

আসন্ন জাতীয় বাজেটকে কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রবৃদ্ধি হিসেবে নয়, বরং দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের উন্নয়নের একটি 'নৈতিক দলিল' হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। বুধবার (২০ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (সিআইপিজি) আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষি খাতে বাজেট ও নৈতিকতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব বাজেট বাস্তবায়নে প্রধান বাধা। উন্নয়ন বাজেটের পরিকল্পনা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় করলেও রাজস্ব বাজেটের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, অনেক সময় হাসপাতালের ভবন নির্মিত হলেও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় মূল্যবান যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে থাকে।। এছাড়া তিনি রাজস্ব আদায়ে প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দুর্নীতির কঠোর সমালোচনা করেন এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের আলোকে উপজেলা পর্যায়ে স্বতন্ত্র বাজেট ও পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানান। প্রধান আলোচক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, প্রচলিত ধারণায় বাজেট আয়-ব্যয়ের হিসাব হলেও বাস্তবে এটি এমন একটি হাতিয়ার যার মাধ্যমে জনগণের সম্পদ প্রায়শই ধনিক শ্রেণির কাছে স্থানান্তরিত হয়। তিনি কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত আবাসন রোধ করার আহ্বান জানান এবং বলেন, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত না করে একটি সুস্থ জাতি গঠন সম্ভব নয়। শিক্ষার মানোন্নয়নে তিনি যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের যথাযথ মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিভাজন (সরকারি, বেসরকারি, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা) নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় STEM শিক্ষা, গবেষণা ও সৃজনশীল চিন্তার বিকাশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। স্বাস্থ্যখাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার আজ নিঃস্ব হচ্ছে। তিনি স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং 'সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা' (UHC) নিশ্চিত করার দাবি জানান। সেমিনারে সংসদ সদস্য নুরুন্নবী সামদানী শাওন বলেন, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকা প্রয়োজন। তিনি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকের নিরাপত্তা ও বাজারের চাদাবাজি বন্ধের ওপর জোর দেন। সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ. মো. কাইরুল ইসলাম বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে উন্নয়ন বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। তিনি ইবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষকদের স্বল্প বেতনের বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও কর্মসংস্থান-এই চারটি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। কৃষিবিদ ও সাবেক সচিব ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, কৃষি বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তিনি কৃষি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে প্রয়োজনে একটি একীভূত কাঠামোর অধীনে কাজ করার পরামর্শ দেন। বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ক্রমশ পণ্যভিত্তিক হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে বিদেশে চিকিৎসা বাবদ বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় রোধ করার তাগিদ দেন তিনি। দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুদ মজুমদার বলেন, বাজেটের ভর্তুকি অনেক সময় প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায় না। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দুর্যোগ সহনশীল শস্য উদ্ভাবনে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর এবং বাজেটের অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ব্যয় বন্ধের আহ্বান জানান। সভাপতির বক্তব্যে সিআইপিজি-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হক বলেন, দেশের শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে বাস্তব চাহিদার সংযোগ খুবই দুর্বল। তিনি ব্লু-ইকোনমি, বায়ো-ইকোনমি এবং কৃষিজমি রক্ষায় বিশেষ বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. খুরশীদ আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বক্তারা একমত হন যে, সুষম উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি নৈতিকতার চর্চা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।