ফোকাস ডেস্ক
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১০ মে ২০২৬, ০৮:১৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

যেভাবে ক্ষমতার শিখরে শুভেন্দু

যেভাবে ক্ষমতার শিখরে শুভেন্দু

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাচক্রে কলকাতার ভবানীপুর আসন থেকে জয়ী দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী তিনি। সদ্যসাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই আসন থেকে তিনবার ভোটে লড়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।

মমতার এক সময়ের রাজনৈতিক সতীর্থ থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছিলেন শুভেন্দু। তার কাছেই পরপর দুটো বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন মমতা, প্রথমবার ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে, আবার এবার তার ঘরের মাঠ বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে।

সোমবারের ভোট গণনায় বিজেপি রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে, যার ফলে মমতার তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।

২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগের বছর তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। ওই নির্বাচনে তিনি তার পুরোনো দল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থানের কারণে দলীয় কর্মীদের কাছে ‘হিরো’ হয়ে উঠেছিলেন। পরবর্তী পাঁচ বছর সেই আক্রমণের ধার একটুও কমেনি। সঙ্গে তৃণমূলস্তর থেকে দলের সাংগঠনিক ভিত তৈরি করেন তিনি।

এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ‘পরিবর্তনের’ ডাক দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই ‘পরিবর্তন’ শব্দটার সঙ্গে অবশ্য শুভেন্দুর যোগ আজকের নয়। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের ইতি টেনে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল মমতার তৃণমূল সরকার, সেই পরিবর্তনেও শুভেন্দু অধিকারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

বামফ্রন্ট সরকারের পতনের সিঁড়ি তৈরি হয়েছিল যে দুটি ঘটনার মাধ্যমে, তারই অন্যতম ছিল নন্দীগ্রামে রাসায়নিক শিল্প তালুক গড়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক কৃষক বিক্ষোভ। ওই কৃষক বিক্ষোভ গড়ে তোলার পেছনে শুভেন্দুর তৃণমূল স্তরে সাংগঠনিক কৃতিত্ব ছিল বলে অনেকে মনে করেন।

তখন অবশ্য শুভেন্দু এখনকার মতো নন্দীগ্রামের বিধায়ক ছিলেন না। সেই সময়ে তিনি ছিলেন পাশের এলাকা কাঁথি দক্ষিণ আসনের বিধায়ক।

তিনি অবশ্য নন্দীগ্রাম কৃষক আন্দোলনের ‘মুখ’ ছিলেন না তখন, সেটা ছিলেন তার নেত্রী, সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা, যাকে হটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু।

কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি: বঙ্গোপসাগরের তীরের জেলা পূর্ব মেদিনীপুরের মানুষ শুভেন্দু। তার বাড়ি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র দীঘার কাছে, কাঁথি শহরে ১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর জন্ম তার। তার পরিবার আদ্যন্ত রাজনৈতিক—কংগ্রেস ঘরানায় বড়ো হয়েছেন তিনি। তার বাবা শিশির অধিকারী মেদিনীপুর জেলা দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার অনেক আগে থেকেই সেখানকার অতি পরিচিত কংগ্রেস নেতা ছিলেন।

তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে ওঠার আগে যে দুজনকে মেদিনীপুরের কংগ্রেস নেতা বলে রাজনৈতিক মহল জানত, তাদেরই একজন ছিলেন শিশির অধিকারী। পরে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন মমতা আলাদা দল করার পরেই।

তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন শিশির অধিকারী।

বাবার পথ ধরেই শুভেন্দুও একসময়ে কংগ্রেসেই ছিলেন। ছাত্র রাজনীতি দিয়ে শুরু করে পরে তার নিজের শহর কাঁথি পৌরসভার কংগ্রেসের ওয়ার্ড কাউন্সিলারও ছিলেন তিনি।

নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সংগঠক: বাবা শিশির অধিকারীর সঙ্গেই তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন শুভেন্দু। ২০০৬ সালে তিনি কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হন। কাঁথি পৌরসভার চেয়ারম্যানের পদও সামলেছেন।

ওই ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই শুভেন্দুর বিধানসভা এলকাসংলগ্ন নন্দীগ্রামে রাসায়নিক শিল্প হাব গড়ার পরিকল্পনা করেছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে সেখানকার কৃষকরা আন্দোলন শুরু করেন। তৃণমূল স্তরে সেই আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন শুভেন্দুই, যদিও দলনেত্রী হিসেবে মমতা ছিলেন আন্দোলনের কান্ডারি। তখন থেকেই শুভেন্দু হয়ে ওঠেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের সংগঠন গড়ে তোলার অন্যতম রূপকার। কয়েক বছর পর, ২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে সেই সময়ের সিপিআইএমের হেভিওয়েট নেতা লক্ষণ শেঠকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হন শুভেন্দু। তার বাবা শিশির অধিকারীও সে বছর এমপি হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন।

পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস দলে সাংগঠনিক গুরুত্ব বেড়েই চলেছিল শুভেন্দুর। তাকে রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলীয় ‘জঙ্গলমহল’ এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যে এলাকায় তখন মাওবাদীদের প্রবল প্রতিপত্তি।প্রায় সাড়ে তিন দশক ক্ষমতায় থাকার পর যে বছর বামফ্রন্ট সরকারকে হঠিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের ক্ষমতা দখল করল, সেই ২০১১-এর নির্বাচনে অবশ্য প্রার্থী হননি শুভেন্দু। তিনি তখনও এমপি।

বিধানসভায় শুভেন্দু ফিরে আসেন ২০১৬ সালে। জয়লাভের পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতার দ্বিতীয় দফায় পরিবহনমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ততদিনে দলীয় সংগঠনেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন শুভেন্দু। তাকে দলের যুব সংগঠনের নেতা করেছিলেন মমতা।

কিন্তু একই সময়ে তার ভাইয়ের ছেলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘যুব’ নামে একটি সংগঠন গড়ে দেন মমতা। একটি দলের দুটি যুব সংগঠন গড়ে তিনি তখন বার্তা দিয়েছিলেন যে, অভিষেককেই তিনি রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। ‘যুব’ নামে সেই সংগঠনের সূচনা এবং অভিষেককে প্রতিষ্ঠা করার জনসভাটি হয়েছিল কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানেই। ঘটনাচক্রে শনিবার ওই ময়দানেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু। সেই সময় থেকেই শুভেন্দুর সঙ্গে মমতার দূরত্ব বাড়তে শুরু করে।

বিজেপিতে যোগদান: সেই বিরোধের জেরে ২০২০ সালে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু। গেরুয়া শিবিরে যোগ দেওয়ার পরপরই ২০২১ সালে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে মমতার বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান তিনি। পরাজিতও করেন। নির্বাচনী ফল মানতে চাননি মমতা, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালত অবধি গড়ায়। সেবার ক্ষমতায় না এলেও বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন তিনি।

বিধানসভা এবং রাজপথ—দুই জায়গাতেই আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা গেছে শুভেন্দু অধিকারীকে। তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ইস্যু—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিরোধীদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

তৃণমূল কংগ্রেস, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেকের বিরুদ্ধে যেমন অতি আক্রমণাত্মক থেকেছেন তিনি, তেমনই বারে বারে অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতেও তিনি অতি সরব হয়েছেন বারে বারেই। এবারও মমতাকে হারিয়েছেন। বিজেপির ‘রাজ্যমুখ’ হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রুহুল আমীন রাজুর গল্প : লাশ কাটা ঘর   

গুলিতে নিহত বাংলাদেশির মরদেহ হস্তান্তর করল বিএসএফ

তিন পজিশন নিয়ে স্কালোনির সংশয়, কেমন হবে আর্জেন্টিনার একাদশ

তাবলীগ জামাতের বয়ান নিয়ে দুপক্ষের তুমুল সংঘর্ষ

আয়াতুল্লাহ খামেনির দাফনের দিনক্ষণ জানাল ইরান 

বাংলাদেশ-জাপান ক্যারিয়ার সেন্টারের যাত্রা শুরু

দেলোয়ার হোসাইন খানের কবিতা : দীপাঞ্জলী

জনগণের রায় না মানলে সেটি জনগণের সরকার হতে পারে না : জামায়াত আমির

প্রথম ম্যাচেই নিয়ম মানেনি মার্কিন ব্রডকাস্টার

বাজেট উপস্থাপনের পর নিত্যপণ্যের দাম বাড়েনি : প্রধানমন্ত্রী

১০

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দ্রুত ৬ লেনে উন্নীত করা হবে : প্রধানমন্ত্রী

১১

সরকারি ফান্ড কীভাবে অপচয় হচ্ছে, জানালেন প্রতিমন্ত্রী নুর

১২

রোববার হচ্ছে না ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি

১৩

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ডাকছে ছোট্ট ওকেয়া, ‘মাকে এনে দাও’

১৪

মেধাবী প্রকৌশলীদের দেশের কাজে লাগানোর আহ্বান আইনমন্ত্রীর

১৫

সিলেটকে পরিবেশবান্ধব সবুজ নগরী গড়ে তুলব : সিসিক প্রশাসক

১৬

চট্টগ্রামে ভুল চিকিৎসায় নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ

১৭

আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে : শিক্ষামন্ত্রী

১৮

গুণীজনদের জীবদ্দশায় সম্মান জানালে সমাজসেবায় উৎসাহ বাড়বে : মৎস্য ও কৃষিমন্ত্রী

১৯

বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে ছাত্রদলের আনন্দ মিছিল

২০
X