

মুক্তিযুদ্ধে অনেকেই ছিলেন। অনেক স্রোত, বহু ধারা; সবাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তৎপরতার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, কিন্তু সবার লক্ষ্য এক ছিল না। কারও জন্য স্বাধীনতাই ছিল যথেষ্ট, অন্যদের গন্তব্য ছিল মুক্তি। এ দুপক্ষের ব্যবধানটা আদর্শগত এবং অভ্যন্তরে শ্রেণিগতও। জনগণ চেয়েছে মুক্তি। তাদের কাঁধে ছিল ব্যবস্থার জোয়াল, সেটিকেই ছুড়ে ফেলে দিতে চেয়েছে।
উঠে দাঁড়াতে চেয়েছে মুক্ত মানুষের মর্যাদা নিয়ে। এ মুক্তি শুধু স্বাধীনতা নয়, স্বাধীনতার চেয়ে অনেক ব্যাপক ও গভীর। স্বাধীন রাষ্ট্রের যে নাগরিক অনেক ব্যাপারে তার স্বাধীনতা থাকে, অধিকার থাকতে পারে পছন্দ-অপছন্দের। কিন্তু তার ভেতরে বন্ধন থাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক। ওইসব বন্ধনের ফলে অন্যসব অধিকার অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে, পড়েও অনেক ক্ষেত্রে। যেমন পড়ে কৃষকের বেলায়। কৃষকের জন্য মুক্তি প্রয়োজন, মুক্ত হলে, অন্তত কিছুটা হলেও তবেই সে তার নাগরিক অধিকারের কথা ভাবতে পারবে, তার আগে নয়। বসবাস যার খোলা আকাশের নিচে, তার জন্য কোন অধিকারটা কার্যকর? কৃষকের সংগ্রাম তাই মুক্তির সংগ্রামই, আসলে। নারীকেও ওই মুক্তির জন্যই লড়তে হয়। স্বাধীনতা আসবে ওই মুক্তির পথ ধরেই।
একাত্তরের যুদ্ধে কৃষক যোগ দিয়েছিল, দিয়েছিল বলেই ওই যুদ্ধ গুণগতভাবে বদলে গিয়েছিল। কৃষকের জন্য স্বপ্ন ছিল শোষণ ও লাঞ্ছনা থেকে মুক্তির। সে ভেবেছে তার দারিদ্র্য ঘুচবে, মালিক, মহাজন, থানা-পুলিশ, আমলা-পিয়নের হাতে তাকে আর নির্যাতিত হতে হবে না। ন্যায্যমূল্য পাবে পণ্যের, মর্যাদা পাবে শ্রমের। এ লক্ষ্যটা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার লক্ষ্যের চেয়ে অনেক বড়। এ লক্ষ্যটা মুক্তির।
মধ্যবিত্ত কিছুটা সুযোগ আগেই পেয়ে গিয়েছিল। পাওয়া শুরু হয়েছে ব্রিটিশ আমলেই। পাকিস্তানের কালে তা আরও বেড়ে গিয়েছিল। মধ্যবিত্ত বিকশিত হয়েছে। তার বিকাশের স্বার্থে সাতচল্লিশের স্বাধীনতা প্রয়োজনীয় ছিল; একাত্তরের স্বাধীনতাও সে চেয়েছে বিকাশের ওই ধারাকে অব্যাহত রাখার প্রয়োজনেই। এ মধ্যবিত্তের জন্য স্বাধীনতার অর্থ ছিল আত্মোন্নতি। হিন্দু প্রতিদ্বন্দ্বীকে হটিয়ে দিয়ে, তাদের আসন, এমনকি জায়গা-জমিও দখল করে সাতচল্লিশের পরে সে বেশ খানিকটা উন্নতি করেছিল। তার দরকার ছিল আরও উন্নতির। তাই প্রয়োজন নতুন যে প্রতিপক্ষ পরিচয়ে যে অবাঙালি, তাকে হটিয়ে দেওয়া। সে তাই সংগ্রামে নামল। কিন্তু তার ওই সংগ্রাম এমনভাবে জয়যুক্ত হতো না যদি না সাধারণ মানুষ এতে যোগ দিত। সাধারণ মানুষও উন্নতি চেয়েছে। কিন্তু তার উন্নতির জন্য প্রয়োজন ছিল সার্বিক না হোক, কিছুটা হলেও মুক্তির, যা স্বাধীনতার তুলনায় বড়। মধ্যবিত্ত চেয়েছে রাষ্ট্র বদলাবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা থাকবে সেই আগের মতোই। থাকবে তার আমলাতন্ত্র, রয়ে যাবে প্রভু-ভৃত্যের, ধনী-গরিবের সেই পুরাতন সম্পর্ক। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা তার জন্য আরও সুযোগ এনে দেবে উন্নত হওয়ার। ধনী হওয়ার। তা রাষ্ট্র কতটা স্বাধীন হয়েছে তা বলা যাচ্ছে না। স্বাধীন রাষ্ট্র বিদেশি রাষ্ট্রের দূতদের ডেকে পাঠায়; সেটাই নিয়ম; আমাদের রাষ্ট্রে বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা যখন-তখন দরজায় টোকা দেয়, ঢুকে পড়ে, বলে দেয় কী করতে হবে এবং সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়ই উদ্গ্রীব থাকে তাদের সন্তুষ্ট করতে। শুরুতে বলা হয়েছিল বাংলাদেশ ঋণ নেবে না, এখন সরকারের বীরত্ব নির্ভর করে ঋণপ্রাপ্তির পরিমাণের ওপর। ঋণ করা কৃষকের জন্য অসম্মানের ব্যাপার। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের জন্য নয়, কেননা তারা স্বাধীন। বাজার উন্মুক্ত হয়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিই করছে, নতুন নতুন নাম নিয়ে। এ বন্ধনের মধ্যেই কিছু কিছু মানুষ স্বাধীনতা পেয়ে গেছে। নিজ নিজ মহিমার পতাকা হাতে নিয়ে তারা লুণ্ঠন করছে অবাধে। এখন যেসব দেশ উন্নত বলে দর্পিত তাদের উন্নতির ইতিহাসও লুণ্ঠনের ইতিহাসই বটে। তারা দস্যু ছিল। কিন্তু তৎপরতার বেশিরভাগ ছিল বাইরে। জলদুস্য হিসেবে বের হয়ে পড়েছে, উপনিবেশ গড়েছে। আমাদের ধনীরাও ওই কাজই করে, লুণ্ঠন করে, তবে বাইরে করবে এমন সাহস ও সাধ্য রাখে না, করে দেশের ভেতরেই।
লুণ্ঠনের এ স্বাধীনতার কারণে মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের স্বপ্ন প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তারা যেদিকে তাকায় শুধু ডাকাত দেখে। ছিনতাইকারী, ঘুষখোর, ধর্ষণলোলুপ—এসবই দেখতে পায়, মানুষের খোঁজ পায় না। মানুষ যে নেই, তা নয়। আছে। অধিকাংশ মানুষই মানুষ বটে, ভালো মানুষ। কিন্তু তারা স্বাধীন নয়, তারা বন্ধনে জর্জর। লুকিয়ে থাকে, অথবা ব্যস্ত থাকে নিজেকে বাঁচাবার সংগ্রামে। সহজে চোখে পড়ে না।
যুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে অংশগ্রহণ তাতে কোনো প্রকার ফাঁক ছিল না, অবকাশ ছিল না ফাঁকির। কেননা, সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনো জায়গা ছিল না পিছু হটবার। তা ছাড়া তাদের মধ্যে কোনো সুবিধাবাদিতা ছিল না। সব যুদ্ধেই তাদের অংশগ্রহণ হয় সর্বাত্মক। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লায়, ফরায়েজী আন্দোলনে, তেভাগার সংগ্রামে, ছেচল্লিশ, চুয়ান্ন ও সত্তরের নির্বাচনে আমরা দেখেছি কৃষক অংশ নিলে সর্বাত্মকভাবেই অংশ নেয়। কিন্তু সেই কৃষক মুক্তি পায়নি। আগেও নয়, একাত্তরের পরেও নয়। তারা ফসল ফলায়, ফসল ভালো না হলে তাদের মুখ শুকায়। খুব ভালো হলেও হাসি মিলিয়ে যায়, দাম পড়ে যাবে, খরচ উঠবে না এ আশঙ্কায়। তারা ক্রমাগত ভূমি হারায়। কোথায় যায়, স্বাধীন মধ্যবিত্ত খবর রাখে না।
জনগণ মুক্তি পায়নি। না সে আমলে, না এ আমলে। স্বাধীনতা এসেছে কতিপয়ের, যা ইচ্ছা তা করার; বাদবাকিরা বন্দি হয়ে আছে। শুধু যে অভাব ও নিষ্পেষণের হাতে তা নয়, হতাশার হাতেও। তা অনেক কিছুরই অভাব এখন দেশে। কিন্তু সবচেয়ে বড় অভাব হচ্ছে সৃষ্টিশীলতার। সৃষ্টিতে যে আনন্দ পাবে মানুষ সে-অবস্থা নেই। আনন্দ খুঁজছে লোকে একটি সংকীর্ণ পথে। সেটি ভোগের। বীরত্ব নতুন সৃষ্টিতে নেই, সংকুচিত হয়ে এসেছে তা ক্লেদাক্ত ভোগে। ওইখানেই প্রতিযোগিতা, ওইখানেই আনন্দ। একের ভোগ অন্যের জন্য সৃষ্টি করছে দুর্ভোগ। অল্প কিছু আত্মসন্তুষ্ট মানুষ বোঝা হয়ে বসে রয়েছে দেশের কয়েক কোটি মানুষের অসহায় কাঁধে। সৃষ্টি ব্যক্তিই করে, কিন্তু একলা করে না, পারে না করতে। সাহায্য, সহযোগিতা, স্বীকৃতি, উৎসাহ, অনেক কিছু প্রয়োজন হয়, যা আসে অপরের কাছ থেকে। দরকার হয় উপযুক্ত পরিবেশের। সেই পরিবেশ গেছে নষ্ট হয়ে। মুক্তিযুদ্ধে অনেক কিছু ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু ধ্বংসের সব কোলাহলের মধ্যে প্রবহমান ছিল একটি সৃজনশীলতা। বিপদ উপেক্ষা করে, দুঃসহ যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে প্রাণপণে মানুষ একটি পথ তৈরি করছিল। মুক্তির। একসঙ্গে মিশেছিল মানুষ। পুরাতন সম্পর্কের দূরত্ব ভেঙে ফেলে একটি নতুন সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। অভিন্ন ছিল পরিচয়। বিজয়ের পরে প্রথমে যা ভাঙল তা হলো ওই সামাজিক সম্পর্ক। কৃষক চলে গেল বিধ্বস্ত গ্রামে। মধ্যবিত্ত বের হলো সুযোগের সন্ধানে। যারা পারল উঠল, অন্যরা নেমে গেল নিচের দিকে। স্বাধীনতা পেল কেউ কেউ, অন্যসব মানুষের মুক্তির আশাকে পদদলিত করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে আমরা দূরে সরে গেছি, ওটা একটা বাস্তবিক সত্য। কিন্তু মুক্তির সংগ্রামে কী অর্জন করতে চেয়েছিল সেটা যেন না ভুলি। কয়েকটি ধ্বনি তৈরি করতে চায়নি, তৈরি করতে চেয়েছিল একটি নতুন সমাজ, যেখানে মানুষ মানুষে দূরত্ব কমে যাবে এবং প্রতিষ্ঠিত হবে অধিকার ও সুযোগের সাম্য। অসমতাকে বৃদ্ধির সুযোগ ও স্বাধীনতা দিয়ে দেশের মানুষকে মুক্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছি—এ মত শুধু তারাই প্রচার করতে পারে যারা নিজেরা বিভ্রান্ত, কিংবা যারা অন্যদের বিভ্রান্ত করতে আগ্রহী।
মুক্তির সংগ্রাম শেষ হয়নি। হবেও না, যতদিন না আমরা নতুন সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি। প্রভু-ভৃত্যের নয়, সহযোদ্ধার। বন্ধুর।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়