কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

কোনো শক্তিই হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আধিপত্য খর্ব করতে পারবে না

হরমুজ প্রণালি। ছবি : সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালি। ছবি : সংগৃহীত

পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি। এটি ইরানের জন্য শুধু ভৌগলিক পথ বা বিশ্ব মানচিত্রের একটি নৌপথ নয়; এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ, যা একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির স্পন্দন, অন্যদিকে ইরানের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার— যার মাধ্যমে পারস্য উপসাগর ও বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য মৌলিকভাবে বদলে দেওয়া সম্ভব।

ইরান কেবল এই প্রণালিকে রক্ষা বা নজরদারিই করতে চায় না; বরং স্বল্পমেয়াদে প্রতিপক্ষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তাদের পিছু হটতে, আলোচনায় বসতে বা ইরানের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা এবং দীর্ঘমেয়াদে এই নিয়ন্ত্রণকে স্থায়ী ও অশেষ কৌশলগত সুবিধায় রূপান্তর করতে চায়।

বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সামুদ্রিক তেল পরিবহন এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ইরানের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের মধ্যে রয়েছে— নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণ, টোল আদায়, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠন।

অপরিবর্তনীয় ভূগোল, আন্তর্জাতিক আইন, নির্ভুল অর্থনৈতিক তথ্য এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্লেষণে দেখা যায়—কোনো সামরিক হুমকি বা কূটনৈতিক চাপ এই বাস্তবতাকে বদলাতে পারবে না।

ভৌগোলিকভাবে, হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ৩৯ কিলোমিটার)। এই সংকীর্ণতা এমন যে মূল নৌপথগুলো দুটি দুই-মাইল প্রশস্ত চলাচল করিডর এবং মাঝখানে দুই-মাইল বাফার; সবই ইরান ও ওমানের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে পড়ে।

ইরানের উপকূলরেখা পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরজুড়ে ১,৬০০ কিলোমিটারের বেশি বিস্তৃত। এর সঙ্গে রয়েছে বহু কৌশলগত দ্বীপ, যা প্রাকৃতিক ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। ফলে প্রণালির উত্তর ও গুরুত্বপূর্ণ অংশে ইরানের পূর্ণ প্রভাব রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি সুয়েজ খাল বা পানামা খালের মতো নয়, যেগুলো বিকল্প পথে এড়ানো যায়। হরমুজ প্রণালি একটি প্রাকৃতিক ও বাধ্যতামূলক পথ; যার মাধ্যমে তেল, এলএনজি ও রাসায়নিক পণ্য বৈশ্বিক বাজারে যায়। এর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।

এখানকার পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, পাথুরে উপকূল ও অগভীর পানির কারণে বিকল্প পথ বা নতুন খাল নির্মাণ প্রায় অসম্ভব বা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। পৃথিবীর কোনো শক্তিই এই ভূগোলকে সামরিক শক্তি দিয়ে বদলাতে পারবে না।

আইনগতভাবে, হরমুজ প্রণালি জাতিসংঘের সমুদ্র আইন (ইউএনসিএলওএস)-এর আওতায় পড়লেও এর ব্যাখ্যা অনেকাংশে ইরানের অবস্থান অনুযায়ী হয়েছে। প্রণালির প্রস্থ ২৪ নটিক্যাল মাইলের কম হওয়ায় এটি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক জলসীমা নয়। এখানে ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ নয়, বরং ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ প্রযোজ্য।

ইরান মনে করে—কোনো জাহাজ চলাচল তার সার্বভৌমত্ব বা নিরাপত্তার ক্ষতি করলে তা বৈধ নয়। ফলে ইরান আইনগতভাবে নির্বাচিত ও শর্তাধীন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে। এই বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালি ইরানের জন্য এক ধরনের ‘অডুবো বিমানবাহী রণতরী’—যা রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় কোনো খরচ নেই, কিন্তু কৌশলগত মূল্য অপরিসীম।

অর্থনৈতিকভাবে, এটি বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। প্রতিদিন প্রায় ২০.৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়; যা বৈশ্বিক ব্যবহারের ২০% এবং আমদানি-রপ্তানির ২৫-২৭%। এছাড়া বিশ্বের ২০% এলএনজি বিশেষত কাতার থেকে এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

কিন্তু এর প্রভাব শুধু জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইরান ইউরিয়ার অন্যতম বড় উৎপাদক। এই অঞ্চলে সরবরাহ ব্যাহত হলে ইউরিয়ার দাম ২৫-৩০% বেড়ে যায়, যা ভারত, ব্রাজিল, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ বহু দেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলে। ফলে হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র।

ইরানের জন্য এটি এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক পারমাণবিক অস্ত্র’—যার মাধ্যমে যুদ্ধ ছাড়াই বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলা যায়। ইরান পুরোপুরি প্রণালি বন্ধ করতে চায় না; বরং বেছে বেছে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে—যেমন মিত্রদের জন্য উন্মুক্ত রাখা, শত্রুদের জন্য সীমাবদ্ধতা।

ইতিহাসে মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের যেমন সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করে শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়েছিলেন, তেমনি ইরানও হরমুজ প্রণালিকে তার নিয়ন্ত্রণে এনে একই ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন আনতে চায়।

ইরান টোল আদায়, বিকল্প মুদ্রা (ইউয়ান, রুবল, ক্রিপ্টোকারেন্সি) ব্যবহার এবং ডলার নির্ভরতা কমানোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও বদলাতে চায়।

এই নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি মূলত তিনটি। ভৌগলিক অবস্থান, যার কারণে ১,৬০০ কিমি উপকূল দখল করা প্রায় অসম্ভব; ইরানের সামরিক সক্ষমতা, যার মাধ্যমে মাইন, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সহজেই নৌপথ অচল করা সম্ভব এবং কৌশলগত অস্ত্র; যেখানে ইরান প্রায়ই হুমকি দেয়, কিন্তু পুরোপুরি পথ বন্ধ করে না।

ইরান প্রমাণ করেছে—হুমকির শেষ ধাপে গিয়ে প্রতিপক্ষকে পিছু হটতে বাধ্য করা সম্ভব। ইরানের লক্ষ্য ধ্বংসাত্মক বন্ধ নয়, বরং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ—যেখানে টোল আদায়, নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক নিয়ম পুনর্লিখন অন্তর্ভুক্ত।

এই প্রণালিতে ইরানের আধিপত্য ভূগোল, প্রযুক্তি এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তার ওপর প্রতিষ্ঠিত; এটি একটি স্থায়ী বাস্তবতা, যা কোনো শক্তি সহজে পরিবর্তন করতে পারবে না।

সূত্র : প্রেস টিভি

কালবেলা/এসএ
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নাটোরে হত্যা ও ডাকাতি মামলায় ৪ জনের যাবজ্জীবন

নতুন টেস্ট ও ওয়ানডে অধিনায়কের নাম ঘোষণা করল আফগানিস্তান

জুলাই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছে ছাত্রদল: ডিএনসিসি প্রশাসক

বিয়ের আশ্বাসে বিধবাকে ধর্ষণের অভিযোগ, আদালতে মামলা

জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছরেও পূরণ হয়নি শ্রমিকের প্রত্যাশা: সাইফুল হক

অস্তিত্ব সংকটে পান্ডারখাল বাঁধ, হুমকির মুখে দেখার হাওরের বিস্তীর্ণ ফসলাদি

ধর্মের নামে বিভাজনের রাজনীতির সুযোগ নেই: মির্জা ফখরুল

ভারী বৃষ্টিতে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, ফের দেশে বন্যার শঙ্কা

গণভোটের বিরুদ্ধে গিয়ে সংবিধান বাস্তবায়ন করছে বিএনপি: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাদের মরদেহ গ্রহণ সবচেয়ে কঠিন কাজ: ট্রাম্প

১০

জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কল্যাণে কাজ করবে, লুটপাট করা তাদের দ্বায়িত্ব না: খোকন

১১

আমেরিকানরা ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে নয়, দাবি ট্রাম্পের

১২

‘যতবার হরমুজের জাহাজে হামলা ততবার ইরানের বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হবে’

১৩

কারও কাছে মাথা নত করতে রাজনীতি করি না: খোরশেদ আলম

১৪

ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মকবুল তিন দিনের রিমান্ডে

১৫

মহিলা কলেজে চাকরি করায় পদ হারালেন জামায়াত নেতা

১৬

নারীকাণ্ডে বহিষ্কার এমপি নজরুলের বিষয়ে যে তথ্য জানালেন ইসি আনোয়ারুল

১৭

সৌদি আরবের ওপর হুতিদের নৌ অবরোধ, নিন্দা জানাল ঢাকা

১৮

টাঙ্গাইলে হত্যা মামলায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড

১৯

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ব্যবসায়ীর আত্মহত্যা

২০
X