

যুক্তরাষ্ট্র অতীতে পশ্চিম গোলার্ধে তার প্রতিবেশী দেশগুলোয় বহুবার প্রাণঘাতী হস্তক্ষেপ করেছে। সর্বশেষ উদাহরণ হলো শনিবার ভেনেজুয়েলায় হঠাৎ চালানো অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা। এ পদক্ষেপটি খুবই দুঃসাহসিক। এ আগ্রাসন বিশ্বকে সাম্রাজ্যবাদী থাবার ঝুঁকিতে ফেলেছে।
লাতিন অঞ্চলের ভেনেজুয়েলা আগেই প্রায় ভেঙে পড়া একটি দেশ। ২০১৩ সালের পর থেকে দেশটির অর্থনৈতিক উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। এ অবস্থায় দেশটির নেতৃত্ব সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের এ উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে। এরই মধ্যে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এ সংকট আরও বড় হতে পারে এবং মিত্র দেশ কিউবাকেও অস্থির করে তুলতে পারে। এটি বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে নতুন প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কিন হামলার ঘোষিত লক্ষ্য হলো রাষ্ট্র সমর্থিত একটি বৈশ্বিক মাদক পাচার চক্র ধ্বংস করা। এ অভিযোগে মাদুরোর বিরুদ্ধে নিউইয়র্কে মামলা হয়েছে। এতে ৩৬ বছর আগে পানামার শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটক করে বিচারের মুখোমুখি করার ঘটনার কথা মনে পড়ে।
তবে বিষয়টি আরও বিতর্কিত, কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাত্র গত মাসেই হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে ক্ষমা করে দেন, যিনি মাদক পাচারের দায়ে ৪৫ বছরের সাজা ভোগ করছিলেন। শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প আরেকটি কারণও জানান: বহু বছর আগে ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প জাতীয়করণ করা হয়েছিল, যেখানে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সম্পদও ছিল।
এতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বস্তুগত স্বার্থ রয়েছে। ভেনেজুয়েলার তেল মজুত বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড়। কিন্তু দেশটির তেল শিল্প ভেঙে পড়েছে। ২০২৫ সালে তেল উৎপাদন দৈনিক গড়ে ১১ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে, যেখানে ১৯৭০-এর দশকে তা ছিল ৩৫ লাখ ব্যারেল। ট্রাম্প বলেছেন, তার প্রশাসন দেশটির দায়িত্ব নেবে এবং মার্কিন কোম্পানির মাধ্যমে তেল উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করবে।
এমন পরিকল্পনা আদর্শ পরিস্থিতিতেও বাস্তবায়ন করা কঠিন। উপরন্তু, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে কীভাবে দেশ চালানো হবে—এ বিষয়ে পরিকল্পনা খুবই অস্পষ্ট। মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়তে পারে। আরও শরণার্থী দেশ ছাড়লে প্রতিবেশী দেশগুলোয় জনরোষ বাড়তে পারে, যেমনটি আংশিকভাবে চিলিতে হোসে আন্তোনিও কাস্তের নির্বাচনী জয়ে ভূমিকা রেখেছিল। এতে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের চাপও বাড়তে পারে, যখন দেশটির অভিবাসন নীতি আরও কঠোর হচ্ছে।
এ অস্থিরতা কিউবাকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। কিউবা তাদের অধিকাংশ তেল ভেনেজুয়েলা থেকে পায়। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি অবরোধ শুরু করার পর থেকেই কিউবায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়েছে।
এই তেল মূলত রুশ ট্যাংকারে পরিবহন হতো এবং বেশিরভাগই চীন কিনত। এটি বড় ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। পেরুর বন্দর, বলিভিয়ার লিথিয়াম, ব্রাজিলের সয়াবিন বা চিলির তামায় চীনের বাড়তে থাকা বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্বিগ্ন করছে। আরও বিপজ্জনক বিষয় হলো—এ হামলা চীন ও রাশিয়াকে কী বার্তা দিচ্ছে। যদি ইউক্রেন ও ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে তাইওয়ান বা অন্য কোথাও তা আরও সম্ভব হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন আগ্রাসন চীনকে তাইওয়ান এবং দক্ষিণ চীন সাগরের কিছু অংশের ওপর তার আঞ্চলিক দাবি জোরদার করতে উৎসাহিত করবে। তবে তাইপেতে কোনো সম্ভাব্য আক্রমণকে ত্বরান্বিত করবে না।
তবুও বিশ্লেষকরা বলছেন, এ আগ্রাসন চীনকে একটি অপ্রত্যাশিত সুযোগ করে দিয়েছে। বেইজিং সম্ভবত নিকট ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সমালোচনা জোরদার করতে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজস্ব অবস্থান জোরদার করতে এটি ব্যবহার করবে।
মন্তব্য করুন