

জুলাই গণঅভ্যুত্থান পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে বিচার বিভাগ সরে আসতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ‘মোমবাতি জ্বেলে গণতন্ত্রকামী মানুষকে সাজা দিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ প্রাইজ পোস্টিং পেয়েছিলেন। আমরা যখন সেগুলো ঠিক করতে গেছি। বদলির প্রস্তাব করেছি, তখন সেই প্রস্তাবের ৭০ শতাংশ অনুমোদন দেওয়া হয়নি সুপ্রিম কোর্ট থেকে। এরকম একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগ যাচ্ছে।’
শনিবার (২৫ জুলাই) ঢাকায় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিবিষয়ক এক পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে তিনি জানান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত আইন দুটি পাসের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ওই পরামর্শ সভার আয়োজন করে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অধিকার। পরামর্শ সভার উদ্বোধনী ওই পর্বে সভাপতিত্ব করেন অধিকারের প্রেসিডেন্ট তাসনিম সিদ্দিকী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, সূচনা বক্তব্য দেন অধিকারের সমন্বয়ক কোরবান আলী।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন—সরকার অনুধাবন করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের মাথায় রাখতে হচ্ছে, যে বিচারকটি মোমবাতি জ্বেলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাতের বেলায় সাজা দিয়ে গেছেন, তাদের বিচার আমরা করতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগের সচিবালয়—ফ্যাসিস্টদের আরেকটা আস্তানা, সেই আস্তানার দিকে আমাদের দৃষ্টি দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। আমার দেশের প্রধান বিচারপতির বাসভবন যখন আক্রান্ত হয়, একজন আইনজীবী, একজন নাগরিক, একজন মানুষ হিসেবে একদিকে যেমন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, ঠিক একইভাবে আমাকে চিন্তা করতে হয়, কেন প্রধান বিচার বাসভবনে আক্রান্ত হলো? সে চিন্তা আমাদের মাথায় রাখতে হয়।’
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে অধস্তন আদালতের প্রায় ১ হাজার ৪০০ বিচারককে বদলি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জুলাই অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে বিচার বিভাগের সরে আসতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, ‘এই ১ হাজার ৪০০ বিচারকের মধ্যে যারা মোমবাতি জ্বেলে গণতন্ত্রকামী মানুষকে সাজা দিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ প্রাইজ পোস্টিং পেয়েছিলেন। আমরা যখন সেগুলো ঠিক করতে গেছি, ৭০ শতাংশ অনুমোদন দেওয়া হয়নি সুপ্রিম কোর্ট থেকে। এ রকম একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগ যাচ্ছে।’
‘যদি মনে করেন সরকার নিয়ন্ত্রণ করে, আমি বিনয়ের সঙ্গে বলব এটা সরকারের বিষয় না। সরকার যখন পার্টি ক্যাডারকে বসিয়ে দেয় এবং এই জজ সাহেব যখন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে না পারেন, তখনই বিচার বিভাগ মুখ থুবড়ে পড়ে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যদি নিয়োগ হয়, ভালো জজ যদি নিয়োগ হয়, ব্যক্তি যদি ভালো হয়, তাহলেই কেবল একটি স্বাধীন-স্বচ্ছ প্রত্যাশিত বিচার বিভাগ পাবেন। অন্যথায় এ ধরনের বিচার বিভাগের স্বপ্ন শুধু কাগজে কলমে রাখলে পাওয়া সম্ভব না,’ যোগ করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমার দেশের সুপ্রিম কোর্ট কাগজে কলমে থেকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা বলয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান, চাকরির সুবিধা পাওয়া প্রতিষ্ঠান, বদলি হওয়ার কোন চান্স নাই, রিমুভ করার কোনো সুযোগ নাই। সেই সুপ্রিম কোর্ট বিগত ১৬-১৭ বছর সঠিকভাবে আমাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।’
সরকার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দায়ের রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ধর্ষণ মামলা প্রত্যাহার করা হবে না এবং মাদক মামলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হবে বলেও জানান তিনি।
আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারকে প্রায়ই গুলিয়ে ফেলছি। আমাদের সংগ্রাম যেমন একদিকে মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য, ঠিক একইসঙ্গে এক্সটেনডেড সংগ্রাম, যখন মানবাধিকারের কথা বলতে যাই, তখন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের পাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় আধিপত্যবাদী শক্তি।’
‘খোলামেলা কেউ কেউ বলছেন ভারতীয় আধিপত্যবাদ, আমরা আধিপত্যবাদী শক্তি বলছি। আমাদের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে হচ্ছে, মাঠ থেকে আমাদের নৈরাজ্যবাদ বা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে হচ্ছে, আমাদের মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে হচ্ছে। আমরা এমন একটি সরকার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে কথা বলতে যেয়ে আধিপত্যবাদ, নৈরাজ্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদ আমাদেরকে মোকাবিলা করতে হয়,’ যোগ করেন তিনি।