

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবিতে স্লোগানে উত্তাল ছিল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। একের পর এক সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও গুলির শব্দে ভারী হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস।
সেই মুহূর্তে পুলিশের অস্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দেন শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের ছোড়া গুলিতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে দুপুর ৩টা ৫ মিনিটে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের ট্রলিতে পড়ে থাকা বন্ধুর নিথর দেহ ঘিরে তখন জড়ো হন সহপাঠী ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। কান্না আর ক্ষোভের মধ্যে তারা শপথ নেন ‘বিচার হবে রাজপথেই, এ হত্যার বিচার ছাত্ররাই করবে।’
এই ঘোষণার পর ট্রলিতেই আবু সাঈদের মরদেহ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু পুলিশ লাইনস মোড়ের কাছে পৌঁছালে পুলিশ তাদের কাছ থেকে মরদেহটি ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা। এর প্রতিবাদে অনেক শিক্ষার্থী সড়কে বসে পড়েন, কেউ কেউ শুয়ে পড়ে বিক্ষোভ জানান।
সেদিনের সেই মিছিলে ছিলেন আবু সাঈদের বন্ধু ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাইসুল ফারিদ।
রাইসুল বলেন, ঘটনার সময় পুলিশের গুলিতে আহত বন্ধু তুহিনকে নিয়ে প্রথমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান তারা। তুহিনকে ভর্তি করার কিছুক্ষণ পর খবর আসে, আবু সাঈদও গুলিবিদ্ধ হয়ে একই হাসপাতালে আনা হয়েছে। ছুটে গিয়ে চিকিৎসকের কাছে জানতে চাইলে প্রথমে কোনো উত্তর মেলেনি। পরে এক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক এসে শুধু বলেন, ‘আবু সাঈদ আর নেই।’
তিনি জানান, সেই মুহূর্তটা ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। হাসপাতালে তখন ১৫ থেকে ২০ জন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিই, অ্যাম্বুলেন্সে নয়, ট্রলিতেই সাঈদের মরদেহ ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়া হবে। ‘রাজপথ দেখেই যাবে সাঈদ।’
তিনি বলেন, ‘মরদেহ হস্তান্তরের আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার কথা বলে সময়ক্ষেপণ করছিল। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক হাসপাতালে এলে শিক্ষার্থীরা তাদের সামনে নিজেদের সিদ্ধান্তের কথা জানান।’
সেখানেই আবু সাঈদের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে রাইসুল ঘোষণা দেন, ‘আমরা দেশের প্রশাসন, আইন বা বিচার বিভাগের ওপর আর কোনো ভরসা রাখি না। এই হত্যার বিচার রাজপথেই হবে, ছাত্ররাই এর বিচার করবে।’
এরপর হাসপাতালের ট্রলিতে মরদেহ নিয়ে মিছিল বের হয়। রংপুর শহরের সড়কে তখন ধ্বনিত হচ্ছিল, ছাত্রের বুকে গুলি কেন, প্রশাসন জবাব দাও, আমার ভাই মরলো কেন, প্রশাসন জবাব দাও।
রাইসুল জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় অতিক্রম করার পর পুলিশ মিছিলে বাধা দেয়। শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যেতে চাইলে পুলিশ লাইনস মোড়ে অন্তত ৪০ জন সদস্যের একটি দল তাদের ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পুলিশ বলপ্রয়োগ করে মরদেহটি নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনার প্রতিবাদে আমরা রাস্তায় শুয়ে পড়েছিলাম। কেউ পিছু হটিনি। তখনই শপথ নিয়েছিলাম এই হত্যাকাণ্ডের বিচার রাজপথেই আদায় করব।’
১৬ জুলাইয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হলো যেভাবে
১১ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। কিন্তু মিছিল শুরু হওয়ার আগেই ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরবর্তীতে মিছিল না করতে ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শরিফুল ইসলাম আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলেন । তবে শিক্ষার্থীরা জানায়, তারা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে পার্কের মোড় ঘুরে আবার ক্যাম্পাসে ফিরে আসবে। মিছিলটি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেট (বর্তমানে আবু সাঈদ গেট) এর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন প্রক্টর ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কয়েকজন এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিছিলটি আটকে দেয়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ব্যানার কেড়ে নেয়।এ সময় আবু সাঈদসহ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে মারধর ও ধাক্কাধাক্কি করে।
এরপর ১৪ জুলাই স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের রাজাকারের সন্তান বলার পর ছড়িয়ে পড়ে উত্তাপ। রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার-রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার-স্বৈরাচার’, ‘চাইতে এলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ প্রভৃতি স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। একই স্লোগানে উত্তাল হয় সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলো।
এরপরে ১৫ই জুলাই বিকেলে এ স্লোগান ও কোটা আন্দোলনের বিরুদ্ধে বেরোবি ক্যাম্পাসের ১ নং গেটে শোডাউন দেয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ,স্বেচ্ছাসেবক আওয়ামীদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এসময় সেখানে আন্দোলনকারীদের নানা হুমকি দিয়ে বক্তব্য দেয়। পরে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া ফেসবুক পোস্টে লেখেন 'মাঠ ফকফকা,রাজপথ ঝকঝকা'। এই পোস্টে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় রংপুরের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন দমনে এমন উল্লাসসূচক মন্তব্য দেখে তারা বিক্ষুব্ধ হন।
আবু সাঈদ শহীদ হলেন যেভাবে
আগের দিন ক্যাম্পাস গেটে ছাত্রলীগ-যুবলীগের আগ্রাসী আচরণ, শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিবাদ ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমর্থনে ১৬ জুলাই সকালে জিলা স্কুলের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেন রংপুরের ছাত্ররা। জিলা স্কুলের সামনে জড়ো হন কয়েকশো শিক্ষার্থী। একটি মিছিল নিয়ে টাউন হল প্রদক্ষিণ করার কথা ছিল তাদের ।
দুপুরের দিকে সেখান থেকে তারা একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে টাউন হলের দিকে অগ্রসর হলে, পুলিশ লাইন্স মোড়ে এসে বাধার মুখে পড়ে। পুলিশ মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ শুরু করে। এসময় কোতোয়ালি জোনের তৎকালীন সহকারী কমিশনার আরিফুজ্জামান ও কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ওসি (তদন্ত) শাহ আলম সরদারের নির্দেশেই ওই লাঠিচার্জ চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় সরাসরি অংশ নেন ওসি শাহ আলম।
এ সময় পুলিশ সদস্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর বেপরোয়াভাবে লাঠিচার্জ চালান।
এরপর শিক্ষার্থীরা পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। তারা প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে মিছিল শেষ করবে বলে জানায়। কিন্তু প্রেসক্লাব চত্বরে পৌঁছানোর আগেই জাহাজ কোম্পানি মোড়ে আরেকবার পুলিশের বাধায় পড়ে। এরপর তারা মড়ার্ণ মোড়ে গিয়ে অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এরপর তাদের মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মডার্ন মোড়ের দিকে এগোতে থাকলে পথে পথে যোগ দেয় শতশত শিক্ষার্থী। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাবার সময় সেখানে গেট ব্লক করে পুলিশের অবস্থান দেখে দাঁড়িয়ে যান। এবং তাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে স্লোগান দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের উপর লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ শুরু করেন। কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ধাওয়া দিয়ে বেধড়ক পেটায় পুলিশ। এ সময় আবু সাঈদকেও পেটান পুলিশ।
পরে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তাদের দমাতে পুলিশ টিয়ার শেল, রাবারবুলেট, ছররা গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। একপর্যায়ে বন্দুক তাক করা পুলিশের খুব কাছে এসে দু'হাত প্রসারিত করে দেন আবু সাঈদ। এসময় পুলিশ খুব কাছে থেকে তাকে গুলি করলে তিনি রোড ডিভাইডারে পার হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এসময় তাকে রিকশাযোগে হাসপাতালে নিয়ে যান আন্দোলনকারীরা। হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলনের অগ্নিগর্ভে পরিণত হয় রংপুর।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড
আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে রোড ডিভাইডার পার হয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার সময় তাকে প্রথম ধরেছিলেন আরসিসিআই স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী আয়ান আহসান। পরে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্কসবাদী) রংপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক সাজু বাসফোর, মাহীগঞ্জ কলেজের শিক্ষার্থী নিপুন রায় এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন তাকে উদ্ধার করেন।
সাজু বাসফোর বলেন, প্রথমে ব্যাটারিচালিত রিকশায় আবু সাঈদকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিএডিসি কার্যালয়ের সামনে পৌঁছে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে একটি অটোরিকশায় তোলা হয়।
তিনি বলেন, ‘পথেই সাঈদের শরীর নিথর হয়ে যায়। নাক-মুখে রক্ত জমে ছিল, দুই হাতেও রক্তের দাগ ছিল। হাসপাতালে নেওয়ার পর জরুরি বিভাগ থেকে সার্জারি বিভাগে পাঠানো হয়। ইসিজি করার পরও চিকিৎসকরা কিছু বলছিলেন না। পরে আরেক চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
সাজু জানান, মরদেহ ট্রলিতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ সেটি ছিনিয়ে নেয়। এর প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা কাচারিবাজার এলাকায় অবস্থান নেন।
আবু সাঈদের পরিবার কী বলছে
আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় নিয়ে অসন্তোষ ও কার্যকর করা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন বাবা মকবুল হোসেন।
তিনি বলেন, ‘এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। তবুও রায় ঘোষণা করছে, এটাই অতি দ্রুত কার্যকর করা হোক। আমার সরকারের কাছে এটা দাবি। রায় হওয়ার এখন পর্যন্ত দুই-তিন মাস হয়ে যাচ্ছে। রায় কার্যকর বা এখন পর্যন্ত কোনো বিচারের অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না।’
তার মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে হত্যার দুই বছর হয়েছে। অনেক মানুষ আইসোছে, অনেক ভিড় হয়েছে, সাংবাদিকরাও আইসোছে। আমার ছেলে তো ফিরে আইসোছে না আবার। আমার এটাই আমার দুঃখ। আমার প্রকাশ্য আমার ছইলোক দেখতে পারোছিনে, এটাই আমার মনের দুঃখ বেশি।’