

এভাবে লেখার আমন্ত্রণ পাবো কল্পনাও করিনি। তাও আবার বইমেলায় প্রথম বই। আমার প্রথম বই তো কবিতার বই। পরবর্তী সময়ে আরও যা বের হয়েছে তার সবই কবিতার বই। নব্বই দশকের কবিদের মধ্যে অনেকের কবিতার বই ছাড়াও প্রবন্ধ, গল্প- উপন্যাসের বই বের হতে দেখেছি। এটা নিশ্চিত অনেক বড় ঘটনা। প্রথম বই তা কবিতার হোক বা কথাসাহিত্য বা প্রবন্ধ- যাই হোক, এ নিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা থাকতে পারে, ঘটনাবহুল সেসব অভিজ্ঞতা কবির আগামীর পথের দিক্-নির্দেশও করে। কবির চমকপ্রদ অভিজ্ঞতাগুলো তার সঙ্গী হয়ে থাকে নিশ্চয়। করুণ কোনো অভিজ্ঞতাও তার মনের কোণে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। আমার প্রথম বই লেখা এবং তা বের করার ক্ষেত্রে একেবারেই কোনো ঘটনা নেই, তাও অবশ্য নয়।
১৯৯৯ সালে ‘সমন্বয়ের নানাজাতীয় তীরন্দাজ’ বের হয়েছিল। এটিই আমার প্রথম বই। কবিতার বই, যা অমর একুশের বইমেলায় বের হয়েছিল। র্যামন থেকে এটি বের হয়। সময়টা নব্বই দশক শেষ হয়ে যাওয়ার আগের বছরটি। পরের বছরটি তো ২০০০ সাল। ভাগ্যগুণে যে নব্বই দশকের গর্ভে থেকেই বইটি বের হয়েছিল- তা আমাকে স্পর্শ করে সবসময়। এখন সেই সময়টার কথা মনে পড়ে। অনেক দুর্দান্ত কিছু ছিল যা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
একটু বলার দরকার যে, আমার কবিতার বইটি বের হওয়ার আগে পরিচিত একজনের প্রথম কবিতার বই বের হয়, সে অবশ্য আমারই সমসাময়িক। তার বইটি বের হওয়ার সময় আমি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলাম। পরিচিত ওই কবি আমার নিজের শহরেরই, সে নিজ শহরের ব্যাপ্তি ছাড়িয়ে বৃহৎ পরিমন্ডলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। সে আর আমি তার কবিতার বইটির প্রকাশক ঠিক করতে গিয়ে জীবনে সেই প্রথম প্রকাশকের মুখোমুখী হই। প্রকাশকের দপ্তরে প্রকাশকের সঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া- এসব মনে বেশ উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল। এক ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে সদরঘাট ঘেঁষা বাংলাবাজারে প্রকাশকের দপ্তরে গিয়ে এই উত্তেজনা কুড়িয়ে এনেছিলাম।
সম্ভবত পরিচিত ওই কবির বইটি ১৯৯৭-এর দিকে বের হয়। বাংলাবাজার নিয়ে যেসব গুঞ্জন শুনে এসেছি, বাস্তবে সেখানে গিয়ে মায়ায় জড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম এক অন্যরকম জগৎ। কত প্রকাশকের দপ্তর। একটার পর একটা। দপ্তর ভরা নতুন সব বই। মনে যে আলোড়ন তুললো তা যেন আর ছাড়তেই চায় না। বাংলাবাজারের কীর্তিখ্যাতি যা এতকাল শুনে এসেছি- লেখকের জন্য বড় মোক্ষম স্থান এটি- একথা কত বড় বড় কবি-লেখকের আত্মকথায় পড়ে ঘোর লেগেছে, সেই ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে প্রকাশকের দপ্তরে প্রকাশকের সামনে বসে সবকিছু যেন অলৌকিক মনে হচ্ছিল।
দ্বিতীয় তলায় ছিল প্রকাশকের দপ্তর। মানে র্যামন পাবলিশার্সের দপ্তর। প্রকাশক রাজন ভাই। ওই সময়টায় অথ্যাৎ নব্বই দশকের শেষ দিকটায় এসেও র্যামন পাবলিশার্সের নামডাক অনেক। খ্যাতিমান সব কবি-সাহিত্যিকের বই বের করেছে প্রকাশনী সংস্থাটি। সেসব বই দপ্তরে শোভা পাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে তা ছুঁয়েও দেখেছি। একটি আবিষ্টতা এসে নিজের মধ্যে ভর করলো। সেখানে কিছুটা সময় থেকে আমরা বের হয়ে এলাম।
১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটানা আমি আমার প্রথম কবিতা বইয়ের কবিতাগুলো লিখে ফেলি। মনে হয় কয়েক মাস লেগেছিল। চার ফর্মার একটি বইয়ের কবিতাই লিখে ফেললাম। প্রায় প্রতিসন্ধ্যার পর থেকে কবিতাগুলো লেখা হতে লাগলো। খাতায় যখন কবিতাগুলো ভরে উঠলো তা কপি করে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র কাকরাইলের একটি কমপিউটারের দোকানে তা কম্পোজ করতে দিয়ে আসলাম। রাজন ভাই তার প্রকাশনীর অনেক বই ওই কমপিউটারের দোকান থেকে কম্পোজ করাতেন। আমাকে বলে দিলেন ওখানে পাণ্ডুলিপি কম্পোজের জন্য দিয়ে আসতে।
ওই সময়টায় আমি ঢাকার মালিবাগের একটি মেসে থাকি। ওখানেই প্রথম কবিতা বইয়ের কবিতাগুলো লেখা। এগুলোর প্রুফ দেখে দিয়েছিল কবি মারজুক রাসেল। ওই সময়টায় মারজুক মাঝেমধ্যে মেসে আমার কাছে আসতো। তার আগে থেকেই ওর সঙ্গে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব। ওই সময়ই নব্বই দশকের যে কয়েক জন কবির কবিতা বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও নামিদামি পত্রিকায় ছাপা হতো, তার মধ্যে মারজুকের কবিতা বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হতে দেখেছি। সেই দিনগুলিতে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে সন্ধ্যা বা রাতে ওর সঙ্গে দেখা হতো। ও তখন যেন সত্যিকারের কবিজীবন কাটাচ্ছে। তখনও কবিতার পাশাপাশি গান লেখা ও অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েনি। তখন যতদূর মনে হয়েছে, সম্পাদনা সহকারী হিসেবে ছুটোছুটি করছে, যা জীবন ধারণের জন্য ওর অবলম্বন ছিল। আরও যতটা জেনেছি, সেই সময় খ্যাতিমান কবি ফারুক মাহমুদের সাহচার্যে থাকতো মারজুক। সম্ভবত কবি ফারুক মাহমুদ মুদ্রণশিল্পে জড়িত ছিলেন, মারজুক উনার অন্যতম সহায়ক হিসেবে ছিল। সেই সূত্রে সম্পাদনা সহকারীর কাজেও দক্ষতা অর্জন করে। ফলে নির্ভুলভাবে আমার কবিতার বইটির প্রুফ মারজুক দেখে দিয়েছিল। কবিতাগুলোকেও সমর্থন করে। প্রুফ দেখার জন্য ওকে অবশ্য কোনো টাকা দিতে হয়নি। ওই সময় আমি যে দৈনিক পত্রিকার অফিসটিতে কাজ করতাম, সেখানে কর্মরত ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী মাসুক হেলাল। তিনি অবলীলায় ‘সমন্বয়ের নানাজাতীয় তীরন্দাজ’-এর প্রচ্ছদ করে দেন।
১৯৯৯ সালে বইমেলায় আমার কবিতার বইটি বের হয়ে গেল। র্যামনের স্টলে বসে অনেকের হাতে বইটি তুলে দিলাম। কেউ কেউ হয়তো কিনেও ছিলেন বইটি। আমার লক্ষ্য ছিল প্রথম বই হিসেবে প্রথিতযশাদের হাতে তুলে দিতে হবে। বিশেষ করে র্যামনের স্টলে যেসব কবি ও লেখক আসতেন, স্টলে বসতেন, তাদের হাতে বইটি দিয়েছি। আগাগোড়াই সংকোচ আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে। তবে কিছুটা হলেও র্যামনের স্টলে সংকোচহীন হয়ে উঠেছিলাম। যতদূর মনে পড়ছে, কবি টোকন ঠাকুরের দ্বিতীয় কবিতার বই ওই মেলাতেই বের হয়েছিল, কবি আলফ্রেড খোকনের প্রথম কবিতার বই ওই মেলাতেই বের হয়।
তখন আমি যে পত্রিকা অফিসে কাজ করি, সেখানে কবি আলফ্রেড খোকন ও লন্ডনপ্রবাসী কবি মুজিব ইরমও ফিচার বিভাগে কাজ করেন। পত্রিকাটির সাহিত্য সম্পাদক রাজু আলাউদ্দীন।
বলাই বাহুল্য, আমার প্রথম কবিতার বইটি আমার পকেটের টাকাতেই বের হয়। আমি যখন মালিবাগের মেসে প্রথম কবিতা বইয়ের কবিতাগুলো লিখছি, তার কিছুকাল আগে একই শহরের বন্ধু নজরুল আমাদের সঙ্গে থাকতে শুরু করে। সে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে প্রিন্টিংয়ের ব্যবসা শুরু করেছে। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র সে। কবিতার বইটি ছেপে দেওয়ার দায়িত্ব নিল নজরুল। মেলার মাঝামাঝি সময়ে বই হাতে এলো।
প্রথম বই প্রকাশের আনন্দ কতটা প্রচণ্ড লেখকমাত্রই জানেন। আমারও সেরকম আনন্দ হয়েছিল। একজন তরুণের প্রথম কবিতার বই তা কতটা ভালো হয়েছে, আদৌও ভালো হয়নি- বইটিতে কবিতা নামে যা ছাপা হয়েছে, তা, ছেপে না বের করলেই ভালো হতো- এসব ভাববার ফুরসত ছিল না। প্রথম কবিতার বই বের হয়েছে, তার উত্তেজনার পারদ ক্রশম ঊর্ধ্বমুখী, ফলে কোথায় এ নিয়ে ভাববার অবকাশ! বই প্রকাশের ওই সময়টা শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট ঢাকার সমস্ত লেখকদের কাছে তীর্থস্থানের মতো। ঢাকার লেখকরা যে যেখানেই থাকুন না কেন বিকেল হলে এখানে তারা আসতে শুরু করতেন। খ্যাতিমান থেকে শুরু করে সদ্য কবিতা লিখতে আসা কবিযশোপ্রার্থীও এখানে এক দণ্ড দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নিতেন তা দেখেছি। আমিও তার ব্যাতিক্রম ছিলাম না। ঘটনা হলো আমার পত্রিকা অফিসটি ওখান থেকে কিছু দূরে ছিল। অফিস থেকে বের হয়ে রিকশায় ১০/১৫ মিনিটের পথ। ঢাকার খ্যাতিমান কবি-লেখকদের সান্নিধ্য আমার ভাগ্যে সেভাবে জোটেনি, তখনও না এখনও না। আজিজ সুপার মার্কেটের প্রায় প্রতি সন্ধা-রাতে ওখানে গেলে সমসাময়িক কারোর কারোর সঙ্গে আলাপ-পরিচয়, জানাশোনা হয়নি এমন নয়, হয়েছে। যে কোনো তরুণ কবির প্রথম কবিতার বই বের হওয়ার পর প্রথমে কবিবন্ধুদের মধ্যে তা নিয়ে সামান্য হলেও আলোচনা হয়। অনেক বন্ধু বইটি নিয়ে সরাসরি তাদের মতামত ব্যক্ত করেন। আমার বইটির প্রুফ দেখা সূত্রে মারজুক রাসেলের কিছুটা ভালো লেগেছে বলে আমার মনে হয়েছিল। যা আমার দ্বিতীয় বই ‘বিদ্যুতের দৃশাবলি’র বেলায় তা হয়নি। মারজুক বইটির কবিতা নিয়ে যে মোটা দাগে কোনো মন্তব্য করেছিল তাও নয়।
তবে ‘সমন্বয়ের নানাজাতীয় তীরন্দাজ’ বইটি বের হওয়ার পর তিনটি আলোচনা বের হয়েছিল। তার মধ্যে দুটি দৈনিক পত্রিকা মানবজমিন ও ভোরের কাগজ-এ। অন্যটি উটপাখি নামে উত্তরবঙ্গ থেকে প্রকাশিত একটি লিটল ম্যাগাজিনে। অম্লান দেওয়ান ছোট আকারে মানবজমিনে, কবি বদরুল হায়দার ভোরের কাগজে এবং কবি অদ্বিতি শাপলা উটপাখিতে আলোচনা করেন। আমি সবসময় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থেকেছি।
আমার প্রথম কবিতার বইটি বের হওয়ার পূর্ববর্তী প্রায় এক দশকের বেশি সময় কবিতা লেখার মশকো করেছি। আমার নিজ শহর রাজবাড়ী থেকে এটা শুরু হয়েছিল। ঢাকায় আসার পর যে ছন্নছাড়া জীবনে ঢুকে গেলাম- তারপরেও কবিতা মশকো থেকে বিচ্ছিন্ন্ হইনি। এখানে ওখানে একটি-দুটি কবিতা ছাপাও হয়েছে। তবে এটা ঠিক যে, নব্বই দশকের প্রায় মাঝামাঝি সময়ের কিছু আগে ঢাকায় ডেরা বাঁধলেও ওই দশকের একদল কবি যেভাবে ঢাকাকে শাসন করে বেড়াতেন- তাদের অন্তর্ভুক্ত আমি ছিলাম না। তাদের কারোর কারোর সঙ্গে জানাশোনা ছিল এ পর্যন্ত। তবে আমি কবিতার জগৎ থেকে সটকে পড়িনি, কবিতার সঙ্গে নিজেকে দিন দিন আরও জড়িয়ে নিয়েছি। আমার হয়তো সেই সক্ষমতা ছিল না বা নেই যে, দলবদ্ধ কবিদের গলিঘুঁজি ধরে ধরে তাদের কাছে পৌঁছে যেতে পারি। এ ব্যাপারে আমার স্বতঃস্ফূর্তার অভাব ছিল তাও নয়- হতে পারে ঢুকার দরজা খুঁজে পাইনি। একটা বিষয় বেশ ভালোভাবেই উপলদ্ধি হতো, দলবদ্ধ কবিরা ছিলেন অন্তর্লীন।
এরপর জীবন তো একই স্রোতধারায় চলে না। ঢাকায় প্রাণবায়ুটুকু নিয়ে কিভাবে টিকে থাকা যায় তার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হয়েছে। তবে অল্প সময়ের জন্যও আমি কবিতা ছাড়া হইনি। কবিতা লেখার পাশাপাশি আরও কতগুলো অনুষঙ্গ ভাবতে হয় কবিকে, তার মধ্যে পত্রিকা সম্পাদকদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা। এটা আমার বিশ্বাসের মধ্যে থাকার পরেও এই বিশ্বাসে চিড়ও ধরেছে। পত্রিকায় লেখা ছাপা হওয়া বা না হওয়ার যে ইতিহাস লেখকদের থাকে তা আমারও আছে। আমার ধারণা, পত্রপত্রিকায় কবিতা ছাপা হওয়াটা জরুরি। এতে কবির উপকার ছাড়া ক্ষতি হয় না। যদি কোথাও কবিতা ছাপা না হয়, তাহলে নানা অপঘাত কবির জন্য অপেক্ষা করতে পারে বলে আমার বদ্ধমূল ধারণা।
২. সমন্বয়ের নানাজাতীয় তীরন্দাজ-এর কিছু কবিতা তুলে দিলাম পাঠকদের জন্য-
শাদা বরফে গ্রামীণ অবকাঠামো
গ্রামীণ অবকাঠামোর মধ্যে শীতার্ত ফলের ভ্যান, শাকসবজির শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সকালে গার্মেন্টসের উদ্দেশে সৌন্দর্যরা দল বেঁধে হেঁটে যায়। শাদা বরফে গ্রামীণ অবকাঠামো কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে আছে।
শিল্পকলার কাজ চলছে দৈনন্দিন কতর্ব্য নানা-প্রকারের সাথে সংশ্লিষ্ট করে রাখে। অভিভূত হওয়া গেল সেগুনবাগিচার সৌন্দর্যময় গাছগুলোকে দেখে। শিল্পকলার কাজ চলছে। চলতে থাকবে। এর মধ্যে নির্মাণ কাজে ত্রুটির সংবাদ পাওয়া গিয়েছিল। একা একা কৃষ্ণচূড়া এভিনিউ হেঁটে দেখা গেল ফলেরা ঘোরাফেরা করছে। ফলের শরীর শরীরের কাছে থেকে প্রকান্তরের জন্ম দেয়। জ্যৈষ্ঠ মাসে বীজতলায় মনোরম বীজ উৎপাদিত হচ্ছে।
বহিরাগমন দীর্ঘদিন ধরে
নির্জনতার মধ্যে প্রার্থনা তৈরি হয়। অনেকদিন পর কোত্থেকে এমন আগমন হলো, চা খেতে খেতে ফুটপাতে দীর্ঘ এক সৌন্দর্য বলে উঠলেন- ফসলের মাঠের মধ্যে পাতাকপি, ফুলকপির শিকড়ে ভালো জলসিঞ্চন করতে হয়। নির্জনতার মধ্যে এ-সব করতে হয়। নির্জনতার মধ্যে অন্ধকার হেঁটে আসছে বহিরাগমন দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রের জাহাজে চড়ে উঠে বসে আছে।
জ্ঞানবান পল্লীগীতি গেয়ে চলেছে
জনপ্রিয় পালকগুলো দরজার মাথায় বসে আছে। জলের ধারা অতল থেকে উঠে আসে, জীবনজিজ্ঞাসা ধানক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করছে ধানক্ষেতকে। যে মোমের পাহাড় গড়ে উঠেছে- জনপ্রিয় দিনগুলি ঝরাপাতা হয়ে জলের ধারার ওপর দিয়ে ভেসে চলেছে। জলের ধারা আমাদের গ্রামের পাশে জ্ঞানবান পল্লীগীতি গেয়ে চলেছে।
বৃক্ষগুলোর মধ্যে শুয়ে আছে
আমাদের ক্ষমাশীলেরা অনবদ্য সেই দিনের দিকে ধাবিত হলেন। ক্ষমাশীল বৃক্ষের ভেতরে গিয়ে প্রাকৃতজন ক্ষমাশীল ফলময়তা হয়। ফলগুলোকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে লোকায়িত নগর উন্নয়নের ধারায়। বৃক্ষদের উঠোনে সমুদ্র প্রবাহিত হয়ে উৎপাদিত ধান, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে গুদামজাত শোভা বৃক্ষগুলোর মধ্যে শুয়ে আছে।
আরেকটা ধানক্ষেত
বহু বিষয়ের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয় মাঝেমধ্যে, তোমার ঘরের পাশ দিয়ে হেঁটে আসার সময় পাটক্ষেতের পাশে ব্রাক-ইশকুল, গ্রামীণব্যাংক দৃষ্টিগোচর হলো। পাটক্ষেতের আল দিয়ে ইশকুলঘরের বারান্দার দিকে মুগ্ধময় চোখ হয়ে থাকি। বহু বিষয়ের সঙ্গে বহু বিষয়ের দেখা-সাক্ষাৎ হয়। মাতৃকতা, তোমার চরণ তলে আমার মাথা রেখে দিই ? আমার ক্ষেত্রগুলোতে কত উপধানক্ষেত, রমণে লিপ্ত একটা ধানক্ষেত আর একটা ধানক্ষেতের সঙ্গে।
বুদ্ধিময়তা বই পড়ছে
সমস্ত অঙ্গিভূত রৌদ্রময়তা বাড়ি বাড়ি ঘুরে আসে। এমন বীজ-অনুপাত নানাবিধ কয়লাখনি, মুখাগ্নিতে অসাধারণ গাছপালার ছায়া, কোন আত্মত্যাগ সাধারণভাবে তৈরি হয়েছিল তোমার দাঁড়ানোর পাশে ? সকল ঘরময়তার মধ্যে বুদ্ধিময়তা বই পড়ছে।
ওই মুখশ্রীর অগ্রজ্ঞানে
তোমার কাছে যাওয়ার জন্য ব্যাকুলতা তৈরি হয়। সংগ্রহ করে রেখে দিয়েছি ভীষণ জলযানের সুবাতাস। অস্থিরতা এইভাবে কেন বারান্দার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকে ? এমন দিনক্ষণে সবুজ পত্রালীখানা তোমার টেবিলে রেখে গেলাম। আমার কাছে তোমার কি আসা-যাওয়া হয় ? কত তোমার হাসির মুখশ্রীতে ধরে রাখো ওই মায়া। যাই, তোমার জন্য যাই। সুগন্ধি বুক নিয়ে যাই। তুমি কি আমাকে বুকে তুলে নেবে, নাকি মুখ লুকাবে অধৈর্যহীন উল্লেখযোগ্যতায়।
সময়োচিত ফলের শরীরজুড়ে
প্রভৃতি সুখানুভূতি- ফলবাগানের মধ্যে গিয়ে বিভিন্ন জাতের মাতৃকতা সাথে নিয়ে আসে। ফলবাগানের পাশ দিয়ে নানা ধরণের মহিষগাড়িকে চলে যেতে দেখা যায়। গাছের নিচ দিয়ে মহিষ গাড়ি প্রবাহিত হয়ে চলেছে মনোমুগ্ধকর বিকেলবেলা। সময়োচিত ফলের শরীর জুড়ে কতগুলো সুখানুভূতিশীল ধানক্ষেত পড়ে আছে পড়ে আছে সমন্বয়ের নানাজাতীয় তীরন্দাজ। আমার কয়লার স্তূপের উপর নরম স্নেহশীলতা দিয়ে গেল আজ।
প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায় ধানক্ষেত
প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায় ধানক্ষেত, আজ সন্ধ্যায় তার সঙ্গে দেখা হলো। শ্রীমতি শ্রীমতি সংগীত গাইছিল সে সারাদিন বন্ধুদের কাছে। লিখিত চিঠিতে মস্তিষ্কে অর্জিত বুদ্ধিমত্তা আর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার কথা লিখেছে। এখনো দূরে তার আক্ষেপ, ক্ষোভ, বেদনা, মনোবেদনা, নারীদের শয্যাপত্রে জীবন তৈরি হয়। স্বপ্ন ইতোমধ্যে পরিকল্পনা প্রসারিত করে অগ্রসর হচ্ছে। প্রতিদিন তার চিন্তাশীলতার মধ্যে, নগ্ন নম্রতার প্রতি লিখিত পত্রাবলিতে লেখেন, বিস্তারিত- আকাক্সক্ষার শ্যামলপত্র, সমুদ্রক্ষত। খোলা দুটি জানলা, মনোরম রবারের গাছটি ধানক্ষেতের সাথে বসে বসে দীর্ঘ এক আলাপচারিত করছে। শাহবাগের একটি মার্কেটের দোতালায় তার একটি ঘর আছে।
শ্রমসাধ্যের পরবর্তীকালে
বনাঞ্চলের দিকে পালক শ্বেতআভা করে তুলেছে- রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো জাদমন্ত্র জানা নেই, সবুজ কারুণ্য বিকেলবেলা ফসলের মাঠে বিশেষত ভূমিহীন, প্রক্রিয়াজাতকরণে ভূমিকাশীল। সে তার সাথে দেখা করে এল। অসাধরণ দুঃখ-শোকগ্রস্ত গাছগুলোকে মহিলারা প্রশ্রয় দেয়, শ্রমসাধ্যের পরবর্তীকালে।
প্রয়োজন বোধ করল
আমি মহৎ পুস্তকটির কাজগুলিকে দেখছিলাম, যে বিছানা কোনোদিন পুরুষসঙ্গী পায়নি আমি তার শয্যার ওপর পুস্তকটিকে রেখে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি। আজ সন্ধ্যার পর নিরুদ্বিগ্ন ফসলের ক্ষেতে তার মহৎ কাজগুলোকে ব্যাখা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন বোধ করল।
অর্থনীতি শুয়ে আছে
তোমাকে আত্মীয় তৈরি করে বাড়ি ফিরে যেতে চাই। বাড়ির বৃহদায়ন ঘর যে- পেঁয়াজের গন্ধে আড়ৎ করে রাখা আছে। ঘরের মধ্যে কাচা পেঁয়াজের বিস্তার ছড়িয়ে আছে, অর্থনীতি শুয়ে আছে।
বাড়ির কথা সম্প্রতি শ্যামল পার্কের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলার সময় মনে উদয় হয়। তোমার এই নিরবচ্ছিন্ন উৎসাহ, অসুখের কথা বর্তমানে যারা বলতে স্বীকৃতি দেয় না, তাদের কাছে ভয়ে ভয়ে দেখা-সাক্ষাৎ করি না। সাহস হয়ে ওঠে না। তাদের আঞ্চলিক ক্ষেত-খামারে, পদ্মপুকুরের ঘনশীতল ছায়ায়, যেয়ে ভিখেরী মনে হয়, অর্থহীন মনে হয়। এই চিন্তাভাবনা নিয়ে সম্প্রতি আমি রাত বেশি করে ঘরে ফিরি।
মালিবাগের বাসা ছেড়ে দেবো- এ জাতীয় চিন্তাভাবনাও করছি।
সুস্থ বীজের জন্মদিন
প্রস্ফুটিত হাতদু’টি কমনীয় ভিক্ষায় মগ্ন আর প্রসারিত। মগজের কাছে প্রশাখাবহুল দৃশ্যাবলি নানা স্বভাব গঠন করে চলেছে। এমন ম্রিয়মান মুখশ্রী তোমার, শ্যামলীতে তোমার বাসায় খোকন মাহমুদ আর আমি গিয়ে পাইনি তোমাকে।
ধানক্ষেতের পাখিগুলি উড়ে যাচ্ছে সাভারের হলুদ মাটির সন্ধ্যায় সকল নগ্নতা যদি থাকে, মুক্তি নামক নিম্নলিখিত মেয়েটি, সোনাদের কালিমন্দিরের পাশে চালতে গাছ তার ঘন শ্যামবর্ণের মধ্যে লুকিয়ে আছে। আমার প্রসারিত ভিক্ষার মধ্যে বীজদের কত সুখ্যাতি, যুবতীরা জন্মমালা দিয়ে যায়, আঁখিপক্ষের এই বিনয়দিনে, সুস্থ বীজের জন্মদিনে।
পড়তে যা ধানক্ষেত
তোমার সাথে বারবার দেখা হয় কেন ? দিন অস্ত যায়। সুনির্মাণ চেয়ে আছে- গাছদের বাগানে ছায়াতলায়, যত্নবান হয়ে ওঠে দেহকমল, বর্ষামাসের ধানময়জল। পায়ের দৃশ্যময়তার মধ্যে রক্তজবারেখা টানা রয়েছে। অপরিচিত ঘরের মধ্যে অন্ধকার বসবাস করে মেয়েদের ভোরবেলায় উঠিয়ে দিয়ে বলছে, পড়তে যা ধানক্ষেত।
৩. কবি সাযযাদ কাদির ৬০ দশকের বিশিষ্ট কবি। তিনি মহানুভবতায় আমার প্রথম কবিতা বইটির ফ্ল্যাপের লেখাটি লিখে দিয়েছিলেন। পাণ্ডুলিপির অনেকগুলো কবিতাই তার কাছে পাঠিয়ে ছিলাম। তিনি একজন শক্তিমান কবি ছিলেন বলেই আমার কবিতাকে শনাক্তকরণের মাধ্যমে তার মহত্বকে তুলে ধরেছিলেন। ফ্ল্যাপে উৎকীর্ণ তার লেখাটি তুলে ধরলাম- মেধান্বিত আবেগ, প্রাণের ঐশ্বয্যে দীপ্ত বোধ এ রকম অনেক সৃষ্টিলীলা থাকে কবিতার নেপথ্যে। এসব লীলা যেমন দেয় প্রেরণা, তেমনি দেয় স্বকীয় রীতিতে প্রকাশের শক্তি। রাগীব হাসানের কবিতায় দ্যুতি আছে শক্তির, আছে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের স্বাক্ষর; ‘সমন্বয়ের নানাজাতীয় তীরন্দাজ’ কাব্য গ্রন্থের সে প্রমাণ রয়েছে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত।
তার কবিতা পরিসরের সীমা ছাড়িয়ে ব্যাপ্তি পেয়েছে চেতনার সম্পূর্ণতায়; তাই কবি এখানে কোন ব্যক্তি নন, তিনি ব্যক্তিসমগ্র। তার জীবনের ভেতর বাইর উন্মোচিত হয়েছে নাগরিক হৃদয়, কিন্তু ওই হৃদয়কে ধারণ করে আছে দীপ্যমান লোকায়ত শরীর। এখানে রাগীব হাসান ব্যতিক্রমী, ভিন্ন, অনন্য। তিনি স্বতন্ত্র্য প্রধান, প্রাধান্যে স্বতন্ত্র।
৪. সবশেষে বলা যায়, সাযযাদ কাদির আমার কবিতা সম্পর্কিত যে কথাগুলো বলেছেন, তা, তার বিশাল হৃদয়ের পরিচয় বহন করলেও, আমার কবিতা এই প্রাপ্তির দাবি করতে পারে না। হ্যাঁ, এর কবিতাগুলো বোধিদীপ্ত হয়েই লেখা হয়েছিল, মনও ভেসে গিয়েছিল এর সঙ্গে, তুমুল সেই দিনগুলোয় ছিল পোতাশ্রয়ে একজন নাবিক যেভাবে লবণাক্ত হাওয়ায় দাঁড়িয়ে নোঙর তুলে সমুদ্রে ভাসান দেন, আমি লক্ষীছাড়া হলেও সেদিকে ছুটে ছিলাম নির্বিকার।