

চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি নতুন শান্তি পরিকল্পনা তুলে ধরেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২৮টি বিশেষ শর্ত ও সমঝোতার ভিত্তিতে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমর্থিত এ পরিকল্পনা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে ইউক্রেন সরকারের একজন কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে পুরো খসড়াটি দিয়েছেন। বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে রাশিয়ার এতদিনের বেশিরভাগই দাবিই পূরণ করা হয়েছে। এ কারণে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিয়েছে কিয়েভ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ট্রাম্পের এ পরিকল্পনা অনুযায়ী কি ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হবে?
পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য কী: ২৮ দফা পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি করা। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, এতে উভয় দেশ যুদ্ধ থামিয়ে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি নতুন কাঠামোর অধীনে কাজ করতে পারবে।
ইউক্রেনের জন্য কঠিন শর্ত: পরিকল্পনার মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো ইউক্রেনকে বড় ধরনের ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে বলা। পরিকল্পনা অনুযায়ী—ক্রিমিয়া, লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ক অঞ্চলগুলোকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে যুদ্ধের সময় যে লাইন অব কন্টাক্ট তৈরি হয়েছে, সেটিকেই কার্যত স্থায়ী সীমারেখা ধরে নেওয়া হবে। ইউক্রেনের হাতে থাকা দোনেৎস্ক অঞ্চলের কিছু জায়গা বাফার জোন হিসেবে নিরস্ত্রীকৃত এলাকায় পরিণত হবে, যা আন্তর্জাতিকভাবে রাশিয়ার বলে ধরা হবে।
ন্যাটো-ইউক্রেন সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ: পরিকল্পনার আরেকটি বড় শর্ত হলো ইউক্রেনকে কখনোই ন্যাটোতে যোগ না দেওয়ার অঙ্গীকার সংবিধানে লিখতে হবে। একইভাবে ন্যাটোকেও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে হবে যে, ভবিষ্যতেও ইউক্রেনকে সদস্য করা হবে না। এ প্রস্তাব ইউক্রেনের জন্য সংবেদনশীল, কারণ যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ন্যাটোতে যোগ দেওয়া ছিল তাদের অন্যতম নিরাপত্তা চাহিদা।
ইউক্রেনের অস্ত্রবাহিনী কমিয়ে আনা: পরিকল্পনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে—ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সদস্য সংখ্যা হবে ৬ লাখ। ন্যাটো ইউক্রেনে কোনো সেনা মোতায়েন করবে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউক্রেনকে দুর্বল করে রাশিয়ার দাবিকে অগ্রাধিকার দেওয়াই এ প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা: যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে, তবে এর সঙ্গেই রয়েছে কিছু কঠোর শর্ত—ওয়াশিংটন এ নিশ্চয়তার জন্য ক্ষতিপূরণ পাবে। ইউক্রেন যদি রাশিয়া আক্রমণ করে, তবে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বাতিল হবে। রাশিয়া যদি ইউক্রেনকে আক্রমণ করে, তাহলে সব নিষেধাজ্ঞা আবার আরোপ হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্ররা সমন্বিত সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাবে। ইউক্রেন অযথা মস্কো বা সেন্ট পিটার্সবার্গ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লে এ নিশ্চয়তা বাতিল হবে। এ শর্তগুলো অনেক বিশ্লেষকের মতে ‘অস্বাভাবিক এবং অসম’।
অর্থনীতি ও পুনর্গঠনে বড় বিনিয়োগ: ইউক্রেন পুনর্গঠনে ১০০ বিলিয়ন ডলার রাশিয়ার জব্দকৃত সম্পদ ব্যবহার করা হবে। ইউরোপ ১০০ বিলিয়ন যোগ করবে। এ বিনিয়োগ থেকে যুক্তরাষ্ট্র লাভের ৫০ শতাংশ পাবে। বাকি জব্দ সম্পদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার যৌথ বিনিয়োগ প্রকল্প গঠন হবে।
রাশিয়াকে আবার বৈশ্বিক মঞ্চে ফেরত আনা: পরিকল্পনায় রাশিয়ার জন্য বেশ কয়েকটি সুবিধা স্থাপন করা হয়েছে—আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া হবে। রাশিয়াকে ফের জি৮-এ যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হবে। এ বিষয়গুলো ইউক্রেনে ক্ষোভ তৈরি করেছে, কারণ তারা মনে করছে যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া কোনো মূল্য দিচ্ছে না।
মানবিক বিষয়গুলো: পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে—সব যুদ্ধবন্দিকে সমতার ভিত্তিতে বিনিময় করা হবে। শিশুদের ফেরত দেওয়া হবে। যুদ্ধপীড়িত পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হবে। এ অংশকে ইউক্রেন ইতিবাচক বলে দেখালেও তারা বলছে—যুদ্ধ শুরুর জন্য কোনো পক্ষকে দায়মুক্তি দেওয়া ন্যায্য নয়।
যুদ্ধাপরাধে পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে উদ্বেগ: ২৬তম শর্তে বলা হয়েছে—যুদ্ধকালীন সব কর্মকাণ্ডের জন্য সব পক্ষ সম্পূর্ণ ক্ষমা পাবে। বিশেষজ্ঞ কিয়ার জাইলস বলেন—এভাবে চুক্তি করলে বিশ্বে বার্তা যাবে যে শক্তি দিয়ে ভূখণ্ড দখল করলে তার পুরস্কার পাওয়া যায়।
ইউক্রেন কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে: জেলেনস্কি প্রস্তাবটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেননি, তবে জানিয়েছেন—এটি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি। ইউক্রেন নিজস্ব শর্ত রয়েছে। প্রথমে মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তিনি বলেন, ইউক্রেন শান্তি চায়—কিন্তু সেই শান্তি স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করে হতে হবে।
ইউরোপের উদ্বেগ: ইউরোপ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেয়নি, তবে বহু নেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন—ইউক্রেনকে ভূখণ্ড ছাড়তে বাধ্য করে এমন পরিকল্পনা তারা গ্রহণ করবে না।
রাশিয়ার অবস্থান: মস্কো বলছে, এ পরিকল্পনা নিয়ে তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।
পরিকল্পনা কি বাস্তবে কার্যকর হতে পারে: অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন—পরিকল্পনা বাস্তবায়নযোগ্য নয়, অনেক শর্ত অস্পষ্ট ও বাস্তবতার সঙ্গে অসংগত। ইউক্রেন ও ইউরোপ এর অনেক অংশ সংশোধন চাইবে। কিয়ার জাইলস বলেন—এটা আগের অনেক পরিকল্পনার মতো আরও একটি ব্যর্থ খসড়া। ট্রাম্পের ২৮ দফা পরিকল্পনা যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার কথা বললেও এতে ইউক্রেনের জন্য কঠিন শর্ত রয়েছে এবং রাশিয়ার জন্য বিস্তর সুবিধা। ইউক্রেন, ইউরোপ এবং বহু বিশ্লেষক এটিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন। তাই এটি বাস্তবে যুদ্ধ শেষ করবে—এমন সম্ভাবনা কম।