

প্রকৃতির ভয়াবহ রূপ মানুষের অসহায়ত্বকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, ঝড়-তুফান ও বজ্রপাত মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু, শিক্ষা ও জীবিকা, সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন মুসলিমের করণীয় কী? কোরআন ও সুন্নাহ আমাদের কী শিক্ষা দেয়, তা জানা আজ অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হলো, বিশ্বজগতের প্রতিটি ঘটনা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও হিকমতের অধীন। আল্লাহ তাআলা বলেন, পৃথিবীতে কিংবা তোমাদের নিজেদের ওপর যে বিপদই আসে, তা আমি সৃষ্টি করার আগেই একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। নিশ্চয়ই এটি আল্লাহর জন্য সহজ ।(সুরা হাদিদ: ২২)
অতএব, কোনো দুর্যোগকে কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে নয়; বরং আল্লাহর তাকদির ও প্রজ্ঞার অংশ হিসেবেও দেখা একজন মুমিনের ঈমানের দাবি।
দুর্যোগ মুমিনের জন্য পরীক্ষা
বন্যা, ঝড়, অতিবৃষ্টি বা জলোচ্ছ্বাস অনেক সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। (সুরা বাকারা: ১৫৫)
কখনো সতর্কবার্তা, কখনো শাস্তি
কখনো আল্লাহ এসব দুর্যোগকে সতর্কবার্তা হিসেবে পাঠান, আবার কখনো তা শাস্তির রূপ ধারণ করে। কোরআনে বিভিন্ন জাতির ওপর বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ নেমে আসার কথা উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তাদেরকে দুর্দশা ও কষ্টে আক্রান্ত করেছিলাম, যাতে তারা বিনীত হয়। (সুরা আনআম: ৪২)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের কৃতকর্মের কারণে, যাতে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কিছু কর্মের স্বাদ আস্বাদন করান; হয়তো তারা ফিরে আসবে। (সুরা রূম: ৪১)
তবে কোনো নির্দিষ্ট বন্যা বা দুর্যোগকে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর শাস্তি বলা বৈধ নয়। কারণ এর চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে। একই দুর্যোগ একজনের জন্য পরীক্ষা, অন্যজনের জন্য সতর্কবার্তা, আবার কারও জন্য মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
টানা বৃষ্টি আল্লাহর রহমত নাকি বিপদ?
কোরআনে বৃষ্টিকে সাধারণভাবে আল্লাহর রহমত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে । আল্লাহ বলেন, তিনিই বৃষ্টিকে রহমতস্বরূপ বর্ষণ করেন। (সুরা শুরা: ২৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বৃষ্টি হলে দোয়া করতেন, اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعا.
অর্থ: হে আল্লাহ! এই বৃষ্টিকে উপকারী বৃষ্টি বানিয়ে দিন। (বোখারি: ১০৩২)
দুর্যোগের সময় একজন মুসলিমের করণীয়
১. ধৈর্য ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন
আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন তাদের ওপর বিপদ আসে, তখন তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। (সুরা বাকারা: ১৫৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মুমিনের বিষয়টি বিস্ময়কর। তার প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। সুখ পেলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, এতে তার কল্যাণ হয়। আর দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত হলে সে ধৈর্য ধারণ করে, এটিও তার জন্য কল্যাণকর। (মুসলিম: ২৯৯৯)
তাই দুর্যোগের সময় ইসলামের শিক্ষা হলো, ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
২. প্রার্থনা বা দোয়া
প্রবল বাতাস সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বাতাসকে গালি দিও না। কারণ এটি আল্লাহর রহমতও নিয়ে আসে, আবার তাঁর আদেশে শাস্তিও নিয়ে আসে। (আবু দাউদ: ৫০৯৭) রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন এই দোয়া করতেন, اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এই বাতাসের কল্যাণ, এতে নিহিত কল্যাণ এবং যে উদ্দেশ্যে একে পাঠানো হয়েছে তার কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আর এর অকল্যাণ, এতে নিহিত অকল্যাণ এবং যে উদ্দেশ্যে একে পাঠানো হয়েছে তার অকল্যাণ থেকে আপনার আশ্রয় চাই। (মুসলিম: ৮৯৯)
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, প্রবল বাতাস বা আকাশে মেঘ দেখা দিলে রাসুলুল্লাহ (সা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। (বোখারি: ৩২০৬)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রা.) বজ্রধ্বনি শুনলে কথা বলা বন্ধ করে বলতেন, .سُبْحَانَ الَّذِي يُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِ
এরপর তিনি বলতেন, এটি পৃথিবীবাসীর জন্য কঠিন সতর্কবার্তা। (আল-আদাবুল মুফরাদ: ৭২৩)
কোরআনেও আল্লাহ বলেন, বজ্র আল্লাহর প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং ফেরেশতারাও তাঁর ভয়ে তা করে। (সুরা রাদ: ১৩)
এ ছাড়া যখন অতিবৃষ্টি মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হতো, তখন রাসুল (সা.) দোয়া করতেন,اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ عَلَى الْآكَامِ وَالظِّرَابِ وَبُطُونِ الْأَوْدِيَةِ وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ.
অর্থ: হে আল্লাহ! (বৃষ্টি) আমাদের ওপর নয়, আমাদের চারপাশে বর্ষণ করুন। হে আল্লাহ! পাহাড়-টিলা, উঁচু ভূমি, উপত্যকার ভেতর এবং গাছপালা জন্মায় এমন স্থানগুলোতে বৃষ্টি বর্ষণ করুন। (মুসলিম: ৮৯৭)
তাই বন্যা, ঝড় বা অতিবৃষ্টিতে উল্লিখিত দোয়াগুলো বেশি বেশি পাঠ করা উচিত।
৩. গুজব ও কুসংস্কার থেকে বিরত থাকা
দুর্যোগের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্যাক নিউজ, বিকৃত ছবি, পুরোনো ভিডিও, এ আই দিয়ে ভুয়া ভিডিও বানিয়ে নানা গুজব, ভিত্তিহীন ভবিষ্যদ্বাণী বা কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়ে। ইসলাম এসব থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও। (সুরা হুজুরাত: ৬)
৪. বন্যা থেকে বাঁচতে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ
ইসলাম শুধু আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের শিক্ষা দেয় না; বরং বিপদ এড়াতে যথাসাধ্য উপায়-উপকরণ গ্রহণেরও নির্দেশ দেয়। তাই বন্যার আশঙ্কা দেখা দিলে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চ, লাইফ জ্যাকেট বা ভাসমান উপকরণ, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সংরক্ষণসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা সুন্নাহসম্মত ও শরিয়তসম্মত। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: প্রথমে উটটি বেঁধে রাখ, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা কর। (তিরমিজি: ২৫১৭)
৫.দুর্যোগে মানবসেবায় এগিয়ে আসা
দুর্যোগে মানবসেবা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের একটি দুনিয়াবি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন। (মুসলিম: ২৬৯৯)
অতএব, ত্রাণ বিতরণ, আশ্রয় দেওয়া, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও পুনর্বাসনে সহযোগিতা করা শুধু মানবিক কাজ নয়; বরং ইবাদতও বটে।
৬. ভবিষ্যৎ বন্যা মোকাবিলায় রাষ্ট্রের কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ
শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ নয়, ভবিষ্যতে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নদী, খাল ও জলাশয় দখলমুক্ত ও নিয়মিত খনন, কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলা, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, পাহাড় কাটা ও অবৈধ দখল বন্ধ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্যোগ-প্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি। মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় রাষ্ট্রের এ ধরনের উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। শাসক জনগণের অভিভাবক, আর তাকে তার জনগণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। (মুসলিম: ১৮২৯)
লেখক: শরিয়াহ কনসালট্যান্ট