

টানা ভারী বৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে সিলেট অঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি থাকায় নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। একইসঙ্গে অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড় ও টিলা ধসের ঝুঁকি বাড়ায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।
অন্যদিকে টানা বৃষ্টিতে নগরজুড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্কুলগামী শিক্ষার্থী, দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ নিম্ন আয়ের মানুষ।
টানা বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেকেই ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১২ দশমিক ৩৪ মিটার (এমএসএল), যেখানে বিপদসীমা ১২ দশমিক ৭৫ মিটার। সিলেট পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৯ দশমিক ৮০ মিটার, যা বিপদসীমা ১০ দশমিক ৮০ মিটারের নিচে রয়েছে।
কুশিয়ারা নদীর অমলশীদ পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১৪ দশমিক ৫১ মিটার, শেওলায় ১২ দশমিক ১১ মিটার, ফেঞ্চুগঞ্জে ৯ দশমিক ৬৯ মিটার এবং শেরপুরে ৮ দশমিক ৫০ মিটার। প্রতিটি পয়েন্টেই পানি বিপদসীমার নিচে থাকলেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে সারী-গোয়াইন অববাহিকার জাফলং পয়েন্টে গোয়াইন নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১০ দশমিক ২৮ মিটার, যেখানে বিপদসীমা ১০ দশমিক ৮২ মিটার। একই অববাহিকার সারীঘাট ও গোয়াইনঘাট পয়েন্টেও পানির উচ্চতা বিপদসীমার নিচে রয়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সিলেটে ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
নগরীর পাঠানঠুলার রিকশাচালক আব্দুস সোবহান কালবেলাকে বলেন, ‘টানা বৃষ্টির কারণে সারাদিন রিকশা নিয়ে বের হতে পারছি না। যাত্রীও কম। যা আয় হচ্ছে তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।’
নগরীর আম্বরখানার দিনমজুর সোহেল খান কালবেলাকে বলেন, ‘বৃষ্টি হলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। দুই-তিন দিন কাজ না থাকলে পরিবারের খাবার জোগাড় করাই কষ্টকর হয়ে পড়ে। এখন সবচেয়ে বেশি বিপদে আছি আমরা নিম্ন আয়ের মানুষ।’
ফুটপাতে চা ব্যবসায়ী রফিক মিয়া বলেন, ‘সারাদিন বৃষ্টির কারণে দোকানে ক্রেতা আসে না। বিক্রি অর্ধেকের চেয়েও কমে গেছে। ব্যবসার পাশাপাশি সংসারের খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।’
নগরীর আখালিয়ার সোমা বেগম কালবেলাকে বলেন, ‘একটু ভারী বৃষ্টি হলেই সড়কে পানি জমে যায়। অফিস, স্কুল কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে বের হতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বৃষ্টির সময় রাস্তায় পানি জমে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। আবার যাত্রীও কম থাকে। ফলে আয় কমে যাচ্ছে।’
নগরীর ছড়ার পাড়ের গৃহিণী রুনা বেগম কালবেলাকে বলেন, ‘নদীর পাড়ের নিচু এলাকায় থাকি। টানা বৃষ্টি হলেই বাসার আঙিনায় পানি উঠে যায়। বৃষ্টি আর নদীর পানি বাড়ার খবর শুনে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকি।’
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন কালবেলাকে বলেন, আগামী তিন থেকে চার দিন সিলেট বিভাগে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকলেও নির্দিষ্টভাবে কত মিলিমিটার বৃষ্টি হবে তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সিলেটে হওয়ার সম্ভাবনা কম। বর্তমান পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি বা কোনো বড় দুর্যোগের আশঙ্কাও আপাতত নেই। তবে বন্যা ও নদ-নদীর পানির পরিস্থিতি সম্পর্কে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আপডেট ও সতর্কবার্তার দিকে নজর রাখতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতার স্বার্থে এসব তথ্য নিয়মিত প্রচারেরও আহ্বান জানান তিনি। আগামী কয়েকদিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলেও আতঙ্কের কারণ নেই সবাইকে সতর্ক থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ কালবেলাকে বলেন, এখন পর্যন্ত সুরমা, কুশিয়ারা, সারি-গোয়াইন ও পিয়াইনসহ সিলেটের সব নদ-নদীর পানি বিপদসীমার নিচে রয়েছে। তবে কুশিয়ারার অমলশীদ ও ফেঞ্চুগঞ্জ এবং সুরমার কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। এখনো জেলার কোথাও প্লাবনের ঘটনা ঘটেনি।
তিনি বলেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টির খবর পাওয়া গেলেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। উজানের পানি দ্রুত মেঘনা নদীতে নেমে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় পানি আটকে থাকে না। এখন পর্যন্ত বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সিলেটের জন্য বড় ধরনের বন্যার কোনো সতর্কতা জারি করেনি। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে কয়েকটি পয়েন্টে পানি সাময়িকভাবে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। বৃষ্টি কমে গেলে এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই পানি নেমে যাবে। তাই সিলেটে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা নেই। সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।