শেখ হারুন
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ০৮:০১ এএম
আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ০৯:০২ এএম
অনলাইন সংস্করণ

সেতু গড়তে নদীর গলায় বাঁধের ফাঁস

আইএমইডির পরিবীক্ষণ
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স

নদীর ধর্ম বয়ে চলা অবিরাম তার জলরাশি বুকে নিয়ে। আর সেতুর কাজ নদীর সেই স্বাভাবিক প্রবাহকে অক্ষুণ্ন রেখে দুই তীরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে নদীর বুক চিরে বাঁধ দিয়ে এর প্রবাহ বন্ধ করে চলছে সেতু নির্মাণ। কাজের সুবিধায় কোথাও পুরো নদীজুড়ে আড়াআড়ি মাটির বাঁধ, কোথাও স্টেজিং ও ফলসওয়ার্ক দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে পানির স্বাভাবিক চলাচল। এতে শুধু নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে না, বরং বর্ষা মৌসুমে নির্মাণাধীন সেতুর কাঠামো ধসে পড়ারও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এভাবে বাঁধ দিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করা পরিবেশ ও নদীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর উল্লেখ করে নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মারাত্মক অপরাধ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ‘পল্লি সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পে এমন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। আইএমইডির পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এ কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানদণ্ডের ‘চরম লঙ্ঘন’ এবং বড় ধরনের ‘দুর্যোগের ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত করে অবৈধ বাঁধ অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এ প্রকল্পের একাধিক গুরুতর ‘কারিগরি অনিয়মের’ তথ্য উঠে এসেছে আইএমইডির প্রতিবেদনে।

‘নদীর প্রবাহ বন্ধ হওয়ার অর্থ শুধু পানি আটকে যাওয়া নয়। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান ভেঙে পড়ে, মাছের চলাচল ব্যাহত হয়, প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নদীর তলদেশে পলি জমে নাব্যও কমে যায়। এভাবে নদীতে বাঁধ দিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করে সেতু নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। এটি শুধু পরিবেশ আইন নয়, প্রকৌশলগত নীতিরও পরিপন্থি এবং মারাত্মক অপরাধ’ —ড. আইনুন নিশাত, পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘পল্লি সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৫০ কোটি। প্রকল্পটি গত ২০২২ সালের মার্চে একনেকে অনুমোদিত হয়। মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ৩০ জুন। কিন্তু কাজ হয়েছে মাত্র ২২ শতাংশ। এজন্য বাকি কাজ শেষ করতে আরও এক বছর মেয়াদ এবং প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

নদীর বুকেই মাটির বাঁধ

সবচেয়ে ভয়াবহ অনিয়ম দেখা গেছে প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন জেলায় সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে নদী শাসনের ক্ষেত্রে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বেশ কিছু জেলার সেতুর কাজ করার জন্য নদীর পুরো প্রস্থজুড়ে আড়াআড়ি মাটির বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানদণ্ডের সরাসরি লঙ্ঘন, যা বর্ষাকালে বড় ধরনের দুর্যোগ বা সেতু ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার চরের চন্দ্র খেয়াঘাট এলাকায় আড়িয়াল খাঁ শাখা নদীর ওপর ৩১৫ দশমিক ৩০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের জন্য নদীর পুরো প্রস্থজুড়ে মাটির বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ১৭২ দশমিক ৩০ মিটার দীর্ঘ সেতুতেও। সেখানে স্টেজিং নির্মাণের জন্য নদীর মাঝখানে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে পানির চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

শুধু এই দুই স্থান নয়, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুতেও ফলসওয়ার্ক ও স্টেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সিরাজগঞ্জের ফুলজোর নদীর ওপর সেতু নির্মাণেও একই ধরনের কারিগরি অনিয়মের তথ্য পেয়েছে আইএমইডি। মাগুরা সদর উপজেলার ফাটকি নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুর অস্থায়ী কাঠামো কাঁচা ভরাট মাটির ওপর দাঁড় করানো হয়েছে, যা নির্মাণকালেই ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

‘আইএমইডির প্রতিবেদনে নদীতে বাঁধ দিয়ে সেতু নির্মাণের যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেটা সঠিক নয়। কিছু কিছু জায়গায় পাইলিংয়ের জন্য মাটি ভরাট করা হতে পারে, হয়তো একপাশে বাঁধ দিয়ে অন্য পাশে খালি রাখা হয়েছে। তবে পুরো নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়নি। আইএমইডি কীভাবে এসব তথ্য পেয়েছে, সেটা আমার জানা নেই।’ —শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার, প্রকল্প পরিচালক

মাগুরা সদর উপজেলার ফাটকি নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুর প্রপসগুলো কোনো মজবুত ভিত্তির বদলে সরাসরি কাঁচা ফিলিং মাটির ওপর স্থাপন করার বিষয়েও প্রতিবেদনে আপত্তি জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন বলছে, এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক AASHTO এবং জাতীয় BNBC-2022-এর নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। প্রকৌশলবিদদের মতে, নদীর ওপর সেতু নির্মাণের মূল নীতি হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ অক্ষুণ্ন রাখা। প্রয়োজন হলে অস্থায়ী স্টেজিং করা যাবে, কিন্তু এমনভাবে নয়—যাতে পুরো নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।

আইএমইডি বলছে, এভাবে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করা নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। নদীর প্রবাহ আটকে দিলে বর্ষা মৌসুমে পানির চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। পানির স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে পানির প্রবল চাপে নদীর তলদেশে মাটি সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পিলারের চারপাশের মাটি সরে গিয়ে মূল সেতুর ভিত্তিও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে নির্মাণাধীন স্টেজিং, ফলসওয়ার্ক কিংবা অস্থায়ী কাঠামো যে কোনো সময় ধসে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিবেদনে এ ঝুঁকিকে ‘ক্যাটাস্ট্রফিক ফেইলিউর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নদীতে আড়াআড়ি মাটির বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করাকে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হিসেবে অভিহিত করেছে আইএমইডি। এ পরিস্থিতি উত্তরণে আইএমইডি থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নদীর প্রবাহ আটকে তৈরি করা সব অবৈধ মাটির বাঁধ বা ভরাট সামগ্রী দ্রুত অপসারণ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। ঠিকাদাররা এ নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হলে এটিকে চুক্তির মৌলিক শর্ত লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত কালবেলাকে বলেন, নদীর প্রবাহ বন্ধ হওয়ার অর্থ শুধু পানি আটকে যাওয়া নয়। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান ভেঙে পড়ে, মাছের চলাচল ব্যাহত হয়, প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নৌ চলাচল বন্ধ হয়। উজানে জলাবদ্ধতা এবং ভাটিতে নদীভাঙন শুরু হতে পারে। একটি প্রবহমান নদীকে বাঁধ দিয়ে কতগুলো বিচ্ছিন্ন ‘পুকুর’ বানিয়ে ফেললে ওই এলাকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যায়। একই সঙ্গে নদীর তলদেশে পলি জমে নাব্য কমে যায়। এভাবে নদীতে বাঁধ দিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করে সেতু নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। এটি শুধু পরিবেশ আইন নয়, প্রকৌশলগত নীতিরও পরিপন্থি।

তিনি বলনে, নির্মাণ শেষে অনেক সময় নদী থেকে মাটিগুলো ঠিকমতো সরানো হয় না, যা পরবর্তী সময়ে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়। নদী একটি প্রবহমান সত্তা এবং সেতু নির্মাণের নামে একে মেরে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, পরিবেশের ক্ষতি করে নদীত বাঁধ দেওয়া মারাত্মক অপরাধ। যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) বাধ্যতামূলক। যদি নির্মাণকাজের জন্য নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করতে হয়, তাহলে সে প্রকল্পের নকশা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

অনিয়মের যেন শেষ নেই:

আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকল্পের অনিয়ম কেবল নদীতে বাঁধ দিয়েই সীমাবদ্ধ নয়। যথাযথ অনুমোদন ছাড়া সেতুর নকশা পরিবর্তন, সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন, উচ্চ বেতনভোগী পরামর্শকদের মাঠে অনুপস্থিতি, মরিচা ধরা রড ব্যবহার, নিম্নমানের কংক্রিট ঢালাই এবং প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার মতো একের পর এক অনিয়ম ধরা পড়েছে।

আগে অনিয়ম, পরে অনুমোদন

আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একাধিক সেতুর ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) নির্ধারিত নকশা ও দৈর্ঘ্য পরিবর্তন করে কাজ শুরু করা হয়েছে। পরে সংশোধিত ডিপিপিতে (আরডিপিপি) তা অন্তর্ভুক্ত করে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি প্যাকেজে ডিপিপিতে সেতুর দৈর্ঘ্য ছিল ৩৫০ মিটার। কিন্তু কোনো পূর্বানুমোদন ছাড়াই ৫১১ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুর দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় ৪১ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে যায়। একই ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে জামালপুর, মানিকগঞ্জ ও নড়াইলের একাধিক প্যাকেজেও। আইএমইডি বলছে, সরকারি আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ বিধিমালা ও অনুমোদিত প্রকল্প প্রস্তাবনা উপেক্ষা করে কাজ শুরু করা শুধু প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলাই নয়, এটি গুরুতর আর্থিক অনিয়মেরও শামিল।

ক্রয় প্রক্রিয়ায়ও একের পর এক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে অন্তত পাঁচজন সদস্য এবং দুজন বহিরাগত সদস্য থাকার কথা। কিন্তু এলজিইডি মাত্র তিনজন নিজস্ব কর্মকর্তাকে দিয়ে মূল্যায়ন কমিটি গঠন করেছে। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের দরপত্রের জন্য নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কম সময় দেওয়া হয়েছে। কোথাও ৪২ দিনের পরিবর্তে ৩১ দিন, আবার কোথাও মাত্র ২৩ দিন সময় দেওয়া হয়। জামালপুর ও কুমিল্লার কয়েকটি প্যাকেজে দরপত্র বিক্রির শেষ সময় এবং খোলার সময় একই মিনিটে নির্ধারণ করার ঘটনাও ধরা পড়েছে।

উচ্চ বেতনভোগী পরামর্শকরা ঢাকায়, মাঠে তদারকির অভাব:

প্রকল্পের নির্মাণকাজ মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি ও কারিগরি মান নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একঝাঁক উচ্চ বেতনভোগী বিশেষজ্ঞ পরামর্শক। সেতুর নকশা যাচাই, সয়েল টেস্ট সুপারিভিশন এবং নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং নিবিড় তদারকির মাধ্যমে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করাই এসব পরামর্শকের প্রধান দায়িত্ব। অথচ উচ্চবেতনভোগী এই পরামর্শকদের একটি বড় অংশই মাঠপর্যায়ে না গিয়ে ঢাকায় অবস্থান করেন।

পরামর্শকদের পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত জনবলের শতভাগই ঢাকায় অফিস করেন। মাঠপর্যায়ে না থেকে ঢাকায় অফিস করায় নানা অনিয়ম ও প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। আইএমইডি বলছে, এটি শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, বরং ‘ভ্যালু ফর মানি’ নীতিরও চরম লঙ্ঘন।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ নিবিড় তদারকির জন্য ৪৭ জন উচ্চ বেতনভোগী পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরামর্শক খাতের জন্য ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার বিপরীতে গত চার বছরে পরামর্শকের বেতন-ভাতা বাবদ এ পর্যন্ত প্রায় ২১ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু এই ৪৭ জনের মধ্যে ১৭ জনই প্রকল্প এলাকায় না গিয়ে ঢাকার সদর দপ্তরে অবস্থান করছেন। অর্থাৎ এসব পরামর্শকের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলেও, তদারকি কেবল কাগজে-কলমে।

পরামর্শকদের পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১৬ কর্মীর শতভাগই বর্তমানে ঢাকায় সদর দপ্তরে কর্মরত। নীতিমালা অনুযায়ী এদের মাঠপর্যায়ে থাকার কথা থাকলেও সবাইকে ঢাকায় পদায়ন করা হয়েছে। এদের মধ্যে ছয়জন উপসহকারী প্রকৌশলী রয়েছেন, যাদের কাজ মূলত সাইটে গিয়ে তদারকি করা। প্রতিবেদন বলছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মাঠপর্যায়ে সাইট তদারকি এবং দাপ্তরিক কাজে সহায়তা করার জন্য। কিন্তু তারা ঢাকায় থাকায় ৩৫টি জেলার ৫৮টি উপজেলায় চলমান কাজের নিবিড় তদারকি চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

প্রকল্প শুরুর চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ১৬টি সেতুর চূড়ান্ত নকশা প্রস্তুত হয়নি। ফলে ১৪টি সেতুর দরপত্র ঝুলে আছে। একই সঙ্গে ১২টি সেতুর ভূমি অধিগ্রহণও শেষ হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদর দপ্তরে চারজন ডিজাইন প্রকৌশলী, অটোক্যাড বিশেষজ্ঞ ও এস্টিমেটর সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করলেও তাদের কাজের বাস্তব অগ্রগতি অত্যন্ত হতাশাজনক। প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২২ দশমিক ০৯ শতাংশে আটকে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে আইএমইডি।

বিশেষজ্ঞ পরামর্শকরা মাঠে না থাকায় নির্মাণাধীন সেতুগুলোয় একের পর এক গুরুতর কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ছে। পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, অনেক সাইটে মরিচা ধরা রড দিয়ে ঢালাই দেওয়া হচ্ছে, নদীপ্রবাহ রুদ্ধ করে অবৈধ মাটির বাঁধ দেওয়া হয়েছে এবং নিয়ম ভেঙে নিম্নমানের ‘ভলিউমেট্রিক’ কংক্রিট মিক্সিং করা হচ্ছে, পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘উইপ হোল’ রাখা হয়নি।

আইএমইডি বলছে, জনবল ও প্রকৌশল পরামর্শকদের একটি বিশাল অংশ ঢাকায় অবস্থান করায় মাঠপর্যায়ে লজিস্টিক ও টেকনিক্যাল গাইডেন্সের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চার বছর পার হওয়ার পরও ১৬টি ব্রিজের ডিজাইন না হওয়া এবং ১২টি ব্রিজের ভূমি অধিগ্রহণ ঝুলে থাকার পেছনে এই ‘ঢাকাকেন্দ্রিক’ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাই মূল কারণ। অন্যদিকে, পরামর্শকরা প্রকল্প এলাকায় থাকলে ঠিকাদাররা এমন কারিগরি বিধি লঙ্ঘনের সাহস পেতেন না।

অগ্রগতির তথ্যেও গরমিল

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও দাপ্তরিক নথির মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি পেয়েছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি প্যাকেজে কাগজে-কলমে কাজের অগ্রগতি ৮৫ শতাংশ দেখানো হলেও সরেজমিন তার সঙ্গে কোনো মিল পাওয়া যায়নি। অন্য একটি সাইটে ১৪ শতাংশ অগ্রগতি দেখানো হলেও বাস্তবে তখনো পাইলিং পর্যায়ের কাজ চলছিল। আইএমইডির মতে, এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতির স্পষ্ট প্রমাণ।

আইএমইডির সুপারিশ:

এসব অনিয়ম ও মাঠপর্যায়ে কাজের গতি ফিরিয়ে আনা এবং জনবলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে আইএমইডি। এর মধ্যে রয়েছে—নদীতে দেওয়া সব অবৈধ মাটির বাঁধ তিন দিনের মধ্যে অপসারণ, অনুমোদন ছাড়া নকশা পরিবর্তনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন, ঢাকায় অবস্থানরত পরামর্শক ও আউটসোর্সিং জনবলকে অবিলম্বে মাঠে পদায়ন, পরামর্শকদের সাপ্তাহিক ফিল্ড ভিজিট বাধ্যতামূলক করা এবং বিলের সঙ্গে ফিল্ড ভিজিট লগ জমা দেওয়া ও পরামর্শকরা প্রকৃতপক্ষে কী কাজ করছেন, তা যাচাই করতে একটি জরুরি ‘আউটপুট অডিট’ প্রয়োজন। এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করা কিংবা কারিগরি মান বজায় রাখতে ব্যর্থ ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ‘লিকুইডেটেড ড্যামেজ (এলডি)’ আরোপ এবং প্রয়োজনে চুক্তি বাতিলেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে বিবেচিত এসব সেতু নির্মাণে যদি শুরু থেকে প্রকৌশল মানদণ্ড উপেক্ষা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রকে এর চরম মূল্য দিতে হবে। নদীকে আটকে উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। বরং এতে একদিকে নদী হারাবে তার স্বাভাবিক প্রবাহ, অন্যদিকে জনগণ পাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো। সেতু নির্মাণে এসব অনিয়ম কেবল অর্থের অপচয়ই নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

এ বিষয়ে ড. আইনুন নিশাত কালবেলাকে বলেন, এসব অনিয়মের জন্য কেবল ঠিকাদার দায়ী নন। ঠিকাদার আইন ভাঙলেও যারা সুপারভাইজ করছেন সেই প্রকৌশলী, চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। আইএমইডি মনিটরিং করে প্রতিবেদন দেয়, কিন্তু সেই প্রতিবেদন প্রায়ই ফাইলবন্দি হয়ে থাকে এবং কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। আইন আছে; কিন্তু তা কার্যকর করার ব্যবস্থা নেই, এটিই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

সার্বিক অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার কালবেলাকে বলেন, আইএমইডির প্রতিবেদনে নদীতে বাঁধ দিয়ে সেতু নির্মাণের যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেটা সঠিক নয়। কিছু কিছু জায়গায় পাইলিংয়ের জন্য মাটি ভরাট করা হতে পারে, হয়তো একপাশে বাঁধ দিয়ে অন্য পাশে খালি রাখা হয়েছে। তবে পুরো নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়নি। আইএমইডি কীভাবে এসব তথ্য পেয়েছে, সেটা আমার জানা নেই।

পরামর্শকদের বিষয়ে তিনি বলেন, পরামর্শক ও আউটসোর্সিং জনবল ঢাকায় বসে থাকে না, তারা এখানে সেতুর ডিজাইনসহ বিভিন্ন কাজ করেন, প্রয়োজনে প্রকল্প সাইটও পরিদর্শন করেন। দরপত্রে অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে কোনা অনিয়ম হয়নি, সবকিছু নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। সেতুর নকশা প্রণয়নসহ বেশকিছু ছাড়পত্র পেতে বিলম্ব হওয়ার কারণে প্রকল্পে ধীরগতি দেখা দিয়েছে ঠিক। কিন্তু কোনো অনিয়ম হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বন্যার পানিতে নৌকাডুবিতে দুই বোনের মৃত্যু

পারিবারিক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল ব্যবসায়ীর

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় হুমকিতে ২০২৭ সালের তেলের বাজার

চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে যুবক নিহত

আমি চাই আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতুক: নেতানিয়াহু

চট্টগ্রাম বোর্ডের শনিবারের এইচএসসি পরীক্ষাও স্থগিত

চট্টগ্রামের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ১০ নির্দেশনা

স্ত্রীর গলা কেটে থানায় স্বামীর আত্মসমর্পণ

‘জন নায়াগান’ / কঠিন শর্তে মিলল সেন্সরের ছাড়পত্র

হাসপাতালের জনবল সংকট দ্রুত সমাধান করা হবে: প্রতিমন্ত্রী টুকু

১০

কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে ভর্তি বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. পাভেল

১১

ঢাকায় গাইবেন আতিফ আসলাম, টিকিট বিক্রি শুরু

১২

খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে ২০ গ্রাম প্লাবিত

১৩

ডিসেম্বরে দেশে ফিরে নেতাকর্মীসহ ‘আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা’ হাসিনার

১৪

বাড়ছে সুরমা নদীর পানি, দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদারের নির্দেশ

১৫

ছাত্রদল নেতাকর্মীদের জন্য জরুরি নির্দেশনা

১৬

প্রকাশের আগেই বৃত্তির ফল ফাঁস, ডিপিই কর্মকর্তা বরখাস্ত

১৭

ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতা, সাতক্ষীরায় বিপর্যস্ত জনজীবন

১৮

চলমান দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনা

১৯

দুই দফা কমার পর আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম

২০
X