

ভারতে কারাবন্দি অধিকারকর্মী উমর খালিদকে লেখা একটি ব্যক্তিগত চিঠি প্রকাশকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরের মেয়র জোহরান মামদানির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নয়াদিল্লি। চিঠিটি প্রকাশের পর এটিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে নরেন্দ্র মোদির সরকার।
গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় উমর খালিদের মা-বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নিউইয়র্কের মেয়র। ওই সাক্ষাতের পর মামদানি খালিদকে একটি চিঠি লেখেন। সম্প্রতি খালিদের মা-বাবা চিঠিটি প্রকাশ করলে তা এক্স ও ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। খবর মিডল ইস্ট আই।
চিঠিতে মামদানি লিখেছেন, ‘প্রিয় উমর, তিক্ততা নিয়ে তোমার ভাবনার কথা আমি প্রায়ই মনে করি। তোমার মা-বাবার সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা সবাই তোমার কথা ভাবছি।’ এই বক্তব্যকেই ভারত সরকার অনভিপ্রেত রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখছে।
এই ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এক বিবৃতিতে বলেন, নিউইয়র্ক নগরের মেয়রের উচিত অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য না করে নিজের দায়িত্বে মনোযোগ দেওয়া। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা আশা করি, জনপ্রতিনিধিরা অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করা সমীচীন নয়।’
ভারতের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, এ ধরনের মন্তব্য কূটনৈতিক শালীনতার পরিপন্থি এবং এটি দুই দেশের সম্পর্কের জন্য সহায়ক নয়।
উমর খালিদ ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বিনা বিচারে কারাবন্দি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নয়াদিল্লিতে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ভূমিকা রাখার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ভারতের কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ‘আনলফুল অ্যাকটিভিটিজ (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট’-এর আওতায় মামলা করা হয়। এই আইনের অধীনে দীর্ঘ সময় ধরে আটক রাখা সম্ভব এবং জামিন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
গত সোমবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট খালিদের জামিন আবেদন খারিজ করে দেন। ফলে চার বছরের বেশি সময় ধরে তার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু না হলেও তিনি কারাগারেই রয়েছেন।
ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ইউএসসিআইআরএফের অভিযোগ, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে সোচ্চার অবস্থানের কারণেই উমর খালিদ নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। একই প্রতিবেদনে সংস্থাটি ভারতের সংখ্যালঘু নীতির সমালোচনা করে দেশটিকে ‘কান্ট্রি অব পার্টিকুলার কনসার্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুপারিশ করেছে।
এদিকে উমর খালিদের মুক্তির দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও চাপ বাড়ছে। গত ৩০ ডিসেম্বর আট মার্কিন আইনপ্রণেতা ভারতের রাষ্ট্রদূত বিনয় মোহন কোয়াত্রাকে চিঠি লিখে খালিদকে জামিন দেওয়ার আহ্বান জানান এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তার বিচার নিশ্চিত করার দাবি তোলেন। চিঠিটি প্রকাশ করেন ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য ও টম লান্টোস হিউম্যান রাইটস কমিশনের কো-চেয়ার জিম ম্যাকগভার্ন। এতে ডেমোক্র্যাট দলের আরও কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য ও সিনেটর স্বাক্ষর করেন।
ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। বিশেষ করে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে বিদেশি মন্তব্যের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির অবস্থান বরাবরই কঠোর। উমর খালিদকে ঘিরে সাম্প্রতিক এই বিতর্ক সেই উত্তেজনাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
মন্তব্য করুন