

বিগত কয়েক দশকে দেশে মাতমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। প্রতি লাখে জীবিত শিশু জন্ম দানের পর ১৩৬ মায়ের মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর ৫৫ শতাংশই হয় প্রসব পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সদস্যদের সঙ্গে স্ত্রী রোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের চিকিৎসকদের সংগঠন অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকলিজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) এক মতবিনিময় সভায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এসব কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার বিএমএ ভবনের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এই সভায় ওজিএসবির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসী বেগম বাংলাদেশের মাতৃস্বাস্থ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ও মাতৃসেবার মান উন্নয়নের একটি প্রকল্প যেখানে স্বল্প মূল্যে সহজে তৈরি করা যায়, এমন একটি উদ্ভাবন প্রদর্শন করেন, যা লাখ লাখ মায়ের জীবন বাঁচাতে পারে। সংগঠনের আরেক সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ান বাংলাদেশের মাতৃস্বাস্থ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বিষয়ক তথ্য তুলে ধরেন।
এ সময় আরও বক্তব্য দেন ওজিএসবির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম ও অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী, সংগঠনের সহসভাপতি অধ্যাপক ডা. সাহেলা বেগম চৌধুরী, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি রাশেদ রাব্বি।
অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসী বেগম তার উপস্থাপনায় বলেন, সন্তান প্রসবের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি মায়ের ৫শ মিলিলিটার বা এর বেশি রক্তক্ষরণ হয়, প্রাথমিকভাবে একে প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ বলে। এখন কথা হচ্ছে এর পরিমাপ কীভাবে হবে? সে ভাবনা থেকেই ‘ঢাকা ড্রেপ’-এর উদ্ভাবন। সেই উদ্ভাবনের বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি জানান, এটি স্বল্প মূল্যে সহজে তৈরি করা যায়, যা লাখো মায়ের জীবন বাঁচাতে পারে।
ডেমো হিসেবে তিনি দেখান, সহজলভ্য স্বচ্ছ/স্বল্পস্বচ্ছ বড় একটি পলি ব্যাগের মাধ্যমে ত্রিকোণ আকৃতির দাগাঙ্কিত থলি স্বাভাবিক প্রসবের সময়ে ব্যবহার করে প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ পরিমাপের মাধ্যমে প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ নির্ণয় ও চিকিৎসার মাধ্যমে মাতৃমৃত্যু সফলভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এটি নার্স ও মিডওয়াইফরা হাসপাতালে তৈরি করতে পারেন, যা তৈরিতে ব্যয় হবে মাত্র পাঁচ টাকা; প্রকল্পে এটির সফল ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে।
অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ান তার উপস্থাপনায় বলেন, দেশে যে সংখ্যক মাতৃমৃত্যু হয় তার ৫৪ শতাংশই হয় বাড়িতে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার পথে রাস্তায়ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মায়ের মৃত্যু হয়। দক্ষ প্রসবকারী দ্বারা প্রসবের হার ৪২ শতাংশ, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর দ্বারা কমপক্ষে ৪টি প্রসব-পূর্ব সেবা নেওয়ার হার ৩১ শতাংশ, আর একবার সেবা নেওয়ার হার প্রায় ৬৪ শতাংশ। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর দ্বারা প্রসবোত্তর সেবা গ্রহণের হার ৩৪ শতাংশ। দেশে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার ৬৫ শতাংশ। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশই বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে আর ১৮ শতাংশ সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে প্রসব হয়। সে হিসেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রসবের হার সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ৪ গুণ বেশি। এদিকে সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে প্রসবের হারও দিন দিন বাড়ছে। এর অধিকাংশই হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।
বক্তারা বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৩.১ অনুযায়ী ২০৩০ নাগাদ বাংলাদেশের মাতৃমৃত্যুর হার ৭০-এর কম অর্জন করতে হবে। যদিও বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার যথেষ্ট কমেছে, কিন্তু বর্তমানে এই হ্রাসের হার অনেকটাই স্থিমিত। ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে বলা হয়, নেতৃত্বের বিকাশ, দলগত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর যোগাযোগের প্রশিক্ষণ; জরুরি প্রসূতি সেবা নিশ্চিতকরণ; প্রয়োজনীয় ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ, উপকরণ ও মানবসম্পদের প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ; শক্তিশালী মনিটরিং এবং গণমাধ্যমে মাতৃস্বাস্থ্য সংক্রান্ত ইতিবাচক তথ্য ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন।
মন্তব্য করুন