মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রাগীব হাসান
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম
আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

কবিতার পথে যাত্রা

রাগীব হাসান। ছবি : সংগৃহীত
রাগীব হাসান। ছবি : সংগৃহীত

সময় যত এগোবে আমাদের অনেকের কাজ আরও আরও ঝাপসা হতে থাকবে। আমার নিজের কাছে কথাগুলো চরম বেদনাদায়ক, কিন্তু এমনই তো দেখতে পাচ্ছি। দুটো পথ আছে : এক, সারা জীবন কবিমনকে ধরে রাখা অথবা, দুই, যুগান্তর চক্রবর্তীর মতো একটিই কালজয়ী গ্রন্থ লিখে ফেলা। দুটি কাজই অসম্ভব কঠিন। সময়ের মার সাঙ্ঘাতিক মার। -গৌতম বসু

একজন কবিতা প্রয়াসী কর্মী হিসেবে কবি মনে করি গৌতম বসুর কথাটি ধ্রুব সত্য। কবিতা লিখতে এসে যে কোনো কবির কতটা বাধার মুখে পড়তে হয় তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। কবিতাকে ঝাপটে ধরে এগিয়ে যাওয়ার পথটি সহজ নয়। কণ্টকিত পথ পার হতে হয়। পা দুটি রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। হৃদয়ে বহু রক্তক্ষরণ হয়। বিরুদ্ধ একটি পরিবেশকে দুই হাত দিয়ে ঠেকিয়ে রেখে কবিকে চলতে হয়। এ কারণে কবি মন কতক্ষণ ধরে রাখা যায়- এ প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে এসে যায়। এ প্রসঙ্গে আমাদের বরণ্য কবি শামসুর রাহমানের একটি কথা এখন কানে বাজছে। তিনি যা বলেছিলেন, তা আমার মতো করে বলছি, দীর্ঘ সময় ধরে কবিতা লিখে যাওয়াটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে প্রথম জীবনে যদি ভালো কবিতা নাও লিখতে পারেন, কবিতার পেছনে লেগে থাকার কারণে একসময় কবিতা তার কাছে ধরা দেয়, অধরা হয়ে থাকে না। নিবিষ্ট মনে কবিতা চর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শামসুর রাহমানের এই কথার সূত্র ধরে আরও কিছু কথা বলা যায়, এক এক দশকে বহু কবির আগমন ঘটে। দশক শেষ হওয়ার আগেই অনেকে কবিতা লেখা থামিয়ে দেন। অনেকে নিজের কবিতা জীবনের প্রথম দশক শেষ করে দ্বিতীয় দশকে ঢুকে পড়েন জমকালোভাবে। তৃতীয় দশক, পরবর্তী দশক বলা যায় কয়েক দশক পর্যন্ত লিখে যান। আমাদের সামনে প্রতিথযশা অনেক কবি আছেন, যাদের কবিতা পড়ে আমরা কবিতা লেখার চেষ্টা করি। প্রশ্ন হতে পারে, কবি কেন কবিতা লেখা ছেড়ে দেন, এক দশকও পূর্ণ করতে পারেন না অনেকে। আবার অনেকে কয়েক দশক ধরে অবিরল লিখে যান। যিনি কয়েক দশক ধরে অবিরল লিখে যান, তিনি কি এমন পেয়েছেন, যা তাকে কবিতা লেখায় চালিত রাখে। মনে হয়, কবিমনকে ধরে রাখার কারণেই তিনি এটা পারেন। যিনি এতে ব্যর্থ হন, তিনি কবিতাচ্যুত হয়ে পড়েন। সারাজীবন কবিতা লিখে যাওয়া সারাজীবন মন ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাস্তবতা অর্থাৎ সংসার জীবন, চাকরি জীবন, বেকার জীবন কতটা ভূমিকা রাখে, হলফ করেই বলা যায়, বহুলাংশে ভ‚মিকা রাখে। এমনও তো আছে, কবিতার জন্য বিয়ে করেননি অনেক কবি। বিনয় মজুমদার তাদের মধ্যে একজন। আমাদের সময়ে নব্বই দশকের দুজন অতিপরিচিত দুজন কবি এখনও বিয়ে করেননি বলে গুঞ্জন রয়েছে। চাকরি জীবন অনেকের কবিতা জীবন কেড়ে নেয় বলেও আমার বিশ্বাস। আবার একটা চাকরি তা যতই নড়বড়ে হোক, ওইটুকু চাকরিই তার কবি জীবনকে বাঁচিয়ে রাখে। আবার অনেক বড় চাকরি কেড়ে নিতে পারে, কবিতা প্রকাশের বেলায় সুবিধা এনে দিতে পারে। এই বাস্তবতা জাজ্বল্যমান। অন্যদিকে একটি কবিতার বই লিখে কালজয়ী যাওয়া অনেক কঠিন। তা কবি গৌতম বসু পরিষ্কার বলেছেন।

কবি গৌতম বসুর কথার নিরিখে একটি বিষয়ের অবতারণা করা যায়। প্রচার মাধ্যম তথা কবিতা প্রকাশের জায়গাটি কবিকে কতটা বাঁচিয়ে রাখে বা মেরে ফেলে, আদৌও কি বাঁচিয়ে রাখে বা মেরে ফেলে, এ কথার কি কোনো ভিত্তি আছে, সারা জীবন কবিমনকে ধরে রাখায় প্রচার মাধ্যম কি কোনো ভূমিকা রাখে, নাকি রাখে না, এ কথায় কি কোনো ধূম্রজাল রয়েছে। এ কথায় এক একজন এক ভাবনা পোষণ করেন। হতে পারে তা। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি প্রচার মাধ্যম কবির লেখালেখিকে অনেক অংশে গতিশীল রাখে। অনেক প্রসিদ্ধ কবির সাক্ষাৎকার, লেখায় তা পাওয়া গেছে। হাতের কাছে তাদের লেখাপত্র না থাকায় উদ্ধতি হিসেবে তুলে ধরা গেল না। প্রচার মাধ্যম বলতে সাহিত্য সাময়িকা, লিটল ম্যাগাজিনকেই বোঝানো যায়। সাহিত্য সাময়িকীর যিনি সম্পাদক তার ওপর নির্ভর করে কবিতা বা সাহিত্য প্রকাশের। সম্পাদকের মর্জি মাফিক বা তার রুচির ওপর নির্ভর কবিতা বা সাহিত্য ছাপানো। সাহিত্য সম্পাদকদের মধ্যে অনেকের সুনাম ও খ্যাতির কথা অনেকে স্মরণ করেন। আমাদের দেশে কবি আহসান হাবীব ও কবি সিকান্দার আবু জাফর এই প্রজন্মের কবি-সাহিত্যিকদের কাছে স্মরণীয়।

তবে এই সময়ের যারা সাহিত্য সম্পাদক আছেনও তারাও অনেকে শ্রদ্ধা ও সম্মান অর্জন করেছেন তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। বাংলাদেশে যে বিষয়টি আলোচিত, তাহলো লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে এসেছে। বিশিষ্ট কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের কথায় লিটল ম্যাগাজিন হলো কবিতা বা সাহিত্যের আতুরঘর। সেই আতুরঘর অনেকদিন ধরেই শুকিয়ে আসছে। এখনও বিশেষ করে এই রাজধানী থেকেই তারা লিটল ম্যাগাজিন বের করেন তাদের কত কাঠখড় পোড়াতে হয় তারাই ভালো জানেন। উদ্যম বা পৃষ্টপোষকতার অভাবেই কি আমাদের দেশে লিটল ম্যাগাজিন ঠিক পশ্চিম বাংলার মতো জেঁকে বসতে পারলো না। না কি অন্য আরও কোনো কারণ লুকায়িত আছে।

আমার একটা কথা এখনও মনে আছে, সমসাময়িক কবি টোকন ঠাকুর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে চায়ের টেবিলে বলছিলেন, যদি আজিজ সুপার মার্কেটের পাঠক সমাবেশের বইঘরের সামনে গিয়ে তিনি দাঁড়ান তাহলে লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকরা কবিতার জন্য তাকে ঘিরে ধরবেন। টোকন ঠাকুরের এ কথা থেকেও বোঝা যায় তখনও রাজধানী ঢাকায় লিটল ম্যাগাজিনের একটা দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল। এক যুগের অধিকাল আগে বা তারও বেশি সময় আগে কবি টোকন ঠাকুর এ কথা বলেছিলেন। আজ কি আর সে অবস্থা আছে? মনে হয় নেই।

২. ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে সাহিত্য চর্চার ধরনটি কেমন তা নিয়ে দু-চার কথা বলা যেতে পারে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শহরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার নেই বললেই চলে। তারপর খবরের কাগজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শহরে সাহিত্যের গতি-প্রকৃতির খবর পাওয়া যায়। বিশেষ করে নানা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে কোনো শহরে। উত্তরবঙ্গে বগুড়া ও রাজশাহী শহরে সাহিত্য সংগঠন শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রতি বছর এখানে সাহিত্যিকদের নিয়ে অনুষ্ঠান-পুরস্কারের আয়োজন করা হয়। যশোর ও নেত্রকোনাসহ বৃহৎ ময়মনসিংহে সাহিত্যের বাতাবরণ বেশ শক্তিশালী। বরিশাল অঞ্চলেও সাহিত্য সংগঠন সক্রিয়। এ দিয়েও প্রমাণ হয় ঢাকার বাইরের লেখক-কবি নিষ্ক্রিয় নয়। সাড়ম্বর রয়েছেন। এবার আমার নিজের শহর রাজবাড়ী প্রসঙ্গেও দু-এক কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। এ শহর আমার নিজের হওয়ার এখানকার কবি-লেখদের সঙ্গে জানাশোনা রয়েছে। যখনই নিজের শহরের আলোবাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ হয়, এদের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করি। বর্তমানে এখানে ক-জন কবি-লেখক আছেন, তারা নানা অনুষ্ঠানসহ সাহিত্যের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশ সরব রয়েছেন। একটা সময় এমন দেখিনি। সাহিত্যের নানান অনুষ্ঠানে জ্বলজ্বল করে ওঠে নিজের শহরের কবি-লেখকদের মুখ। এটা দেখে ভালো লাগে।

আমার নিজের ভাগ্য খারাপ যে রাজধানীতে নানা সাহিত্যিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। জীবনজীবিকার ফের এমনই যে দুই যুগের বেশি সময়ের ঢাকা শহরে একটি-দুটি সাহিত্যিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। সাহিত্য করতে হলে মেলামেশা মানে লেখকদের সঙ্গে মেলামেলা সম্পর্ক স্থাপন, জানাশোনার পরিধি বাড়ানোর দরকার আছে বলে আমার কখনও কখনও মনে হয়েছে। এটা কেউ সেভাবে কেউ মনে করেন কিনা আমি জানি না। তবে খোদ এই ঢাকা শহরে লেখকবৃত্ত আমার এতটাই লঘু যে তা ভেবে আমারও কষ্ট হয়। একটা সময় সেই নব্বই দশকের মাঝামাঝি শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে প্রায় নিয়মিত দুই বেলা যাওয়া পড়তো। ওয়ালসো টাওয়া কর্মক্ষেত্র থাকায় ৪টার পর বের হয়ে সোজা আজিজে চলে আসতাম। ঘণ্টাখানেক থাকার পর রাত ৮টার দিকে ফিল্ডে পেশাগত দায়িত্ব পালন আবার আসতাম। রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত থাকতাম। সে সময় কত লেখক চোখে পড়তো। অতিতরুণ থেকে বিখ্যাত লেখকরাও পা রাখতেন আজিজ সুপার মার্কেটের সাহিত্য পাড়া। পশ্চিম বাংলার বেশ কজন প্রসিদ্ধ কবি-লেখক আজিজ সুপার মার্কেটে সাহিত্যপাড়ায় এসে অনুষ্ঠান করে গেছেন। এখানকার কবি-লেখক তাদের সান্নিধ্য পেয়েছেন। সর্বশেষ আজিজ সুপার মার্কেটে একটি রেস্তোরাঁয় অল্প ক-বছর আগে আমি রাহুল পুরাকায়স্থকে দেখে ছিলাম। মনে হয়েছিল তিনি কয়েকদিনের জন্য ঢাকায় আছেন। আমি যাদের সঙ্গে ছিলাম, তিনি তাদের পূর্বপরিচিত। অবশ্য তারা গরজ করেনি বা সুযোগ করে দেয়নি তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার। তারা অবশ্য ঢাকার সাহিত্যি জগতে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছেন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১০

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

১১

এনসিপিতে যোগ দিলেন বিভিন্ন দলের শতাধিক নেতাকর্মী

১২

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্য : হালাল পণ্যে বড় সম্ভাবনা

১৩

ছেলের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা

১৪

মুক্তির আগেই সাফল্যের দুয়ারে ‘ককটেল ২’

১৫

ইসরায়েলে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

১৬

নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার : মঈন খান

১৭

অতিরিক্ত ফাউলের অভিনয় করলে বিশ্বকাপে দেখতে হবে হলুদ কার্ড

১৮

ছাত্রলীগ নেতা ডেবিট আটক

১৯

ভারতের পুশইন নিয়ে ছাত্রদল নেতা আবিদের স্ট্যাটাস ভাইরাল

২০
X