কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে তৈরি হওয়া অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাবে দেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রবণতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলের প্রচারণার কারণে হুন্ডিতে লেনদেন বেড়ে গেলে তা পাচারকারীদের সুবিধা করে দেবে বলেও মনে করেন তারা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি মিটিয়ে দেশের রিজার্ভ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয়। কারণ রপ্তানি খাতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হলেও আমদানিতে এর চেয়ে বেশি ব্যয় হয়। এই ঘাটতি মেটাতে গত কয়েক বছর বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণ খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থই হয়ে উঠেছে রিজার্ভের মূল উৎস।
তবে কোটাবিরোধী আন্দোলন কেন্দ্র করে সহিংসতার কারণে ইন্টারনেট সংযোগ ও ব্যাংক লেনদেন বন্ধ থাকায় প্রবাসীরা কয়েকদিন বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেনি। এ কারণে অনেকেই হুন্ডির শরণাপন্ন হয়েছে। পরে ব্যাংক লেনদেন চালু হলেও সময়সীমা কমেছে। আর ইন্টারনেট ব্যবহারে আরোপ করা হয়েছে নানা বিধিনিষেধ। এসব রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, সরকারের বিরোধী করতে গিয়ে অনেকদিন ধরেই দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছে বিভিন্ন মহল। কোটাবিরোধী আন্দোলন কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সেই প্রচারণা আরও তীব্র হয়েছে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন।
এর বিপরীতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সহিংস পরিস্থিতির কারণে ধনীরা দেশে নিরাপত্তাহীন মনে করলে বিদেশে পুঁজি পাচার করতে পারেন। আবার যারা অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করেছেন, তারা পরিস্থিতি প্রতিকূল মনে করে সম্পদ পাচার করতে পারেন।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মঈনুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থ পাচার বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ বেশ কয়েকদিন সারা দেশে ব্যাংক বন্ধ ছিল। এতে প্রবাসীরা চাইলেও বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেনি। কিন্তু তখন হুন্ডি তো বন্ধ হয়নি। বরং সহিংসতার কারণে হুন্ডি আরও বাড়তে পারে। কারণ যারা সরকারকে সমর্থন করে না, তারা ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাবে না। তারা হুন্ডির মাধ্যমে পাঠাবে। ফলে হুন্ডি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। আর হুন্ডি বেড়ে গেলে দেশ থেকে পুঁজি পাচারও বেড়ে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সামর্থ্যবানদের অনেকে দেশ ছাড়বেন। তাতে অর্থ পাচারও বেড়ে যাবে। অর্থ পাচার বাড়লে ডলারের চাহিদা বেড়ে যায় সবচেয়ে বেশি। এ সময় যদি প্রবাসী আয় কমে যায়, তাহলে চাপ আরও বাড়বে।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘চলমান অস্থিতিশীলতার সুযোগে অবশ্যই দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে যাবে। তার জন্য যত ধরনের অনুঘটক দরকার তার সবই বর্তমানে উপস্থিত রয়েছে। গত কয়েকদিনের ঘটনা দেশকে বড় রকমের একটা ধাক্কা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত এর ফল কী হবে, সে বিষয়ে অনেকেই নিশ্চিত হতে পারছেন না। কেউ কেউ চিন্তায় আছেন, তাদের অর্জিত সম্পদ রক্ষা পাবে কি না? আর ব্যবসায়ীরা চিন্তিত যে, এই দেশে আর ব্যবসার পরিবেশ ঠিক হবে কি না? তারা দেশের পরিবর্তে বিদেশে বিনিয়োগ করার কথা ভাবতে পারেন। আর সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকেই সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে। সবমিলিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যেতে পারে।’
তার মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ সাধারণ মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘যেসব অর্থনীতিতে যুদ্ধ থাকে, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকে, সেসব অর্থনীতিতে অতি ধনী লোকেরা নিজেদের নিরাপদ মনে করে না। এমনকি তাদের ছেলেমেয়েদেরও সেই দেশে অনিরাপদ মনে করে রাখতে চায় না। তখন তারা অর্থ পাচার বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ থেকে এর আগেও অর্থ পাচার হয়েছে। এখন চলমান অস্থিতিশীলতায় সেটা আরও বাড়বে। এটা বন্ধ করার সহজ উপায় নেই। আইন করে পৃথিবীর কোনো দেশ অর্থ পাচার বন্ধ করতে পারেনি। এটা বন্ধের সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা। সেইসঙ্গে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা।’
তিনি আরও বলেন, ‘অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রবাসী আয় আরও কমবে। বৈদেশিক ঋণও কমবে। সেইসঙ্গে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও আছে। বিদায়ী অর্থবছর রেকর্ড ৩ বিলিয়নের বেশি বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে। আগামী বছর সেটা আরও বাড়বে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপরও চাপ বাড়বে, যা দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯ থেকে ২৪ জুলাই ছয় দিনে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৭ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। অথচ চলতি মাসের প্রথম ১৮ দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রবাসী আয় এসেছিল ৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার। তাতে দেখা যাচ্ছে, মাসের প্রথম ভাগে এক দিনে যে পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছিল, সর্বশেষ গত ছয় দিনে এসেছে তার সমপরিমাণ।
গত ১৯ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত অবশ্য ব্যাংকিং কার্যক্রম চলেছে মাত্র এক দিন। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ন্ত্রণে ১৯ জুলাই শুক্রবার রাত থেকে কারফিউ জারি করে সরকার। এরপর মঙ্গলবার পর্যন্ত ব্যাংক বন্ধ ছিল। ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় ব্যাংকের অনলাইন লেনদেনও বন্ধ ছিল। কয়েকদিন লেনদেন বন্ধের পর ২৪ জুলাই ব্যাংক চালু হয়। ওই দিন লেনদেন চলে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চার ঘণ্টা। ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ১৯ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই বৈধ পথে তথা ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে প্রবাসী আয় আসাও সম্ভব ছিল না। এ সময়ের মধ্যে যারা বিদেশ থেকে প্রবাসী আয় পাঠিয়েছেন, গত বুধবার ব্যাংক খোলার প্রথম দিনেই তা দেশের ব্যাংকে জমা হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু সেটি হয়নি।
এদিকে, আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি (বিপিএম-৬) অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ২১ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি (২ হাজার ১৭৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার)। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, বর্তমানে রিজার্ভ প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩ সালের একই সময়ে ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল।