রাজধানীর শেরেবাংলা নগর। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নানা অফিস স্থানান্তর হচ্ছে এ এলাকায়। সেজন্য গড়ে উঠছে একের পর এক আলিশান ভবন। রয়েছে সরকারি-বেসরকারি বেশ কয়েকটি হাসপাতাল। যাতায়াতের সুবিধার জন্য প্রশস্ত করা হয়েছে রাস্তাঘাট। নানা কাজে প্রতিদিন এখানে আসছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শেরেবাংলা নগর ঘিরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে বেশ কয়েকটি অপরাধ চক্র। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তৎপর কাউন্সিলর ফোরকান হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যদের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গ্রুপ। এরই মধ্যে স্থানীয়ভাবে শেরেবাংলা নগরের ‘শের পরিবার’ হিসেবে পরিচিতি গড়ে উঠছে তাদের। নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য, ঠিকাদারি, ফুটপাত, অ্যাম্বুলেন্স, এমনকি এ এলাকার সবগুলো মার্কেটেও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ফোরকান পরিবারের। সেইসঙ্গে অভিযোগ রয়েছে সরকারি জমি দখলেরও।
স্থানীয়রা বলছেন, এক সময় সংসার চালাতেই হিমশিম খেত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ২৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফোরকানের পরিবার। অভাবের তাড়নায় ছোটখাটো নানা ধরনের কাজ করত। এক পর্যায়ে গড়ে তুলেছিল রিকশার গ্যারেজ। তবে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সুবাদে সেই পরিবার এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। শেরেবাংলা নগর এলাকায় তাদের কথার বাইরে হয় না কিছুই। দখল-আধিপত্যে যুক্ত রয়েছেন তিন ভাই। তবে চাঁদাবাজি চলে কাউন্সিলর ফোরকান হোসেনের নামেই। অনেকটা প্রকাশ্যেই এই নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন অন্য দুই ভাই সিরাজুল ইসলাম ও আসাদুজ্জামান। এই পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জমি দখল, হত্যাসহ নানা অভিযোগে মামলাও রয়েছে। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা এই পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতেও ভয় পান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষমতার দাপটে আগারগাঁও মমতা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের (বিএনপি বাজার) প্রধান উপদেষ্টা পদ দখল করেছেন ফোরকান। এর ছয় মাসের মধ্যেই বিভিন্ন নামে ভাউচার করে ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা লোপাট করেছেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় এক প্রার্থীর সভা করার নামে বাজার কমিটির কাছ থেকে দুই ভাই প্রায় ৪০ লাখ টাকা নিয়েছেন। টাকা দিতে না চাওয়ায় প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় ব্যবসায়ীদের। দোকান স্থায়ী করার নামে প্রায় ৬০০ ব্যবসায়ীর কাছে থেকে এক লাখ টাকা করে নিয়েছেন কাউন্সিলর। লটারির মাধ্যমে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার কথা থাকলেও যারা টাকা দিয়েছেন, তাদের অনেককে বাদ দিয়ে ফোরকানের আত্মীয়স্বজনের নাম দেওয়ার অভিযোগ আছে।
মমতা বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বেলায়াত হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে জোর করে বাজার কমিটির উপদেষ্টা হন কাউন্সিলর ফোরকান— যা সম্পূর্ণ অবৈধ। কমিটিতে থাকাকালে ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকার অনিয়ম করেছেন। এটা নিয়ে বাজার কমিটি অভিযোগ দিয়েছে। তার ভয়ে কেউ কথা বলতে চায় না।’
ফোরকানের ভাই আসাদের নেতৃত্বে আগারগাঁও অঞ্চলে গড়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। নিউরোসায়েন্স ও পঙ্গু হাসপাতালে রোগী এবং লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স থেকে দুই থেকে তিন হাজার করে টাকা নেয় এই চক্র। অ্যাম্বুলেন্স পার্কিংয়ের জন্য ২০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয়। শুধু হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স থেকে মাসে প্রায় ৪০ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়।
অভিযোগ আছে, কিশোর গ্যাং ছাড়াও আসাদুজ্জামান আসাদের একটি বাহিনী আছে। তার সহযোগী হিসেবে আছে ময়লা মনির, খায়ের মোল্লা, আকরাম, আয়নাল হাওলাদার, তৌকির আহমেদ, সুমন, ইসমাইল হোসেনসহ ১৫-২০ জন। আসাদ তার কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আগাঁরগাওয়ের বিভিন্ন ফুটপাত, তালতলা বাজার ও পাসপোর্ট অফিসের সামনের দোকান এবং আশপাশের ফুলবাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। তালতলা ও ফুলবাজার মাকের্ট থেকে প্রতি মাসে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা ওঠে।
আসাদুজ্জামান আসাদের ছত্রছায়ায় তালতলা বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন শেরেবাংলা নগর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম হৃদয়। অবৈধভাবে সরকারি জায়গা দখল করে তারা গড়েছেন বিপুলসংখ্যক দোকান। সেগুলো ভাড়া দিয়ে মাসে অন্তত দশ লাখ টাকা আয় করেন হৃদয়। সেইসঙ্গে গাঁজা থেকে শুরু করে ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে হৃদয়ের বিরুদ্ধে। এ কারণে ছাত্রলীগের এই নেতা আগারগাঁও এলাকায় ‘গুটি হৃদয়’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। মাদক কারবারে জড়িত থাকায় কয়েকবার জেলও খেটেছেন তিনি।
কিছুদিন আগে স্বেচ্ছাসেবক লীগের আনন্দ মিছিল শেষে দুই গ্রুপের
বাগবিতণ্ডার জেরে ছুরিকাঘাতে মেহেদী হাসান নামে এক যুবককে হত্যা করে আসাদুজ্জামান আসাদের লোকজন। ওই ঘটনায় হত্যা মামলা হওয়ার পর আসাদ গা ঢাকা দেন।
এর আগে আবুল ঢালী নামে একজন গাড়ি চালকের কবজি কেটে নেয় আসাদের লোকজন। এ বিষয়ে ২০১৮ সালের ৩ আগস্ট করা মামলাটি (মামলা নং ২২) বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। চাঁদাবাজির মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ায় সায়মা রহমান নামে একজনকে মারধর করা হয় আসাদের নেতৃত্বে। পরে আসাদকে প্রধান করে ১২ জনের নামে একটি মামলা করেন তিনি।
শেরেবাংলা নগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল আহাদ কালবেলাকে বলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবক লীগের র্যালিতে একটি ছেলেকে ছুরি মেরে হত্যার ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে যার বিরুদ্ধে সরাসরি ছুরি মারার অভিযোগ উঠেছে, সেও আছে।’
আসাদুজ্জামান আসাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেসব মামলার অগগ্রতির বিষয়ে আদালত বলতে পারবেন।’
জানা গেছে, আগারগাঁও ৬০ ফিট এলাকায় রাস্তা দখল করে বাড়ি নির্মাণের প্রস্ততি নিচ্ছেন ফোরকান পরিবার। ৬০ ফুট সড়ক সংলগ্ন কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সড়কের ৬০০ থেকে ৭০০ বর্গফুট জায়গা বন্ধ করে বানানো হয়েছে একটি প্লট। সেখানে ভবন নির্মাণের জন্য টিন দিয়ে চারপাশ ঘেরাও করা হয়েছিল। পরে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় তা ভেঙে ফেলা হয়। ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য একটি ডেভেলপার কোম্পানির সাইনবোর্ডও টানানো হয়েছে। নকশা অনুযায়ী সড়কটি ২০ ফুট চওড়া থাকার কথা; কিন্তু এই রাস্তার ১০ ফুট দখল হয়ে গেছে। চলছে বাড়ি নির্মাণের প্রস্তুতি।
ফোরকানের বিরুদ্ধে করোনাকালে সাহায্যের নামে লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। এলাকার বিত্তশালীদের কাছ থেকে অনেকটা জোর করেই অন্তত ২০ লাখ টাকা আদায় করেন তিনি। সামান্য কিছু টাকার ত্রাণ বিতরণ করে বাকিটা আত্মসাৎ করেন এই কাউন্সিলর। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়।
জানা গেছে, আসাদুজ্জামান আসাদের নেতৃত্বে বিএনপি বস্তির সন্ত্রাসী মনির হোসেন, শাপলা হাউজিংয়ের আয়নাল, পঙ্গু হাসপাতাল এলাকার আব্দুর রবসহ কয়েকজন ময়লা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা আদায় করেন। এ নিয়ে পুলিশে অভিযোগও দেওয়া হয়। গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আগারগাঁওয়ে দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তির বাড়ি দখলের চেষ্টা করে আসাদ ও তার লোকজন। এ সময় তারা জমির মালিক ও তার ছেলেকে মারধর করে। এমনকি নিজেদের মালিক দাবি করে সেখানে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয় আসাদ।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, কাউন্সিলর ফোরকানের বড় ভাই সিরাজুল ইসলাম এক সময় রিকশা চালানোর পাশাপাশি মাথায় করে আইসক্রিম বিক্রি করতেন। থাকতেন হাতিম আলী রিকশা গ্যারেজে। ভাই কাউন্সিলর হওয়ার পর ক্ষমতার দাপটে তিনিও ঘুরে দাঁড়ান। আগারগাঁওয়ে আনন্দ, বন্ধন নামে সমবায় সমিতি ও পাল্টিপারপাস খুলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আসাদুজ্জামান আসাদ কালবেলাকে বলেন, ‘থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হলেও কোনো চাঁদাবাজি, জমি দখলের সঙ্গে জড়িত নই। যারাই এসব বলছে, মিথ্যা বলছে।’
একইভাবে সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেন কাউন্সিলর ফোরকান হোসেন। কালবেলাকে তিনি বলেন, এসব মিথ্যা। আমি কোনো চাঁদাবাজি করি না। আপনি এলাকায় এসে খোঁজখবর নিতে পারেন। আমার কোনো লোকজন নাই।’