

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বিলম্ব বা টালবাহানা জাতির সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতার শামিল— এমন মন্তব্য করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
দলটি সতর্ক করে বলেছে, গণভোটের রায় উপেক্ষিত হলে আগামী দিনের রাজনীতিতে বিএনপি বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হবে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত দলের মজলিশে শুরার অধিবেশনে এসব কথা বলা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের আমির মাওলানা সারোয়ার কামাল আজিজী এবং সঞ্চালনা করেন মহাসচিব মুসা বিন ইযহার। অধিবেশনে নেতৃবৃন্দ দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
নেতারা বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা নিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে দেশের সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমেছিল। সেই আন্দোলনে হাজারো মানুষ শহীদ হন, অসংখ্য মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন। তাদের আত্মত্যাগের প্রতিফলন ঘটেছিল গত ফেব্রুয়ারির গণভোটে, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে পরিবর্তনের পক্ষে মত দেন। কিন্তু একই দিনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পরও সরকার গঠনের পর সেই রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি দেখা যাচ্ছে—যা হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক।
নেতৃবৃন্দ বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, জনগণের রায় অগ্রাহ্য করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেনি। তাই তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, জনগণের স্পন্দন অনুধাবন করে এবং শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় দ্রুত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
সভায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। নেতারা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার আলোকে দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে শিক্ষাঙ্গনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সন্ত্রাস, মববাজি ও দখলবাজি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।
শিক্ষাঙ্গণের প্রসঙ্গে নেতারা অভিযোগ করেন, একটি ছাত্রসংগঠন পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। তারা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ছাত্রসমাজ যে আদর্শভিত্তিক রাজনীতির স্বপ্ন দেখেছিল, তা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চলছে। নির্বাচনের পর থেকে পেশিশক্তি প্রদর্শন ও সংঘাত সৃষ্টির ঘটনাগুলো সেই অপচেষ্টারই বহিঃপ্রকাশ। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট জনঅসন্তোষকে আড়াল করতেই শিক্ষাঙ্গণকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে।
অধিবেশনে এলপিজি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির তীব্র সমালোচনা করা হয়। নেতারা বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সম্প্রতি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১,৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর আগে একই মাসে আরও এক দফা মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছিল। অল্প সময়ের ব্যবধানে এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ ডেকে আনবে। তারা বলেন, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তারা।
শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে নেতারা বলেন, দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মুসলিম হওয়ায় তাদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তারা স্কুলগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে আলেমদের নিয়োগের আহ্বান জানান এবং প্রশ্ন তোলেন, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে নাচ-গানের শিক্ষক নিয়োগ কতটা যৌক্তিক। তাদের মতে, নৈতিক শিক্ষার অভাবেই কিশোর অপরাধ ও গ্যাং সংস্কৃতি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন দলের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, নায়েবে আমির মুফতি মোখলেসুর রহমান কাসেমি, নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুর রহমান চৌধুরী, সংগঠন সচিব মাওলানা আবু তাহের খান, সহকারী মহাসচিব হাফেজ আজিজুল হক, সহকারী অর্থ সচিব আলহাজ আনোয়ারুল কবীর, শিল্প ও বাণিজ্য সচিব আলহাজ শাকিরুল হক খান, সহকারী সংগঠন সচিব মাওলানা ইনআমুল হক কুতুবী, সমাজকল্যাণ সচিব মাওলানা এরশাদ বিন জালালসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
সভা শেষে দলীয় কার্যক্রমকে দেশব্যাপী আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।