

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব এখন বড় সংকটে। চলতি সপ্তাহে এমপিদের বিদ্রোহ ও মন্ত্রীদের পদত্যাগ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্ব। তবে এখনো নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে এ জটিল সমস্যার কোনো সমাধানের ইঙ্গিত আসেনি। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র লেবার নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম একটি উপনির্বাচনের মাধ্যমে ওই পদে যেতে চান। ওই আসনের লেবার এমপি এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি চান বার্নহ্যাম স্টারমারের জায়গায় আসুক।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংও পদত্যাগ করেছেন। তিনি বলেছেন, দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার। এখন সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনারও সম্ভাব্য নেতৃত্ব দৌড়ে নামার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার কর-সংক্রান্ত তদন্ত শেষ হওয়ার পর তিনি এ বিষয়ে দরজা খোলা রেখেছেন। তবে এত কিছুর পরও আনুষ্ঠানিক কোনো নেতৃত্ব নির্বাচন এখনও শুরু হয়নি। ফলে পরিস্থিতি এখন বেশ জটিল ও অনিশ্চিত। বিবিসির এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামনে কী হতে পারে, তা নিয়ে পাঁচটি সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে আলোচনা চলছে।
স্টারমার নিজেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন
এই সপ্তাহে যেভাবে তার ওপর পদত্যাগের চাপ বেড়েছে, তাতে স্টারমার হয়তো একসময় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে, আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে এখনই এমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। লেবার পার্টির অনেক এমপি চাইছেন, স্টারমার যেন অন্তত বিদায়ের একটি সময়সূচি ঘোষণা করেন। এতে তিনি সম্মানজনক ও নিয়ন্ত্রিতভাবে সরে দাঁড়াতে পারবেন।
কিন্তু স্টারমার বারবার বলেছেন, তিনি ‘পালিয়ে যাবেন না।’ মন্ত্রিসভা এবং জনসভায় তিনি স্পষ্ট করেছেন, তিনি লড়াই চালিয়ে যেতে চান। এর মানে হলো, কেউ যদি তাকে চ্যালেঞ্জও করে, তাহলে তিনি সহজে নেতৃত্ব ছাড়বেন না।
বার্নহ্যামকে ছাড়া নেতৃত্ব নির্বাচন শুরু করা
তাত্ত্বিকভাবে লেবার পার্টির যে কোনো এমপি পর্যাপ্ত সমর্থন পেলে স্টারমারের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। এ জন্য তার লেবার পার্লামেন্টারি পার্টির ২০ শতাংশ এমপির সমর্থন দরকার হবে। বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় ৮১ জন।
অনেকেই মনে করেছিলেন, ওয়েস স্ট্রিটিং হয়তো এই চ্যালেঞ্জের নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু পদত্যাগপত্রে তিনি সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা না বলে ‘পরবর্তী পথ নিয়ে আলোচনা’র কথা বলেছেন। তার ঘনিষ্ঠদের দাবি, তার কাছে প্রয়োজনীয় সমর্থন ছিল। কিন্তু তিনি তাৎক্ষণিক নেতৃত্বের লড়াই না করে স্টারমারের ওপর চাপ বাড়াতে চেয়েছিলেন, যেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই সরে দাঁড়ান।
অন্যদিকে স্টারমারের সমর্থকরা বলছেন, স্ট্রিটিংয়ের কাছে আসলে পর্যাপ্ত সমর্থন ছিল না। একজন সমর্থক দাবি করেছেন, তার পক্ষে মাত্র ৪৪ জন এমপি নিশ্চিতভাবে ছিলেন।
বার্নহ্যাম উপনির্বাচনে জিতে স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন
এই সম্ভাবনা বাস্তব হতে গেলে অনেক কিছু একসঙ্গে ঘটতে হবে। প্রথমত, অ্যান্ডি বার্নহ্যামের জয় নিশ্চিত নয়। মেকারফিল্ড আসনে রিফর্ম ইউকে জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনেও দলটি সেখানে শক্ত অবস্থান দেখিয়েছিল।
বার্নহ্যাম বর্তমানে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র। তিনি উপনির্বাচনে জিতলেই কেবল এমপি হতে পারবেন এবং তখনই লেবার নেতৃত্বের দৌড়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে যদি তিনি জিতে যান, তাহলে তিনি দাবি করতে পারবেন, তিনি আবার লেবার পার্টিকে জনপ্রিয় করতে সক্ষম। তিনি বলতে পারবেন, তিনি রিফর্ম ইউকের উত্থান ঠেকাতে পারবেন এবং ভবিষ্যৎ সাধারণ নির্বাচনে দলকে জেতাতে পারবেন।
এর বিপরীতে স্টারমারের রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে লেবারের অনেক পুরোনো শক্ত ঘাঁটিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বার্নহ্যাম যদি সংসদে ফিরে আসেন, তাহলে তিনি সহজেই পর্যাপ্ত এমপির সমর্থন জোগাড় করে নেতৃত্ব নির্বাচন শুরু করতে পারেন। তখন স্টারমারের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে তিনি শক্তিশালী অবস্থানে থাকবেন। কারণ তিনি মাঠের নির্বাচনে জয়ের প্রমাণ নিয়ে আসবেন। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বার্নহ্যামের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথও খুলে যেতে পারে।
বার্নহ্যাম জিতলে স্টারমার সরে দাঁড়াতে পারেন
মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে বার্নহ্যামের জয় স্টারমারের জন্য বড় বার্তা হবে। লেবার সদস্যদের বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, সরাসরি নেতৃত্ব প্রতিযোগিতায় বার্নহ্যামের কাছে স্টারমার হেরে যেতে পারেন। তাই সম্ভাবনা আছে যে, স্টারমার বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ার আগেই পদত্যাগ করতে পারেন। যদি এমন হয়, তাহলে হয়তো বার্নহ্যামকে সরাসরি নতুন নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হবে। অথবা নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা শুরু হবে। সেই প্রতিযোগিতায় ওয়েস স্ট্রিটিং, অ্যাঞ্জেলা রেইনার এবং আরও কয়েকজন প্রার্থী অংশ নিতে পারেন। এতে লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব পুরোপুরি নতুন পথে যেতে পারে।
বার্নহ্যাম হারলে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে
এটাও খুব সম্ভব যে, বার্নহ্যাম উপনির্বাচনে হেরে যেতে পারেন। রিফর্ম ইউকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই আসনে দ্বিতীয় হয়েছিল। এ ছাড়া সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনেও দলটি উইগান কাউন্সিলে ২৪টি আসন জিতেছে। এ কারণে নাইজেল ফারাজের দল এখন বেশ আত্মবিশ্বাসী। যদি বার্নহ্যাম হেরে যান, তাহলে লেবার পার্টির নেতৃত্ব সংকট আরও জটিল হয়ে পড়বে।
সে ক্ষেত্রে স্টারমারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টিকে থাকার সময় আরও বাড়বে। কারণ তখন বার্নহ্যামের নেতৃত্বে কোনো শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ আসবে না। তখন হয়তো অন্য কোনো এমপি বা মন্ত্রিসভার সদস্যকে সামনে এসে স্টারমারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে হবে। কিন্তু কে সেই ভূমিকা নেবেন, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
স্টারমারের নেতৃত্ব দুর্বল হলেও তার বিকল্প এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, ওয়েস স্ট্রিটিং ও অ্যাঞ্জেলা রেইনার—সবাই সম্ভাব্য নেতা হিসেবে আলোচনায় আছেন। তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক ঘটনাই ঠিক করবে, স্টারমার টিকে থাকবেন নাকি লেবার পার্টি নতুন নেতার দিকে এগোবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রিফর্ম ইউকের উত্থান এখন ব্রিটিশ রাজনীতিকে নতুনভাবে বদলে দিচ্ছে। আর সেই চাপই লেবার পার্টির ভেতরের সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।