঙ্গণে যেসব দাবি জানাচ্ছেন রায় শুনতে আসা মানুষ

মেয়ে হত্যার রায় শুনতে আদালতে রামিসার বাবা 

শাপলা চত্বর হত্যা মামলা / দীপু মনি-ফারজানা রূপাসহ ৯ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির

বিশ্বকাপ ভিসা প্রত্যাখ্যান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা ইরানের

ট্রেনের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ, চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ

এক কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়ের বাধা অতিক্রমের গল্প

খুলনার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ বন্ধ

আবাসিক হোটেলে সাবেক ইউপি সদস্যের মরদেহ, বোরকা পরা নারীকে খুঁজছে পুলিশ

১১টায় রায় ঘোষণা, একটি ন্যায়বিচারের জন্য উন্মুখ পুরো জাতি

১০

ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ধনকুবের

১১

ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি ব্রিজ ধসে জনদুর্ভোগ চরমে

১২

ধান কাটতে বলায় গাছের ডাল দিয়ে পিটিয়ে হত্যা

১৩

মেট্রোরেল নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত, আজ থেকেই কার্যকর

১৪

বিসিবিতে আজ আমেজহীন আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার নির্বাচন

১৫

শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞ মামলা: ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন আজ

১৬

রাশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

১৭

জব্দ ইরানি অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত মিত্র দেশগুলোকে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

১৮

তরুণীকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ

১৯

আলোচিত মামলার রায় শোনার অপেক্ষায় জাতি, আদালতে সোহেল-স্বপ্না

২০
X