

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে এক মাসের যুদ্ধের পর স্থল অভিযানের জন্য প্রস্তুত বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের চেষ্টার আড়ালে ইরানে চূড়ান্ত হামলার জন্য তৈরি হচ্ছে ওয়াশিংটনের বাহিনী। তবে সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে—যুক্তরাষ্ট্র যদি উপসাগর এলাকায় অবস্থিত ইরানের দ্বীপগুলো দখল করতে চায়, তাহলে সে অভিযান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাদের ভাষ্য, মার্কিন সেনারা সহজে দ্বীপপুঞ্জে নামতে পারলেও পরে তারা ‘গুলি বর্ষণের লক্ষ্যবস্তু’ বা এক ধরনের ফাঁদে আটকে পড়তে পারে। যেখানে সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বল থাকবে এবং লক্ষ্য পরিষ্কার নাও থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো হামলা শুরু হলে প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্র ইলেকট্রনিক যুদ্ধ চালাবে। অর্থাৎ রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করার চেষ্টা করা হবে। এরপর শুরু হবে ব্যাপক বিমান হামলা, যার লক্ষ্য হবে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা। এ ধাপগুলোকে ‘প্রস্তুতিমূলক অভিযান’ বলা হয়, যা মূল আক্রমণের আগে চালানো হয়।
ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ এ ধরনের অভিযানের লক্ষ্য হতে পারে। এর মধ্যে খারগ দ্বীপ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই ইরান তার প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি করে। এ ছাড়া আবু মুসা দ্বীপ এবং তার আশপাশের ছোট দ্বীপগুলোও গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলো নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে। আরেকটি বড় লক্ষ্য হতে পারে কেশম দ্বীপ, যা আকারে বড় এবং যেখানে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণের জন্য টানেল তৈরি করেছে। এই দ্বীপে প্রায় দেড় লাখ মানুষ বাস করে এবং এটি মূল ভূখণ্ডের খুব কাছাকাছি।
বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রপথে আক্রমণের চেয়ে আকাশপথে অভিযান চালানোর সম্ভাবনাই বেশি। কারণ ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ রাখে, ফলে বড় জাহাজ নিয়ে সেখানে প্রবেশ করা কঠিন। তাই হেলিকপ্টার ও বিশেষ বিমান ব্যবহার করে সেনা নামানো হতে পারে। যেমন ভি-২২ অসপ্রে, চিনুক বা ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ব্যবহার করে সেনাদের দ্রুত দ্বীপে নামানো সম্ভব।
তবে এ ধরনের আকাশপথে নামা সেনাদের জন্য খুবই বিপজ্জনক হতে পারে। তারা শত্রুর সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠবে। ইরানের কাছে রয়েছে কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, এমনকি সাধারণ অস্ত্র ও রকেট চালিত গ্রেনেড (আরপিজি), যেগুলো দিয়ে হেলিকপ্টার ও সেনাদের আঘাত করা সম্ভব।
এ ছাড়া এ ধরনের অভিযান চালাতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে উপসাগরীয় দেশগুলোর ঘাঁটি ব্যবহার করতে হবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কুয়েতের মতো দেশগুলোর সহযোগিতা ছাড়া এ অভিযান সম্ভব নয়। যদিও কিছু দেশ এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে বলে জানা গেছে।
ইতিহাস বলছে, এমন দ্বীপ দখলের অভিযান খুব কঠিন। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় ব্রিটেন আর্জেন্টিনার কাছ থেকে দ্বীপগুলো পুনর্দখল করলেও তাদের বড় ক্ষতি হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের দ্বীপগুলো আরও কঠিন লক্ষ্য, কারণ এগুলো মূল ভূখণ্ডের খুব কাছাকাছি এবং সেখান থেকে সহজেই প্রতিরক্ষা জোরদার করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সহজেই দ্বীপে নামতে পারবে, কিন্তু এরপরই আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হবে। ইরান সরাসরি লড়াই না করে গেরিলা কৌশল ব্যবহার করতে পারে। তারা ছোট ছোট ইউনিটে ভাগ হয়ে আক্রমণ চালাবে এবং খোলা জায়গায় মুখোমুখি যুদ্ধ এড়িয়ে চলবে। এর ফলে মার্কিন বাহিনীর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো সরবরাহ ব্যবস্থা। দ্বীপে অবস্থান নেওয়ার পর সেনাদের নিয়মিত খাবার, জ্বালানি, গোলাবারুদ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে হবে। আহত সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও রাখতে হবে। সাধারণভাবে বলা হয়, একজন যোদ্ধার জন্য প্রায় ৯ জন সহায়ক কর্মী প্রয়োজন হয়। ফলে এই পুরো ব্যবস্থা চালানো খুবই কঠিন।
এর পাশাপাশি উপসাগরে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোও নিরাপদ নয়। ইরান এরই মধ্যে এসব ঘাঁটিতে হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে। ফলে মার্কিন সেনারা দ্বীপে থাকলেও তারা চারদিক থেকে হুমকির মুখে থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে মার্কিন বাহিনী একটি ‘ফাঁদে’ পড়ে যেতে পারে—যেখানে তারা প্রথমে সাফল্য পেলেও পরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ব্যর্থ অভিযানের উদাহরণ টেনে বলা হয়, শুরুতে জায়গা দখল করলেও পরে তা ধরে রাখা যায়নি।
অন্যদিকে, ইরান চাইলে পাল্টা আক্রমণও চালাতে পারে। তারা উপসাগরজুড়ে তেল স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালাতে পারে। এমনকি ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীকেও সংঘাতে যুক্ত করতে পারে, যারা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম।
সব মিলিয়ে ইরানের দ্বীপ দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ কোনো কাজ হবে না। সামরিকভাবে সফল হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে এবং পুরো অঞ্চলকে আরও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।