

খুলনার লবণচড়া এলাকার বুড়ো মৌলভীর দরগাহ পাড়ায় ঢাকাইয়া হাউজে ২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বাবা ইলিয়াস চৌধুরী ও তার মেয়ে পারভীন সুলতানাকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।
তবে একই ঘটনায় দায়ের করা গণধর্ষণ সংক্রান্ত মামলাটিতে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি হলেন- মো. লিটন, সাইফুল ইসলাম পিটিল, আবু সাঈদ, আজিজুর রহমান ওরফে পলাশ এবং শরিফুল আলম।
আদালতের রায়ে বলা হয়, হত্যা মামলায় (দণ্ডবিধির ৩৯৬ ধারা) ডাকাতিসহ হত্যার অভিযোগে নিম্ন আদালতের দেওয়া পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হলো। অন্যদিকে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারার (ধর্ষণ ও হত্যা) পরিবর্তে ৯(১) ধারায় দণ্ড পরিবর্তন করে পাঁচ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালতে বাদী পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তাকে সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট সৈয়দ আল আসাফুর আলী রাজা, মো. নাজিমুদ্দীন ও মাহমুদুল ইসলাম।
রায় ঘোষণার পর বাদী পক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা অন্তত একটা পয়েন্টে সন্তুষ্ট যে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। ধর্ষণের সঙ্গে হত্যা সংক্রান্ত যে মামলাটা, সেই মামলাটাতে পাঁচজন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমরা অপেক্ষা করছি পূর্ণাঙ্গ রায়টা পেলে বিচারকরা যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন সেখানে যদি আমরা মনে করি যে ওই মামলাটাতেও আসামিদের সাজা বৃদ্ধি করার জন্য আপিল করা প্রয়োজন, তাহলে আমরা পর্যবেক্ষণ শেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।
তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আমি অন্তত এটা বলতে পারি যে দুজন মানুষকে, বাবা-মেয়েকে হত্যা করা হয়েছিল, এই মৃত্যুদণ্ড বহাল হওয়ার মাধ্যমে পরিবারটা কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পাবেন যে বাংলাদেশে একেবারে এত বড় নির্মম হত্যাকাণ্ড আনপানিশড যাচ্ছে না, অন্তত আদালতের কাছে গিয়ে প্রতিকারটা পাওয়া যাচ্ছে। এটা এক ধরনের স্বস্তি, এটা এক ধরনের শুকরিয়া আমি মনে করি ভিকটিম পরিবারের পক্ষ থেকে। যদিও পূর্ণাঙ্গ সাজা কার্যকর হওয়ার পরেই হয়তো ভিকটিম পরিবার প্রকৃত শান্তিটা পাবেন।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে বাসার ভেতরে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা প্রথমে পারভীন সুলতানা ও তার বাবা ইলিয়াস চৌধুরীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এর আগে ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীনকে দলবেঁধে ধর্ষণ করে আসামিরা। পরে বাবা-মেয়ের মরদেহ বাড়ির সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় তারা।
ঘটনার পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর লবণচোরা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত পারভীনের ভাই ও ইলিয়াস চৌধুরীর ছেলে রেজাউল আলম চৌধুরী বিপ্লব। তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে মো. লিটন ও সাঈদকে গ্রেপ্তার করে। আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় এবং ঘটনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে।
পরবর্তী সময়ে ঘটনার চারদিন পর ২২ সেপ্টেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারায় ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়।
২০১৯ সালের ১৬ জুলাই খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ দুটি আলাদা মামলায় পাঁচ আসামি- লিটন, পিটিল, সাঈদ, পলাশ ও শরিফুলকে দুইবার করে মৃত্যুদণ্ড দেন।
মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতে মামলা দুটির 'ডেথ রেফারেন্স' এবং আসামিপক্ষের আপিল হাইকোর্টে আসে। হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হলে শুরুতেই আইনি এখতিয়ার নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। সংঘটিত অপরাধ একটি হলেও মামলা দুটি ছিল ভিন্ন আইনি ধারার। বিশেষ দ্বৈত বেঞ্চকে কেবল ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’-এর মামলা নিষ্পত্তির এখতিয়ার দেওয়ায় দণ্ডবিধির আওতায় থাকা ইলিয়াস চৌধুরী হত্যা মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ পড়েছিল।
ঘটনা ও সাক্ষ্য-প্রমাণ একই হওয়ায় দুটি মামলা যেন পৃথক বেঞ্চে বিচারে ন্যায়বিচার বঞ্চিত না হতে হয়, সে জন্য প্রধান বিচারপতি বরাবর বিশেষ আবেদন জানান মামলার বাদী রেজাউল আলম চৌধুরী। সে সময় বাদীপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ আসাফুর আলী রাজা এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক উভয়েই বলেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স একই বেঞ্চে শুনানি হওয়া জরুরি।
পরবর্তী সময়ে প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় একই বিশেষ বেঞ্চে টানা শুনানি শেষে বিচারকরা গতকাল চূড়ান্ত এই রায় দেন।