কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ১০:১৭ এএম
আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ১০:১৮ এএম
অনলাইন সংস্করণ

৪৪ ডিগ্রির ইউরোপ: চরম গরম কি আর ‘ব্যতিক্রম’ নয়?

চরম গরমে লেকের পাড়ে বসে আরাম করছে ডর্টমুন্ডের বাসিন্দারা। ছবি: এএফপি
চরম গরমে লেকের পাড়ে বসে আরাম করছে ডর্টমুন্ডের বাসিন্দারা। ছবি: এএফপি

ইউরোপজুড়ে এ বছরের গ্রীষ্মে তাপমাত্রা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। মৌসুমের শুরুতেই তীব্র তাপপ্রবাহে অসুস্থতা, মৃত্যুর ঘটনা এবং অবকাঠামো বিপর্যয় দেখা দিয়েছে বিভিন্ন দেশে।

গত রোববার জার্মানি, চেক প্রজাতন্ত্র ও পোল্যান্ডে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ফ্রান্সে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর একটি শহরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। পরে গরম আরও বাড়তে থাকায় ওই শহরে প্রায় এক হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন দৃশ্য এখন ইউরোপের ‘নতুন স্বাভাবিক’ বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ, ইউরোপের চরম গরম পরিস্থিতি ‘ব্যতিক্রম’ কোনো ঘটনা হিসেবে গণনা নাও করা হতে পারে।

ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনে (ডব্লিউডব্লিউএ) তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহেই ইউরোপের ১২টি দেশে প্রায় ২ হাজার ৩০০ জলবায়ুজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

সংস্থাটির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমান মাত্রার তাপপ্রবাহ ২০০৩ সালের তুলনায় এখন কয়েক ডজন থেকে কয়েকশ গুণ বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠেছে। ৫০ বছর আগে এমন পরিস্থিতি প্রায় অকল্পনীয় ছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ইউরোপীয় অঞ্চলের পরিচালক ডা. হ্যান্স ক্লুগে বলেন, উষ্ণায়নের কারণে তাপজনিত মৃত্যু ইউরোপের বাস্তবতায় স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হতে পারে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯০’র দশক থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত ৫২ জনের মৃত্যু ঘটছে তাপজনিত কারণে এবং এই প্রবণতা আপনাআপনি কমে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।

এটাই কি এখন নতুন স্বাভাবিক?

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি সেই দিকেই যাচ্ছে। ডব্লিউডব্লিউএর তথ্যমতে, ১৯৭৬ সালের জুন মাসের তাপপ্রবাহ বর্তমান সময়ের তুলনায় গড়ে ৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম উষ্ণ ছিল। এমনকি ২০০৩ সালেও তা ছিল প্রায় ২ ডিগ্রি কম।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী ডা. অক্ষয় দেওরাস বলেন, এটা এমন যেন দৌড়ের শুরুর লাইনকে অনেকটা সামনে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মূল কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।

ইউরোপীয় কমিশনের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কপেরনিকাস জানায়, ১৯৮০’র দশক থেকে ইউরোপ বিশ্বের গড় উষ্ণায়নের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হয়েছে। ফলে আগে যেসব তাপপ্রবাহ বিরল ছিল, সেগুলো এখন অনেক বেশি ঘনঘন ঘটছে।

ডব্লিউডব্লিউএর মডেল বলছে, বর্তমান যে হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হচ্ছে, তা চলতে থাকলে এ ধরনের তাপপ্রবাহ প্রতি দুই দশকে একবার দেখা যেতে পারে। মধ্য শতাব্দীতে আজকের এই চরম গরমই হয়তো ইউরোপের সাধারণ গ্রীষ্মের চিত্র হয়ে উঠবে।

কেন ইউরোপে এখন এমন পরিস্থিতি?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর তাৎক্ষণিক কারণ হচ্ছে ‘হিট ডোম’ বা স্থির উচ্চচাপ বলয়, যা দীর্ঘ সময় ধরে একটি অঞ্চলে গরম বাতাস আটকে রাখে। ডা. দেওরাস বলেন, হিট ডোম নতুন কিছু নয়। কিন্তু ইউরোপের গড় তাপমাত্রা আগেই বেড়ে যাওয়ায় একই আবহাওয়াগত পরিস্থিতি এখন অনেক বেশি তীব্র গরম তৈরি করছে।

ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের অধ্যাপক হান্না ক্লোক বলেন, আজকের চরম আবহাওয়ার পেছনে রয়েছে কয়েক দশক আগের দূষণ। জলবায়ু ব্যবস্থা ধীরে প্রতিক্রিয়া জানায়, তাই অতীতের নির্গমনের প্রভাব এখন অনুভূত হচ্ছে।

কপেরনিকাসের ‘ইউরোপিয়ান স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর ইউরোপের ৯৫ শতাংশের বেশি অঞ্চলেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে আল্পস অঞ্চলের হিমবাহের রেকর্ড গলন এবং ইউরোপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও পরিমাপ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেহেতু ইউরোপ বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে, তাই ভবিষ্যতেও এই ব্যবধান বাড়তেই পারে।

এই পরিস্থিতি কি আর বদলানো সম্ভব?

বিশেষজ্ঞদের মতে, আংশিকভাবে বদলানো সম্ভব। অধ্যাপক ক্লোক বলেন, কিছু ক্ষতি ইতোমধ্যে স্থায়ী হয়ে গেছে, আবার কিছু এখনো রোধ করা সম্ভব। আল্পস অঞ্চলের হিমবাহগুলো এমন পর্যায়ে গলে গেছে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। ফলে ইউরোপের বড় নদীগুলোর গ্রীষ্মকালীন পানিপ্রবাহ স্থায়ীভাবে কমে যেতে পারে। তবে সবকিছু এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

ক্লোক বলেন, প্রতিটি টন নির্গমন কমানো ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমায়। এখন নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের গ্রীষ্ম শুধু কঠিন হবে, নাকি মানুষের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। উত্তর ইউরোপের ভূগর্ভস্থ পানির মতো কিছু সম্পদ এখনো পুনরুদ্ধার সম্ভব, তবে প্রতিটি শুষ্ক বছর সেই সুযোগ সংকুচিত করছে।

মানবস্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব পড়ছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই উদ্বেগজনক। ল্যানসেট কাউন্টডাউন ইউরোপের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইউরোপজুড়ে তাপজনিত কারণে প্রায় ৬২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে পারে।

ডা. হ্যান্স ক্লুগে বলেন, ইউরোপের অধিকাংশ বাড়িঘর এমনভাবে নির্মিত, যা শীতপ্রধান আবহাওয়ার জন্য উপযোগী। অর্থাৎ এগুলো তাপ ধরে রাখার জন্য তৈরি, গরম বের করার জন্য নয়। ব্যাপক সংস্কার ছাড়া ২০৫০ সালের পরও মৃত্যুহার বাড়তেই থাকবে, যত উন্নত সতর্কীকরণ ব্যবস্থাই থাকুক না কেন।

তিনি আরও বলেন, তাপপ্রবাহকে জরুরি সংকট নয়, বরং পূর্বানুমানযোগ্য বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যেভাবে সরকারগুলো শীতকালীন ফ্লু মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়, ঠিক সেভাবেই তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় স্থায়ী অবকাঠামো ও পরিকল্পনা প্রয়োজন।

কী করা যেতে পারে?

অধ্যাপক ক্লোকের মতে, সবচেয়ে জরুরি দুটি পদক্ষেপ হলো কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং ইউরোপের পুরোনো পানি অবকাঠামোর সংস্কার।

ডা. দেওরাস বলেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাপপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলেও এর তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং ঘনত্ব কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। অবকাঠামো আধুনিকায়ন, নির্গমন হ্রাস এবং কার্যকর সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ২০৫০ সালের ইউরোপের গ্রীষ্ম কেমন হবে, সেই গল্প এখনো লেখা শেষ হয়নি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কারিগরি শিক্ষায় অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার : পানিসম্পদমন্ত্রী এ্যানি

দেশের তিন জেলায় বিকেল ৫টার মধ্যে ঝড় ও বজ্রবৃষ্টির আভাস

মা হচ্ছেন মৌসুমী হামিদ, পরিচয় করিয়ে দিলেন স্বামীর সঙ্গে

দেশ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে : অর্থমন্ত্রী

বিরতি ভেঙে নতুন মিশনে অনন্য অনু

মানিকগঞ্জে ৫০০ গাছের চারা রোপণ ‘আর্জেন্টিনা ফ্যানস ফর নেচার’র

কুড়িগ্রামে গ্যাসবাহী ট্রাক-সিএনজির সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৪

আসামি ধরার সময় ৩ পুলিশ সদস্যসহ চারজনকে কুপিয়ে জখম

চট্টগ্রাম হবে দেশের লজিস্টিক্যাল হাব: অর্থমন্ত্রী

এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের জরুরি নির্দেশনা

১০

মস্কোকে বাঁচাতে ড্রোন অপারেটর নিচ্ছে রাশিয়া, বেতন দেড় লাখ রুবল

১১

বিসিএসে হ্যাটট্রিক বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসানের

১২

ইসরায়েলের ফেলে যাওয়া ৪ বোমা নিষ্ক্রিয় করল লেবাননের সেনাবাহিনী

১৩

আ. লীগ আর কোনোদিন বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৪

জাবিতে গভীর রাতে নবীন শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ

১৫

চকবাজারে ভবনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৩ ইউনিট

১৬

ডিএসসিসি প্রশাসকের হুঁশিয়ারি: অনিয়ম করলেই ঠিকাদারের টেন্ডার বাদ

১৭

১০০ ডলারেই বিশ্বকাপ উন্মাদনা / নখের ডগায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা!

১৮

বান্দরবানে অস্ত্রসহ কেএনএফ সদস্য আটক

১৯

খামেনির জানাজায় প্রতিশোধের লাল পতাকা

২০
X