সরকারের পদত্যাগের একদফা আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি নিয়ে শিগগির রাজপথে নামতে চায় বিএনপি। এর আগে নানা কৌশলে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে চায় দলটি। সেই লক্ষ্যে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ ও উজ্জীবিত করতে তৃণমূল পর্যায়ে সফর করবেন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারা। দেশের তরুণদের সম্পৃক্ত করতে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষক দলকে সক্রিয় করা হচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত রোববার চার সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া দলীয় নেতা ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে যারা টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমে কথা বলেন, তাদের নিয়েও আলাদা বৈঠক হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল ও জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর আন্দোলন ইস্যুতে তাদের বিভিন্ন প্রস্তাব ও মতামত পর্যালোচনা করছে বিএনপির হাইকমান্ড। গত ১২ থেকে ১৬ মে যুগপৎ আন্দোলনের বিভিন্ন দল ও জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছে বিএনপি। এসব বৈঠকে যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াতের অবস্থানসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ও রিজার্ভ সংকটের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে নতুন কোনো কর্মসূচি দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দলীয় নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে জেলা সফরের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। এই সফরের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে গত রোববার চারটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি বৈঠক করেছেন তারেক রহমান। ওই বৈঠক শেষে একাধিক নেতা জানান, মূলত জেলা সফরে তৃণমূলের সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া আর তাদের কষ্টের কথা শুনবেন কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে টার্গেট করে কেন সরকারের নানা মহল থেকে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়, তার একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। এর উদ্দেশ্য নেতাকর্মীরা যাতে কোনো অবস্থায় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে বিভ্রান্ত না হন, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা।
বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের দুজন নেতা বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমূখী, দুর্নীতিসহ নানা বিষয় সামনে এনে সরকারের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হবে তৃণমূল সফরে। এ ছাড়া সফরকালে নেতারা বিগত আন্দোলনে গুম, খুন, পঙ্গু কিংবা গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন।
যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোনায়েম মুন্না জানান, ‘গত ৭ জানুয়ারির একতরফা ডামি নির্বাচন-পরবর্তী জেলা পর্যায়ে যুবদলের নেতাকর্মীদের ওপর স্বৈরাচারী সরকারের
জেল-জুলুম, নির্যাতন থেমে নেই। আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মী হামলা-মামলায় জর্জরিত। অনেকেই জীবন দিয়েছেন। এখনো বিচারালয় কর্তৃক সরকারের ফরমায়েশ অনুযায়ী দলীয় বিবেচনায় নিয়োগকৃত বিচারকদের মাধ্যমে যুবদল নেতাকর্মীরা নিগৃহীত হচ্ছেন। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে তৃণমূলে সফর করব।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, ছাত্রদল এরই মধ্যে রাজশাহী বিভাগের জেলা ও মহানগরের কর্মিসভা সম্পন্ন করেছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে ফরিদপুর বিভাগে (সাংগঠনিক) কর্মিসভা শুরু হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক দল ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে কাজ শুরু করেছে। শুক্রবার থেকে ৮২টি সাংগঠনিক জেলায় সফর শুরু করছে যুবদল। এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মামলা প্রত্যাহার ও গণতন্ত্র এবং ভোটাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে দেশব্যাপী মতবিনিময় করবে কৃষক দল। শুক্রবার বিকেলে সিরাজগঞ্জ জেলা, শনিবার সকালে জয়পুরহাট জেলা এবং একই দিন বিকেল ৩টায় বগুড়া জেলা কৃষক দলের উদ্যোগে মতবিনিময় সভা হবে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাসান জাফির তুহিন এসব সভায় উপস্থিত থাকবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গণমাধ্যমে নিয়মিত কথা বলেন, এমন নেতাদের সঙ্গেও আলাদা বৈঠক করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। সেখানে সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, শেখ রবিউল আলম রবি, শহিদুল ইসলাম বাবুল, ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত অংশ নেন। বৈঠকে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের প্রচার করা বিভিন্ন তথ্যের বিপরীতে সঠিক ইতিহাস ও তথ্য সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারাহানা কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা যারা মিডিয়ায় নিয়মিত কথাবার্তা বলি বা টকশোতে অংশগ্রহণ করি, তাদের সঙ্গেও তারেক রহমান বৈঠক করে কথা বলেছেন। কেননা, আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপি ও তারেক রহমান সম্পর্কে বিভিন্ন অপপ্রচার অব্যাহত রেখেছে। এসবের বিপরীতে আমরা যাতে সঠিক তথ্য সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরি, সেটিই আমাদের বলা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দক্ষতার সঙ্গে দল পরিচালনা করায় বিএনপি সাংগঠনিকভাবে আরও শক্ত হয়েছে। তিনি তৃণমূলের নেতাকর্মীসহ সবার সঙ্গেই নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের জেলা-উপজেলা সফরের উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা হবে।’
বিএনপির একাধিক নেতা জানান, জাতীয় সংসদ ও উপজেলা নির্বাচন বর্জনের ডাক সফল হওয়ায় তারেক রহমান আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও পরিচিতি এবং গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন। বিএনপির নেতৃত্ব সংকট নিয়ে শঙ্কা ছিল, তা কেটে গেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কালবেলাকে বলেন, ‘তারেক রহমান শুধু বিএনপির নেতা নন, তিনি এখন সাধারণ মানুষের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সরকারের লোকজন যাই বলুক, কাজে আসবে না।’
আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের নেতাকর্মীরা ক্লান্ত কিন্তু হতাশ নন। শিগগিরই পরবর্তী কর্মসূচির সিদ্ধান্ত আসবে।’