মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
এইচ বি রিতা
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ০৪:০০ পিএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

এইচ বি রিতার গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা

কবি এইচ বি রিতা। ছবি : সংগৃহীত
কবি এইচ বি রিতা। ছবি : সংগৃহীত

চক্রব্যূহ

হেঁটে যেতে যেতে শূন্যে হারিয়ে যায় পথ কিছু শেকড় সমান্তরাল কিছু এলোপাথারি মাটির গর্তে ঢুকে যায়

চক্রব্যূহ—উপরে ফেলে পায়ের চিহ্ন, সময়ের ছায়া ভাঙা আলোয় দুলতে থাকা স্মৃতির ধুলো যেখানে পথ শেষ, সেখানেই শুরু এক নতুন ভ্রমণের বিভ্রম।

দিনগুলো এলোমেলো হলেই- নিঃশব্দে গুঁড়িয়ে যায় মুহূর্তের কাচ অপেক্ষার মেঘ জমে থাকে দৃষ্টির কিনারে জীবন কি তবে একই পথের ঘূর্ণি, নাকি দিগন্ত ডেকে নেয় অজানা আকাশ?

অন্ধ প্রতিচ্ছবি

সে চেয়ারটা যত নরম, তত বেশি তার জড়তা। গদির নীচে পচে যাওয়া স্বপ্নের স্তূপ, তার চোখে বিলাসের আলো, অথচ, ভিতরে শূন্যতার এক গভীর খাদ।

সে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে, কিন্তু ত্বকের ভাঁজে জমে থাকা সময়ের ক্ষয় তার চোখে পড়ে না—সে দেখে শুধু রঙিন আলোর খেলা। তার হাতে দামি কাঁচের গ্লাস, তাতে ঢেলে দেয় শত বছরের মদ, মনে করে, ইতিহাসও তার ঠোঁট ছুঁয়ে বয়ে যাবে কিন্তু আসলে, সে গিলছে এক বুক শূন্যতা।

সোনার চামচের উজ্জ্বলতা, রুপোর থালার ঠান্ডা স্পর্শ, সব মিলিয়ে তার চারপাশে সাজানো এক অদ্ভুত জগত যেখানে ক্ষুধা নেই, অথচ অতৃপ্তি পাঁজরে লেগে থাকে। তার পাশ দিয়ে যখন এক ফাটা জুতোয় ক্লান্ত পা হেঁটে যায়, সে দেখে না, শুধু শোনে মৃদু টোকা যেন বাতাসে উড়ে যাওয়া কোনো পাতার শব্দ।

সে জানে, কাঁচের ঘরে থেকেও নিজেকে শক্ত মনে করতে হয়, কিন্তু জানে না—একটা পাথরই যথেষ্ট, তার সমগ্র অস্তিত্ব চূর্ণ করতে।

এভাবেই সে হাঁটে, বিলাসের আলোর নিচে, অন্ধ চোখে দেখে শুধুই নিজেকে, কিন্তু জীবন, সে তো কেবল এক আয়না- যেখানে আলো যত বেশি, ছায়াও তত দীর্ঘ হয়।

জেনেটিক কোড

আমরা কেবল কোষের বিন্যাস, ক্ষুদ্রতম জীবিত একক, এবং ডিএনএ'র ঘূর্ণায়মান সিঁড়ি আমরা প্রকৃতির এক লুকোনো ভাষা; যেখানে জীবন নিজেই এক কবিতা।

প্রাণের চক্র ঘোরে নিঃশব্দে— একটি কোষ বিভাজিত হয়ে নতুন জীবনের বার্তা বয়ে আনে। আর একটি স্পন্দন থেকে শুরু হয় সমস্ত অস্তিত্বের সংগীত।

তবে, হৃদয় স্রেফ স্নায়ুর প্রবাহ নয়, ভালোবাসার নিউরোট্রান্সমিটার বইছে তাতে মাইটোকন্ড্রিয়ার গভীরতায় লুকিয়ে আছে জন্মের আগের বিস্মৃত আলো।

একদিন এই কোষেরাও হারিয়ে যায় ডিকম্পোজারের হাতে নিঃশব্দে মিশে যায় তবু প্রকৃতি জানে- রক্তকণিকারা একদিন নতুন প্রাণের গল্প লেখে, নতুন কোনো বিবর্তনের সুরে।

স্বাধীনতার সংজ্ঞা

স্বাধীনতা কি আজকাল জাদুঘরের ধুলো জমা বই, নাকি মঞ্চের আলোর নিচে শেকল পরানো অভিনয়? তুমি বলেছিলে, একদিন স্বাধীনতার মানে আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন, নদীর মতো বয়ে চলা তবে কেন আজ, সে নদীর দুই পাড়ে কাঁটাতার?

কালো স্যুট-পরা মানুষরা স্বাধীনতার ভাষণ দেয়, আমি দেখি, তাদের হাতের ফিতেগুলো শক্ত করে বাঁধা স্বাধীনতার সংজ্ঞা পাল্টে গেছে কি? নাকি আমরা ভুলেই গেছি, কী ছিল তার রঙ?

একটা পতাকা উড়লেই কি স্বাধীনতা আসে? নাকি স্বাধীনতা মানে শুধু নতুন শিকল? তুমি কি বলবে, আজ রাতের শহরেও কারো চোখে স্বাধীনতার আলো জ্বলে?

যদি স্বাধীনতা মানে বুক ভরে নিঃশ্বাস, তবে কেন শহরজুড়ে ধোঁয়া আর বন্দুকের শব্দ? যদি স্বাধীনতা মানে মুক্ত বাতাস, তবে কেন দেয়াল গড়ে ওঠে প্রতিবাদের চারপাশে?

আমি এখনো সন্ধ্যার বাতাসে খুঁজি সেই উত্তর, যে স্বাধীনতার মানে একদিন ছুঁয়েছিল আকাশ যেখানে মিছিলের শ্লোগান ছিলো কেবল ভালোবাসা; আর শেকল শব্দহীন ঝরে পড়তো পায়ের নিচে।

শূন্যতারও আছে শেষ

এই শূন্যতা— নিস্তব্ধ মাঠের মতো বিস্তৃত, তোমার দীর্ঘশ্বাসে জেগে থাকে অকথিত সন্ধ্যার রঙিন মেঘ, যেখানে পাখিরা ফেরে না আর ফুলেরা মরে যায় অন্ধকারের ভেতরে। এত শূন‍্যতা-কোথা থেকে আসে বলো?

দূরে কোথাও, জ্যোৎস্নার আলো বুনে দেয় মাটির ওপর স্নিগ্ধতা, মৃত নদীর বুকে ঢেউয়ের ধ্বনি জীবনের অনন্ত পথঘাটে কে যেন রেখে গেছে নক্ষত্রের ছায়া; যার নিচে দাঁড়িয়ে আমি, তোমার নিঃশব্দ প্রশ্ন শুনি। তোমার চোখের ভিতরে আমি দেখি চেনা আকাশের অপরিচিত ভাষা-যেখানে সন্ধ্যার কাক ডেকে যায় ফিরে না তাকিয়ে।

আমাদের শূন্যতা—হেমন্তের গাছের মতো নীরব, আমাদের শিকড়ে জেগে থাকে জন্ম আর বিলয়ের গান। তবু, আকাশে ভাসে এক অদ্ভুত আলো, যেন কোনো গোধূলি আমাকে ছুঁয়ে বলে— শূন্যতারও আছে শেষ।

তোমার আমার মিলনের পথ হয়তো- এই শূন্যতায়ই লেখা।

সময়ের প্রহসন

এই পৃথিবী, মাটির শরীর, জলরঙা আকাশ আর বাতাসের অদৃশ্য স্বরলিপি- তোমাকে চিনি না এখনো, তবু প্রতিদিন তোমার সঙ্গে এক অদ্ভুত চুক্তি করি; জীবনের নামে, সময়ের নামে।

তোমার সূর্য, তোমার নদী, তোমার দিগন্ত-সব কি সত্যি? নাকি তুমি শুধু এক দীর্ঘ প্রতারণা, যার ভিতরে গোপনে নশ্বরতার ছায়া?

গাছের পাতা ঝরে, তবু জন্ম নেয় নতুন কিশলয়। কিন্তু কীসে বাঁচে এই বৃত্তান্ত?

নদীর স্রোত বয়, তবু শীতল জলও শুকায় পাহাড়ের চূড়ায় শোভা পায় তুষার, আবার গলে গিয়ে হয় নদী নশ্বরতার এই খেলায় প্রশ্ন করি- কিছু কি স্থির, নাকি সময়ই সত্য?

মৃত্যু কি তবে কেবল এক অস্থায়ী বিরতি? নাকি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই আমরা মরতে শিখি?

তোমাকে প্রশ্ন করি, পৃথিবী- তোমার এই নিত্য পরিবর্তন কি শুধু প্রহসন, নাকি সেটাই চিরন্তন?

জানি না উত্তর, তবু প্রশ্ন রাখি পৃথিবীর বুকে- ‘তুমি কি বেঁচে আছো, নাকি শুধু তোমার স্মৃতি?’

মহাবিশ্বের মহাকাব্য

এই যে মহাবিশ্ব- তারা, গ্রহ, ধূলিকণা আর শূন্যতা এক ল্যাবরেরি, আলো আর অন্ধকারের সমীকরণে বাঁধা।

প্রতিটি কণা, প্রতিটি রূপান্তর শুধুই কী পদার্থের খেলা? নাকি এর ভিতরে লুকিয়ে আছে অস্তিত্বের চিরন্তন সত্য?

বিজ্ঞান বলে-জীবন এক রসায়ন, এক বায়োকেমিক্যাল সংঘাত। কিন্তু আমি যা অনুভব করি আমার হৃদয়ের যে কাঁপন সে কি শুধুই নিউরনের নাচ?

দর্শন বলে-আমি নশ্বর এ সত্তা একদিন মিশে যাবে শূন্যতায় তবু প্রশ্ন জাগে, এই শূন্যতার ভিতরে কে রচনা করল অস্তিত্বের গান?

সূর্যের আলো, গাছের শ্বাস, পৃথিবীর ঘূর্ণন- সবকিছুর ভিতরে আছে ছন্দ, তারা-সেও একটি আগুনের ভাষা নিঃশব্দে বলে চলা আলোকবর্ষের গল্প।

কিন্তু এরও বাইরে কিছু আছে, এক অসীম নৈঃশব্দ্য, যা রসায়নের চেয়ে বড়, গণিতের চেয়েও গভীর।

ভাবনারা অনাহূত, জানি তাই তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে বিজ্ঞান আর দর্শনের মাঝে দাঁড়িয়ে অনুভব করি- বিশ্ব এক মহাকাব্য, আর আমি তার এক ক্ষুদ্র পদ্য।

থামা-না থামা

আমি তাকে দেখি খুঁড়িয়ে হাঁটে, হাতে লাঠি—চলার ভার আর লুকিয়ে রাখা বেদনা, পাশের পথ ধরে ভেসে ওঠে হালকা এক শেকড়ের স্মৃতি কারো ফেলে আসা বয়সের চিহ্ন আমি থেমে যাই, অথচ জীবন থামে না।

পাখিরা তখনো আকাশে ডানা মেলে, কেউ রান্নাঘরের হাড়িপাতিল নাড়ায়- জীবন বয়ে চলে স্রোতের মতো আমি শুধু সেই থেমে যাওয়া বিষাদে ডুবে থাকি।

আমি দেখি, আমার চারপাশে গাছের ছায়া লম্বা হয়ে আসে, তবু ভোরের আলো ভাসে; এই থেমে যাওয়া বুকে বয়ে চলে এক নিস্তব্ধতা- আমি তাকে দেখি, দেখি নিজের ছায়া মনে হয়, একদিন আমিও বুঝি এমন করেই একটা ম্লান স্মৃতির শেকড়ে বাঁধা থেকে যাবো বেদনার ভারে, জীবন ছুটে যাবে পাশ কাটিয়ে।

লাভ-ক্ষতির হিসাব

প্রশ্ন জাগে। বুকের বাঁ-দিকে রৌদ্রের কণা পুষ্ট করে কী লাভ? যখন তোমার মেধাজাল রাজপথের কর্দমে বিস্রস্ত- যখন পাশের নির্জন গলিতে বসেছে লাভের নিবিড় আসর; তলোয়ার আর মুদ্রার এক গোপন ও পিচ্ছিল কোলাকুলি।

আনাসের জননী দ্বারে বসা, সেখানে নিথর হাওয়া ছাড়া কোনো কড়া আর নড়ে না। দেশের বক্ষ চিরে যে নদী নামে- তার গর্ভে আজ শুধু বঞ্চনার গাঢ় পলি।

দেশপ্রেম? এ তো এক মহার্ঘ নীল সিন্দুক। তোমরা যখন সেই শবাধারে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করো মহতী ভাষণ, তোমাদের প্রচ্ছন্ন পকেটে বাজে ধূর্ত মুদ্রার গুঞ্জরণ। শহীদের রক্তে অঙ্গুলি নিমজ্জিত করে- তোমরা আজ স্বাক্ষর করছো নতুন ইজারার লিপিতে।

হে রাজনীতির কুহকী জাদুকর... তোমাদের ওই স্বর্ণ-সিংহাসনের স্তম্ভগুলো একেকটি কঙ্কালের ভিতে প্রোথিত।

শহীদের জননী যখন জিগ্যেস করেন, 'কী ফল লভিলাম?' তখন তোমাদের গগনচুম্বী বুলিগুলো মিলিয়ে যায় বাতাসে—মৃত লাশের নিরুদ্ধ পচা গন্ধে।

পঙ্গু বালকের জীর্ণ ক্রাচখানি আজ রাজদণ্ড, আর তোমরা সেই যষ্টি নিয়ে খেলছো এক বীভৎস ছিনিমিনি।

জননী আজ সম্যক জানেন- দেশ মানে আজ তোমাদের হৃষ্টপুষ্ট ফায়দা, আর আমাদের বক্ষ-পঞ্জরে কেবল এক অনন্ত হাহাকার।

স্মৃতিভুক সময়

আমি ঘৃণা করি সেই আপসকে, যা শহীদের মা-কে আজ আবার নিঃস্ব করে দিল। আমি ঘৃণা করি সেই চেয়ারকে, যা রক্তের ওপর পা রেখে পুরোনো স্বৈরাচারকে চুমু খায়।

ঘৃণা করি নিজেকে যখন বদলাতে হয় রঙ কিংবা মুখোশ পরে সাজতে হয় কোনো চাটুকার।

আমি ঘৃণা করি সেই নিস্তব্ধতাকে, যা ঘাতকের অট্টহাসিকে বৈধতা দেয়। আমি ঘৃণা করি সেই কলমকে, যা সত্যের পিঠে ছুরি মেরে মিথ্যার মহাকাব্য লেখে।

ঘৃণা করি সেই বিবেককে, যা অন্যায়ের সামনে নতজানু হতে শেখায়- কিংবা সেই মেরুদণ্ডকে, যা আদর্শের বোঝা সইতে না পেরে ভেঙে পড়ে বারবার।

আমি ঘৃণা করি সেই ভস্মাধার থেকে উঠে আসা ছায়াদের- যারা তরুণের তাজা রক্তে স্নান করে ধুয়ে নিল নিজেদের কারাবাসের ধুলো, সতেরো বছরের জীর্ণ শীতঘুম ভেঙে যারা আজ রাজমুকুটে হাত রাখে; অথচ ভোরের সূর্যকে সাক্ষী রেখে যারা রক্তবীজ বুনেছিল, সেই জুলাই এর নাম বিস্মৃতির অতলে ছুঁড়ে দিতে চায়।

আমি ঘৃণা করি সেই শকুনের উল্লাসকে, যা লাশের মিছিলে বসার আসন খোঁজে- কিন্তু চেনে না সেই মুখগুলো, যাদের হাহাকারে একদিন বিদীর্ণ হয়েছিল এই মাটির পাঁজরা।

আমি ঘৃণা করি নিজেকে, যখন অন্যের সুবিধায় টেনে দিতে হয় লক্ষ্মণরেখা- কিংবা নিজের গণ্ডি বাঁচাতে হাত বাড়াতে হয় অন্যায্য অধিকারে। ঘৃণা করি আমার এই তথাকথিত প্রগতিকে, যা কেবল নিজের উত্তরণ চেনে, অন্যের পতনকে সিঁড়ি করে উঠতে শেখায় চূড়ায়।

আমি ঘৃণা করি! ঘৃণা করি আজকের এই সময়কে।

অপরাধবোধের নুন : ফ্লাশিংয়ের রাত

কনকনে দাঁত বসানো মাঝরাত- ফ্লাশিং-এর হিমেল হাওয়ায় আমার কান মাথা ঢাকা, আমি হাঁটছি, ছায়াটা আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে হঠাৎ এক জোড়া জুতো থামল পাশে। খুব কাছে। এক চিলতে ঘাম আর তামাকের গন্ধ মেশানো একটা প্রশ্ন— ‘মে আই হ্যাভ আ সিগারেট?’

আমি তাকালাম। লোকটার চোখে তখন তৃষ্ণার্ত এক ধুলোঝড়। আমি মাথা নাড়লাম খুব ধীরে, এক মস্ত বড় পাথর নিয়ে যেন- ‘আই ডোন্ট স্মোক।’

ব্যস! থমকে গেল ফ্লাশিং-এর সমস্ত ট্রাফিক। লোকটার চোখের মণি দুটো তখন দুটো আশ্চর্যবোধক চিহ্ন! সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে এমনভাবে- যেন আমি কোনো পবিত্র মন্দিরে আগুন দিয়েছি, যেন এই তীব্র শীতে কারো কম্বল কেড়ে নিয়েছি মাঝপথে।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম অপরাধীর মতো। পকেটে হাত দিয়ে খুঁজলাম-যদি ভুল করে একটাও থাকে! নেই। কোথাও নেই। আমি যে ধোঁয়া ওড়াতে জানি না, এটা কি তবে তার চোখে সবচেয়ে বড় পাপ?

আমি তো অনেক কিছুই পারি না। আজ এই পচে যাওয়া সময়ে দাঁড়িয়ে যেমন পারি না ঘাতকদের নাম ধরে চিৎকার করতে। যে-বিচার রক্তে কেনা গেল না, পারি না হতে তার কাশফুল।

পারি না পুড়ে যাওয়া বসতভিটার ভস্মস্তূপ থেকে তিল তিল করে সত্যের হাড়গোড় কুড়িয়ে আনতে; আমি পারি না পাপিষ্ঠ ধর্ষকের চোখে চোখ রাখতে, কারণ তাদের চোখের মণি কোনো নরক চেনে না, চেনে না কোনো লজ্জা।

এই যে অশ্বত্থের মতো বড় হচ্ছে নীরবতা, গিলে খাচ্ছে প্রতিদিনের সত্য- আমি পারি না তাকে চুরমার করতে। আমি কিছুই পারি না।

ফ্লাশিং-এর এই মাঝরাতে, একটা সিগারেট দিতে না পারার যে অপরাধবোধ- তার চেয়েও বড় অপরাধ জমে আছে আমার শহরে, আমার মগজে।

আমি হাঁটি, আর আমার ভেতরে বাজে সেইসব না- পারাদের বিষণ্ণ সুর। আমি শুধু হাঁটি, আর দেখি- সব সত্যই আজ একটা করে জ্বলন্ত সিগারেট হয়ে ওঠে, যা আমি জ্বালাতে পারি না, আর কেউ অহেতুক আমার কাছে এসে খোঁজে।

স্মৃতির সরা

আবার কি তবে হবে ফেরা? সেই যে উঠোনে পড়ে থাকা ভাঙা সরা আর তার পাশে একলা কোনো মাটির হাড়ি তার তো কোনো দেশ নেই, নেই কোনো বাড়ি।

সে শুধু জানে অন্ধকার এক কোণে চুপ করে বসে থাকা, ভেতরে তার কত সহস্র বছরের খিদে আর বাইরের গায়ে আঁকাবাঁকা ধুলোবালির কয়েকটা আঁচড়।

তুমি কি তাকেই খুঁজছিলে? নাকি তার শূন্যতার ভেতরে নিজের মুখ একবার দেখে নিতে চেয়েছিলে?

বলো, হে মাটির হাড়ি- তোমার ভেতরে কি এখনো বাষ্প জমে? নাকি সেখানেও এখন কেবল শুকনো পাতার শব্দ আর হাহাকার কমে?

প্রাচীন বৃক্ষ

এইখানে আজো দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো বৃক্ষের শিকড়েরা জানে- কত ঝঞ্ঝা পেরিয়েছে, কত পুরাতন ছালে জড়ানো ইতিহাসের প্রেম, যুদ্ধ, আর কত না নির্বাণ ধারণ করে আছে।

এই শাখা-জন্মের শক্তিতে দুর্ভেদ্য, মজবুত, এ শতকের বসন্ত-গ্রীষ্মের দাপট ভাঙতে পারে না তার অবিচল মেরুদণ্ড; কোনো ক্ষণিকের ঝড় জানে না এর স্থৈর্যের গভীরে কত আস্থার বাঁধন লুকোনো আছে।

কেবল বৃক্ষ জানে- সময়ের কুঠারও একদিন ক্লান্ত হয়, পাতার ফাঁকে ইতিহাসের নিঃশ্বাস আর; তার গায়ে লেগে থাকে ধূলি, রোদ, মানুষের নিঃশব্দ প্রার্থনা- প্রতিটি দাগে এক অনন্ত বেঁচে থাকা লিপি।

নদী বদলায় পথ, শহর ঘুমিয়ে পড়ে ধোঁয়ার চাদরে, এই বৃক্ষ -মাটির উষ্ণতা নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে- এক অদৃশ্য সাক্ষীর মতো।

অস্থিরতার অর্ঘ্য

একটি চক্রাবর্তে বেঁধে গেছে জনমের ক্রোধ যেনো জিউসের বিদ্যুৎ শিখা আকাশের বুক চিরে ফেলছে ধ্বংসের অশনি সংকেত ছড়িয়ে দিচ্ছে চারিদিকে।

দেখি-চাঁদের আলোয় অ্যারিসের ছায়া নেচে বেড়ায় অ্যাথেনার চোখে বিক্ষোভ, মনে হয়, পৃথিবীর কোনো এক কোণ নতুন যুদ্ধের আগমনী বার্তা শুনছে।

প্যান্ডোরা'রা ভুল করে বাক্সটি খুলে দেয় অস্থির পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ে অশুভ শক্তি পৃথিবীতে, মর্ত্যের মানুষের দেহে, মনে।

পৃথিবী কাঁপছে আমি কাঁপছি আরশিতে ভেসে ওঠছে অ্যাকিলিসের প্রতিচ্ছবি, যুদ্ধের উত্তাপে জ্বলে উঠছে চিরকালীন ক্রোধ এক অসমাপ্ত অস্থিরতা যার অবসান নেই, নেই মুক্তি।

এমনই সময়ে প্রমিথিউসের বাণী শুনতে পাই দেখি, মানুষের জ্বলন্ত হৃদয়ে প্রতিধ্বনি উঠছে শিকলবাঁধা স্বাধীনতার মুক্তির আহ্বানে।

আমি শুধু ভাবছি -যখন সবকিছু শেষ হবে,

হয়তো তখনই মিলবে প্রশান্তি।

আর্দ্রতা ও অনাহা

সে ছিল এক ক্ষীণকায় প্রতিচ্ছবি, শহরের ভেজা কোলাজে কনক্রিটের ছাঁদ গলে গলে ঝরে পড়া ছাই- জলের ভিতর হঠাৎ ফুটে ওঠা এক কাঁচা শব্দ -‘ফুল লাগবে?’

তোমরা যাকে বলো ফুল সে আসলে তার শরীরের রক্ষাকবচ একজোড়া প্লাস্টিক, যা জলে ডোবে না, ক্ষুধা ঠেকাতে পারে না।

বৃষ্টি ছিল না কেবল ঋতু, ছিল উচ্চারণহীন এক প্রত্যাখ্যান প্রতিটি ফোঁটা মুখ থুবড়ে পড়েছিল তার অবুঝ হাড়ে হাড়ে যেন ঈশ্বর ভুল করে শুদ্ধ বানানে একটি অনুচ্চ নাম রেখেছে - ‘বেঁচে থাকা’।

শহর ছাতা মেলে ছুটে যায় হাইরাইজের বুকে, আর সে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে, ভেজা আঙুলে গুনে নেয় জীবনের মোট ছিদ্রসংখ্যা।

তার চোখে যে জল ছিল, তা কেবল বর্ষার অংশ নয় তা ছিল এক শিশু উপমা, যে শব্দ খুঁজে পায় না ভাষায়, শুধু বারবার বলে - ‘ফুলল লাগবে? একশো টাকা!’

কে জানে, সে হয়তো জানে না অর্থনীতির সংজ্ঞা, কিন্তু জানে - ভিজে গেলে সর্দি হয়, সর্দি হলে শরীর দোলে, আর শরীর দুললে বিক্রি বাড়ে না কিছুই।

তবু দাঁড়িয়ে থাকে সে, বৃষ্টিকে ওড়না বানিয়ে, জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করে....

লেখক পরিচিতি : এইচ বি রিতা-পেশা-শিক্ষকতা। দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে তিনি স্নায়ুবিক, মানসিক ও জ্ঞানীয় বিকাশে পিছিয়ে থাকা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করছেন। তিনি নিউইয়র্ক সিটিতে 'এইচ.আর কানেক্ট'-প্রশাসনিক সহকারী হিসাবে এবং ইউনাইটেড ফেডারেশন অফ টিচার্স-এ কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। শিক্ষকতা করেছেন নিউইয়র্ক সিটির ভার্চুয়াল হাইস্কুল 'এ স্কুল উইদাউট ওয়ালস'-এ।

এইচ বি রিতা-বাংলাদেশের নরসিংদী শহরে মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছেন দীর্ঘ ২৭ বছর যাবত। তিনি নিউইয়র্কের 'টুরো কলেজ এন্ড ইউনিভার্সিটি' থেকে তার উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন। এইচ বি রিতা একজন সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট, এবং কবি।

তার ৮টি কাব্যগ্রন্থ সহ দুটো উপন্যাস, একটি প্রবন্ধ, দুটো ছোটগল্প, দুটো স্মৃতিচারণমূলক বই এবং জুলাই ছাত্র জনতার বিপ্লব নিয়ে চব্বিশের অভিধান ‘২৪-এর জুলাই ছাত্র-জনতার বিপ্লব’ নামক একটি বই প্রকাশ হয়েছে। এরমধ‍্যে ইংলিশে একটি স্মৃতিচারণ ও একটি কবিতার বই প্রকাশ হয়েছে ম্যাককিনলি পাবলিশিং হাব, যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এ বছর ২০২৬-এ তার একটি উপন‍্যাস, একটি কাব‍্যগ্রন্থ ও প‍্যারেন্টিং নিয়ে গবেষণামূলক বইটি প্রকাশ হচ্ছে ঘাসফুল প্রকাশনী থেকে।

এইচ বি রিতার গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১০

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

১১

এনসিপিতে যোগ দিলেন বিভিন্ন দলের শতাধিক নেতাকর্মী

১২

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্য : হালাল পণ্যে বড় সম্ভাবনা

১৩

ছেলের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা

১৪

মুক্তির আগেই সাফল্যের দুয়ারে ‘ককটেল ২’

১৫

ইসরায়েলে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

১৬

নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার : মঈন খান

১৭

অতিরিক্ত ফাউলের অভিনয় করলে বিশ্বকাপে দেখতে হবে হলুদ কার্ড

১৮

ছাত্রলীগ নেতা ডেবিট আটক

১৯

ভারতের পুশইন নিয়ে ছাত্রদল নেতা আবিদের স্ট্যাটাস ভাইরাল

২০
X