

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিভিন্ন সময় নানা সংকট ও দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়েছে দল। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসা খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেছেন, সংকটে ‘ফিনিক্স পাখি’র মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। শুধু তাই নয়, দলকে নিয়ে আসেন ক্ষমতার চূড়ায়। অবশ্য এজন্য তাকে জেল-জুলুম-নির্যাতনের শিকার হওয়ার পাশাপাশি নানা ত্যাগও স্বীকার করতে হয়েছে। তবে কোনো অবস্থাতেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। বরাবরই বলেছেন, এ দেশই তার চূড়ান্ত ঠিকানা। তিনি সব সময় ছিলেন ইস্পাতকঠিন ও দৃঢ়চেতা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধা পাওয়া খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর। তিনি পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী; আর বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন দুবার।
খালেদা জিয়াকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) উপাচার্য ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘খালেদা জিয়া তার আন্দোলন-সংগ্রাম-ত্যাগ এবং আপসহীন নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল মহিরূপ হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে সব সময় ছিলেন আপসহীন। এ অবস্থানের কারণে তিনি জনগণের আকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছেন, হয়েছেন দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তবে দল নানা সময়ে সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, নিজেও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। খালেদা জিয়া সেই দুর্যোগে-সংকটে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। এজন্য তাকে জেল-জুলুমের শিকার হওয়া ছাড়াও নানা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। আগেই স্বামী হারিয়েছেন, মাকে হারিয়েছেন, এক সন্তান হারিয়েছেন, আরেক সন্তান নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে। তার সারাটা জীবনই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে চলে গেছে, সবকিছুই দেশের জন্য। এ রকম একজন মানুষকে আমরা হারালাম। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, যা পূরণ করা সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে খালেদা জিয়া সব সময় অবিচল-আপসহীন ছিলেন। বারবার অসুস্থ হয়েছেন, তিনি ইচ্ছা করলে কিন্তু আপস করে দেশের বাইরে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারতেন; তিনি সেটাও করেননি। তিনি বলেছেন, এই দেশের বাইরে তার কোনো জায়গা নেই। এই দেশই তার দেশ, এই দেশের সন্তান-মানুষ তার সন্তান। এভাবে দেশের মানুষের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য তিনি আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন।’
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার মধ্যে গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া এবং তার বড় ছেলে তারেক রহমান। বিএনপির অভিযোগ ছিল, কারাগারে তারেক রহমানকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। এক বছর পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পান বিএনপি চেয়ারপারসন, মুক্তি পান তারেক রহমানও। আর কারাগারে থাকার সময় ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে মা তৈয়বা মজুমদারকে হারান খালেদা জিয়া।
তারেক রহমান মুক্তির পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সপরিবারে লন্ডন যান। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোও জরুরি অবস্থার সময় মালয়েশিয়ায় যান। দীর্ঘ সময় দুই ছেলেকে ছাড়াই এভাবে নিঃসঙ্গ জীবন কাটান খালেদা জিয়া। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কোকো মারা যান। আওয়ামী সরকারবিরোধী তৎকালীন ২০ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে তাকে দেশে আনা হয় এবং বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এদিকে জরুরি অবস্থার মধ্যে খালেদা জিয়া যখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও কাছাকাছি সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। শেখ হাসিনা মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশ গেলেও খালেদা জিয়া যেতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি সে সময় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এটাই আমার ঠিকানা। এ দেশ, এ দেশের মাটি-মানুষই আমার সব কিছু। কাজেই আমি দেশের বাইরে যাব না।’
তবে দেশে থেকে একের পর এক নির্যাতন-বঞ্চনার শিকার হন খালেদা জিয়া। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের ৬ নম্বর বাড়ি থেকে উৎখাত হন খালেদা জিয়া। সেনানিবাসের বাড়ি ছেড়ে গুলশান কার্যালয়ে এসে যখন সংবাদ সম্মেলন করেন, তখন খালেদা জিয়ার চোখ বেয়ে ঝরছিল অঝোর ধারা। সেদিন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এই বাড়ি তার কাছে শুধু বিঘা বিঘা জমি বা ছাদ ছিল না। এটি ছিল তার স্বামী-সন্তানদের সঙ্গে কাটানো হাজারো স্মৃতির আধার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, শহীদ মঈনুল রোডের বাড়িটি শুধু একটি ইটের দালান ছিল না, এটি ছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত এক টুকরো ইতিহাস। এখানে বেড়ে উঠেছেন তার সন্তানরা, জমা ছিল তাদের দীর্ঘ দাম্পত্যের হাজারো স্মৃতি।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিএনপির ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে বালুর ট্রাকসহ ১৪টি ট্রাক ও পুলিশ ভ্যান রেখে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। এতে কার্যত কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনের বিরোধিতা করে আন্দোলনের অংশ হিসেবে এই কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপি।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি সংসদের বাইরে চলে যায়, রাজপথই হয় দলটির ঠিকানা। রাজনৈতিকভাবে সেই চাপের সময়ে খালেদা জিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় একের পর এক মামলা। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে তাকে কারাগারে পাঠান আদালত। এরপর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাতেও তার সাজার রায় হয়। বিএনপির দাবি, এসব মামলা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা।
করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত করে শর্ত সাপেক্ষে খালেদা জিয়াকে সাময়িক মুক্তি দেয়। শর্ত অনুযায়ী তাকে থাকতে হয় গুলশানের বাসায়, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতিও তার ছিল না। ফলে মুক্তি পেয়েও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় একপ্রকার বন্দি জীবন কাটতে থাকে বিএনপি চেয়ারপারসনের। এর মধ্যে কয়েকবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। কয়েক দফা বড় ধরনের অস্ত্রোপচারও হয়।
আন্দোলন-সংগ্রাম, রাষ্ট্র পরিচালনাসহ খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শেষ জীবনে এসে তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবার কাছে সম্মান ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন।