

তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও টানা ৪১ বছর ধরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার রাজনৈতিক সংগ্রামের পথ সহজ ছিল না। এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে রাজনীতির ময়দান থেকে সরাতে বারবার মামলা, পাঁচবার গ্রেপ্তার, সাজা দিয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখা, আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে গৃহবন্দি রাখা—কোনো নিপীড়নেরই কমতি ছিল না। তিনি পলাতক না হয়ে ৩৭ মামলায় নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। এর মধ্যে দুর্নীতির দুই মামলায় তার ১৭ বছরের সাজা হয়। তত্ত্বাবধায়ক ও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মিলিয়ে তিনি ১ হাজার ১৪৭ দিন কারাগারে ছিলেন। বহু ঈদ তার কাটে কারাগারে, এমনকি মায়ের মৃত্যুর সময়ও তিনি ছিলেন বন্দি। দীর্ঘ কারাজীবনে তিনি বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হলেও উন্নত চিকিৎসা পাননি। কারাগারের অধীনেই নিতে হয় চিকিৎসাসেবা। খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও বিএনপি নেতারা বলছেন, তাকে রাজনীতি থেকে সরাতেই এসব মামলা, গ্রেপ্তার ও সাজা দেওয়া হয়েছিল। তবু তিনি রাজনীতিতে ছিলেন আপসহীন।
বিএনপির আইনজীবীরা জানান, সেনাসমর্থিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আমলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সারা দেশে তার বিরুদ্ধে আরও ৩২টি মামলা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি দুর্নীতির, চারটি মানহানি এবং একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। বাকিগুলো হত্যা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, বোমা হামলা, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে কটাক্ষ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, ‘মিথ্যা’ জন্মদিন পালন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগে দায়ের করা হয়। ঢাকায় তার বিরুদ্ধে ২৮টি এবং ঢাকার বাইরে ৯টি মামলা হয়। এসব মামলায় তিনি কখনো পলাতক হননি এবং নিয়মিত হাজিরা দিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যান।
২০০৮ সালে তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় দুদক খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। একই মামলায় তারেক রহমানকে ১০ বছরের সাজা দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্টে আপিলে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। এরপর তিনি আপিল বিভাগে যান। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধ অর্থ সংগ্রহের অভিযোগে ২০১১ সালে দায়ের হওয়া আরেক দুর্নীতির মামলায় ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর তাকে সাত বছরের সাজা দেন ঢাকার বিচারিক আদালত। এ দুই মামলায় তার মোট ১৭ বছরের দণ্ড হয়।
সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে তিনি রাজনৈতিক মামলায়ও কারাগারে ছিলেন। কারাগারে তার স্বাস্থ্য অবনতি ঘটলে তাকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকার শর্তসাপেক্ষে তার সাজা স্থগিত করে, যাতে তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে পারেন। এতে তার ৭৭৫ দিনের কারাজীবনের অবসান ঘটে। তবে সেটি ছিল না পূর্ণ মুক্তি—তিনি আরও চার বছর ছিলেন আইনগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে, কার্যত গৃহবন্দি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় সাজাপ্রাপ্ত দুই মামলায় তিনি মুক্তি পান। এর পরও তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যান এবং শেষপর্যন্ত ওই দুই মামলায় আপিল বিভাগে খালাস পান। বাকি বিচারাধীন ৩৫টি মামলায় অভিযোগের পর্যাপ্ত উপাদান না থাকায় তিনি একে একে অব্যাহতি পান। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি নাইকো দুর্নীতির মামলায় খালাস পাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি মামলামুক্ত হন।
রাজনীতিতে যোগদানের শুরু থেকেই বারবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির নেতৃত্বে আসেন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তিনি স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে ও ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তিনি গ্রেপ্তার হন। তবে সে সময় তাকে দীর্ঘমেয়াদে কারাগারে থাকতে হয়নি।
২০০৬ সালে তৃতীয় মেয়াদ শেষে দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দুর্নীতির পাঁচটি মামলায় তাকে বিশেষ সাব-জেলে রাখা হয়। সেই অবস্থায় তিনি পালন করেন ২০০৭ সালের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ২০০৮ সালের ১৮ জানুয়ারি তার মায়ের মৃত্যু হলে তাকে ছয় ঘণ্টার প্যারোলে মুক্তি দিয়ে জানাজায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। ৩৭২ দিন কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান তিনি।
বিএনপির সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন মেজবাহ ‘কালবেলা’কে বলেন, ‘সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকার পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সারা দেশে ৩৭টি মামলা করে। তাকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতেই এসব মিথ্যা মামলা করা হয়েছিল। তবে এত মামলা হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো পলাতক হননি। আইনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিয়েছেন, আইনি লড়াই করেছেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যখন কিছুটা স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ফিরে আসে, তখন এসব মামলার মিথ্যাচার প্রমাণিত হয়। তিনি আপিল শুনানিতে খালাস পান। বারবার গ্রেপ্তার ও নিপীড়নের মুখেও তিনি আপসহীন ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন। তার মৃত্যু দেশের রাজনীতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।’