

নরসিংদীতে তীব্র গ্যাস সংকট ও বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে চলা এ দ্বিমুখী সংকটে গৃহস্থালি, গণপরিবহন এবং দেশের অন্যতম এ শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে কলকারখানার চাকা ঘুরছে না, সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন এবং বাসাবাড়িতে দিনের পর দিন জ্বলছে না রান্নার চুলা। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে শিল্প মালিকদের।
সরেজমিনে নরসিংদী শহর ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দু’পাশে অবস্থিত সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ একেবারেই নেই। ফলে গ্যাস নেওয়ার জন্য গভীর রাত থেকে শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও যানবাহন পাম্পের সামনে ও মহাসড়কের দু’পাশে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস না পেয়ে পুনরায় গ্যাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। কারণ গাড়িতে গ্যাস না থাকলে তিনি ফিরেও যেতে পারছেন না পাম্প থেকে। এতে চালকদের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং দিনশেষে আয় কমে যাওয়ায় তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম আর্থিক অনটনে পড়েছেন।
তীব্র গ্যাস সংকট ও বিদ্যুতের মাত্রারিক্তি লোডশেডিংয়ের কারণে আঞ্চলিক সড়কগুলোতে চলাচলকারী যানবাহনগুলো বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজি চালিত অটোরিকশাগুলো সড়কে খুবই কম দেখা যাচ্ছে। যার ফলে এসব সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী যাত্রীদের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। এছাড়াও যে কয়টি যানবাহন চলাচল করছে, তারা নিচ্ছেন পূর্বের তুলনায় ডাবল ভাড়া। এ নিয়ে যাত্রী ও যানচালকদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে বাগবিতন্ড, হচ্ছে হাতাহাতির মত ঘটনাও।
অপর দিকে নরসিংদী শহরের অধিকাংশ বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। গৃহিণীরা জানান, গত কয়েকদিন ধরে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চুলা জ্বলছে না। ফলে বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে চড়া দামে খাবার কিনে খাচ্ছেন। অনেকে বিকল্প উপায়ে মাটির চুলা কিংবা এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে কোনোমতে রান্নার কাজ চালাতে হচ্ছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
শিল্পনগরী নরসিংদীর শত শত টেক্সটাইল ও ডাইং মিলসহ বিভিন্ন মাঝারি ও ভারী শিল্পকারখানাগুলো গ্যাসের অভাবে অচল হয়ে পড়েছে। কারখানার মালিকরা জানান, প্রয়োজনীয় প্রেসার না থাকায় মেশিনারিজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে উৎপাদন নেমে এসেছে তলানিতে। সময়মতো উৎপাদন করতে না পারায় কাপড়ের অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন মিল বন্ধ থাকায় কারখানার শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে শিল্পমালিকদের।
জ্বালানি সংকটের এই আগুনে ঘি ঢালছে বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং। গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নরসিংদীর শহর ও গ্রামীণ এলাকায় দিন-রাতে সমানতালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। একদিকে প্রচুর গরম, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই তীব্র হাহাকার সাধারণ মানুষের জীবনকে নরকতুল্য করে তুলেছে।
বিশেষ করে নরসিংদীর ছয়টি উপজেলার প্রায় সবগুলো গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের লোডশেডিং মাত্রাতিরিক্ত। বলা চলে নরসিংদী শহর ও পলাশ শিল্পাঞ্চল বাদ দিয়ে প্রায় সকল গ্রামেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। তবে নরসিংদী শহরেও বিদ্যুৎ স্বাভাবিকভাবে মিলছে না। এখানে গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে। এতে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তীব্র ঘরমে মানুষজন রাতে ঘুমাতে পারছে।
এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে নরসিংদীর শিল্প খাতের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। জনজীবন ও দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে অবিলম্বে নরসিংদীতে গ্যাসের স্বাভাবিক চাপ ফিরিয়ে আনা এবং লোডশেডিং কমানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সর্বস্তরের মানুষ।
আনিকা খানম নামে একজন গৃহিণী বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে আমাদের বিল্ডিংয়ের কোনো ফ্ল্যাটে গ্যাস নেই। যার ফলে রান্না বন্ধ। প্রায় প্রতি বেলাই বাইরে থেকে খাবার কিনে নিয়ে আসতে হয়। তবে প্রতিদিনই বাইরের একই রকম খাবার খেতে খেতে এখন আর ভালো লাগে না। আজ গ্রাম থেকে মা কয়েক পদের খাবার রান্না করে নিয়ে এসেছে। এগুলোই ২-৩ দিন ফ্রিজে রেখে খাব।
সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক তাজুল ইসলাম বলেন, গভীর রাত থেকে পাম্পে গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি। পাম্পে চাপ না থাকায় গাড়িতে গ্যাস দিতে পারছে না। যার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়িতে গ্যাস নিতে পারছি না। এছাড়াও ৪-৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিয়ে সড়কে নামলেও ঘরে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। কারণ দীর্ঘ সময় গ্যাস আনতেই সময় চলে যায়। আর সড়কে যাত্রীরাও আমাদের দুঃখ বুঝে না, একটু বেশি ভাড়া চাইলেই হয় বাগ্বিতণ্ডা।
এমএমকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মালিক ও নরসিংদী জেলা সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ আব্দুল মোমেন মোল্লা বলেন, সাধারণত সিএনজি পাম্পগুলোতে ১২ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাস সরবরাহের কথা থাকলেও কোনো কোনো দিন ০ থেকে ২ পর্যন্ত পিএসআই গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এতে করে গাড়িতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে।
চলমান ভয়াবহ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রাশেদুল হাসান রিন্টু (সিআইপি)। বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, নরসিংদী দেশের অন্যতম প্রধান একটি শিল্পাঞ্চল। এখানকার তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও ডাইং মিলের ওপর দেশের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের যে তীব্র সংকট চলছে, তাতে শিল্পকারখানাগুলোর চাকা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। প্রেসার না থাকায় আমরা উৎপাদন চালু রাখতে পারছি না।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সংকটের এই আগুনে এখন চরম ঘি ঢালছে বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং। দিনে-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় কলকারখানা সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে জ্বালানি তেলের পেছনে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে বাড়িয়ে দিচ্ছে। একদিকে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে উৎপাদন বন্ধ সব মিলিয়ে নরসিংদীর শিল্প মালিকরা এখন প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনছেন। এভাবে চলতে থাকলে অনেক কারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানে। আমরা যদি সময়মতো ক্রেতাদের কাপড়ের ডেলিভারি দিতে না পারি, তবে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজার দুটিই আমরা হারাব।
নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, গ্যাস নির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ দিয়ে চালানোর জন্য বিদ্যুতের সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বড় বড় প্রায় সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠানই এখন গ্যাস না থাকায় বিদ্যুৎ দিয়ে চালাচ্ছে। রাতারাতি বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেছে, তবে বাড়েনি বিদ্যুৎ উৎপাদন। এছাড়াও অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্যাসের সাহায্যে উৎপাদন হয়, সেখানেও সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
নরসিংদী তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুনুর রহমান বলেন, জেলার চাহিদার তুলনায় অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এরমধ্যে ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া সারকারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সিএনজি স্টেশন, কলকারখানা ও বাসা বাড়িতে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি মেরামত হলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।