আবদুল্লাহ বান্দার আল-ইতাইবি; আল জাজিরা
ভাষান্তর: মো. জুবাইর
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ০১:১৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

হরমুজ প্রণালি: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন সংকট

হরমুজ প্রণালি: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন সংকট

মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি বড় সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে কোনো না কোনো ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করে। কখনো তা জ্বালানি সম্পদ, কখনো সীমান্ত, আবার কখনো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বর্তমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় সেই কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ এখন শুধু সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্র নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান উপাদান।

হরমুজ প্রণালি আরব উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রতিদিন বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এ পথের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়া মানেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হওয়া। আর তার প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, খাদ্যপণ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর।

ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরেই একটি কৌশলগত সম্পদ। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের মুখে এ প্রণালিই তেহরানের সবচেয়ে কার্যকর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার। প্রণালিতে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো কিংবা জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে ইরান আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করে; কিন্তু এ কৌশলের একটি বড় সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। একই পথ দিয়ে ইরানের নিজের তেল রপ্তানিও পরিচালিত হয়। ফলে হরমুজে অস্থিরতা যত বাড়ে, ততই ইরানের অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়ে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করাকে তারা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দেখে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের আওতায় হরমুজ প্রণালিতে কোনো রাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণ বা জাহাজ চলাচলের ওপর অতিরিক্ত শর্ত আরোপের বিরোধিতা করে ওয়াশিংটন। ফলে প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতপার্থক্য কেবল সামরিক নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও ভূরাজনীতির প্রশ্নেও গভীর।

এই সংকটে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অবস্থানও অত্যন্ত জটিল। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু তেল রপ্তানির ব্যবস্থা করলেও সেই সক্ষমতা হরমুজের বিকল্প হতে পারে না। কাতারের প্রায় পুরো এলএনজি রপ্তানিই এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ওমান একদিকে প্রণালির ভৌগোলিক অংশীদার, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার পক্ষপাতী। ফলে অঞ্চলটির প্রতিটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিক স্বার্থ ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করছে।

সংকটের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, শিল্প উৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়, মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়। সামুদ্রিক বীমার ব্যয়ও কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খরচ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আমদানি-নির্ভর দেশগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ছে।

বিশেষ করে এশিয়ার অর্থনীতিগুলো এই পরিস্থিতিতে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। চীন তার আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে সংগ্রহ করে এবং ইরানি তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা। জাপানও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা জ্বালানির জন্য এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপের অনেক দেশও একইভাবে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। ফলে হরমুজে অস্থিরতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেলেও সার বাজারে এর প্রভাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বের সামুদ্রিক সার বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। সরবরাহ ব্যাহত হলে সারের দাম বেড়ে যায়, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। এর প্রভাব তাৎক্ষণিক নয়, বরং পরবর্তী মৌসুমের ফসল উৎপাদন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশের মতো জ্বালানি ও খাদ্য আমদানিনির্ভর অর্থনীতিও এই সংকট থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সার আমদানির খরচ বেড়ে গেলে দেশের উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ হরমুজে সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, তার অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া তত বেশি অনুভূত হবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও।

বর্তমান বাস্তবতা বলছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধের সহজ সমাধান নেই। একদিকে ইরান এই প্রণালিকে তার কৌশলগত প্রভাবের প্রধান উৎস হিসেবে ধরে রাখতে চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যনির্ভর দেশগুলো অবাধ নৌচলাচলের নীতি থেকে সরে আসতে প্রস্তুত নয়। ফলে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কেবল যুদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা। বাজার যুদ্ধের চেয়েও বেশি ভয় পায় অনিশ্চয়তাকে। হরমুজ প্রণালি যদি দীর্ঘ সময় অস্থিতিশীল থাকে, তবে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও এর দীর্ঘ ছায়া পড়বে। তাই হরমুজ এখন শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়, বরং বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

* আল জাজিরা থেকে মতামতটি পড়ুন এখান থেকে

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বন্যার পানিতে নৌকাডুবিতে দুই বোনের মৃত্যু

পারিবারিক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল ব্যবসায়ীর

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় হুমকিতে ২০২৭ সালের তেলের বাজার

চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে যুবক নিহত

আমি চাই আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতুক: নেতানিয়াহু

চট্টগ্রাম বোর্ডের শনিবারের এইচএসসি পরীক্ষাও স্থগিত

চট্টগ্রামের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ১০ নির্দেশনা

স্ত্রীর গলা কেটে থানায় স্বামীর আত্মসমর্পণ

‘জন নায়াগান’ / কঠিন শর্তে মিলল সেন্সরের ছাড়পত্র

হাসপাতালের জনবল সংকট দ্রুত সমাধান করা হবে: প্রতিমন্ত্রী টুকু

১০

কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে ভর্তি বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. পাভেল

১১

ঢাকায় গাইবেন আতিফ আসলাম, টিকিট বিক্রি শুরু

১২

খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে ২০ গ্রাম প্লাবিত

১৩

ডিসেম্বরে দেশে ফিরে নেতাকর্মীসহ ‘আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা’ হাসিনার

১৪

বাড়ছে সুরমা নদীর পানি, দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদারের নির্দেশ

১৫

ছাত্রদল নেতাকর্মীদের জন্য জরুরি নির্দেশনা

১৬

প্রকাশের আগেই বৃত্তির ফল ফাঁস, ডিপিই কর্মকর্তা বরখাস্ত

১৭

ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতা, সাতক্ষীরায় বিপর্যস্ত জনজীবন

১৮

চলমান দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনা

১৯

দুই দফা কমার পর আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম

২০
X