রেজওয়ান উর রহমান
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৪, ০২:৫৩ এএম
আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৪, ০৮:০২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

গণঅভ্যুত্থান: প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

গণঅভ্যুত্থান: প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

বাংলাদেশের বিজয়! বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। শুধু তাই নয়, জনমানুষের ক্ষোভ ও আক্রোশের মুখে তিনি দেশ থেকে পালিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে কেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এটা ছিল এক বিরল দৃষ্টান্ত। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর এটাই ছিল এ দেশের ইতিহাসে সব থেকে গৌরবময় ঘটনা। সব থেকে প্রথমে যে নামটি মনে পড়ছে—বীরসন্তান আবু সাঈদ। আসলেই তিনি একজন মহাকাব্যের নায়ক, একজন বীরসেনা। ইতিহাসে অনেক যোদ্ধা দেখেছি; কিন্তু আবু সাঈদের মতো এমন অসীম সাহসী, নির্ভীক মানুষ খুব কম দেখা মেলে, যিনি স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন শত্রুর বন্দুকের সামনে। সেদিনই বাংলাদেশের এই গৌরবগাথা গণঅভ্যুত্থানের সূচনা। এ প্রসঙ্গে একটি কথা মনে পড়ছে— আমেরিকার রেভল্যুশনারি ওয়ারের ওপর নির্মিত মুভি প্যাট্রিয়টে ব্রিটিশদের দ্বারা নির্যাতিত বেনজামিন মার্টিনের ছেলে গ্যাব্রিয়েল প্রতিবাদ করেছিল কারণ তার ছোট ভাইকে ব্রিটিশ কর্নেল টেভিংটন হত্যা করেছিল। ঘটনাচক্রে গ্যাব্রিয়েল তার বাবার অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধে যোগ দেয় ও শহীদ হয়। এই গ্যাব্রিয়েল হলো সেই ঘটনার আবু সাঈদ। কারণ, আমরা যেমন দেখেছি আবু সাঈদের মৃত্যুর পর কীভাবে পুরো দেশের ছাত্র-জনতাসহ আপামর মানুষ নেমে গিয়েছিল, ঠিক তেমনি গ্যাব্রিয়েলের মৃত্যুর পর তার বাবা একটি মার্টিন আঞ্চলিক একটি মুক্তিবাহিনী গঠন করেন এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করেন দেশ ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীন করার জন্য। আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর আমরা তদ্রূপ আন্দোলন দেখেছি।

আমরা দেখলাম একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলো। তার প্রধান হলেন বিশ্বনন্দিত নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমারও অনেক প্রত্যাশা এ সরকারের কাছে। আমাদের প্রাপ্তি আমরা অনেক তাজা রক্ত দিয়ে এই দ্বিতীয় স্বাধীনতা পেয়েছি, এখন প্রত্যাশা অনেক। আমাদের বাংলাদেশ আমাদেরই গড়তে হবে, যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, মনে হলো এ দেশের তরুণরা সেটাই আরেকবার মনে করিয়ে দিল। একেই মনে হয় বলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি!

এ কথা অনস্বীকার্য যে, বিপ্লবের মধ্য দিয়েই গণঅভ্যুত্থান জন্ম নেয়। সুতরাং বর্তমান সরকার একটি বিপ্লবী অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারের প্রধান কাজ হলো, সমাজে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন; অর্থাৎ গণঅভ্যুত্থানের মূল যে মন্ত্র—একটি বৈষম্যবিরোধী সমাজব্যবস্থা কায়েম করা, সমাজের সব স্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কাজটা অনেক কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। এ দেশের সংগ্রামী ছাত্র-জনতা এক দানবীয় স্বৈরশাসকের পতন ঘটিয়েছে, সুতরাং সদিচ্ছা থাকলে রাষ্ট্র সংস্কার এখন সময়ের ব্যাপার। এটি সময়ের দাবিও বটে!

কিন্তু আমাদের সজাগ থাকতে হবে প্রতিবিপ্লব যেন না ঘটে, কারণ পরাজিত শিবির চাইবেই যেন এই গণঅভ্যুত্থান কোনো দিনও সফল হতে না পারে। বাংলাদেশ যেন কখনো মাথা উঁচু করে না দাঁড়াতে পারে। বিপ্লবের অন্য পিঠেই থাকে প্রতিবিপ্লব—নিউটনের তৃতীয় সূত্রের মতো। যারা প্রতিবিপ্লব করে, তারা সমসময়ই আত্মঘাতী হয়, কেননা তাদের আর হারানোর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিবিপ্লব দেখি; যেমন তিউনিশিয়ার বিপ্লব ও তারপর প্রতিবিপ্লব। শেষ পর্যন্ত সেই বিপ্লবটি সফল হয়নি। তেমনি রুশ বিপ্লব। তাহলে সমাধান কী? এই বিপ্লবী সরকারকে দুটি জিনিসের ওপর খুব সতর্কভাবে নজর দিতে হবে—একটি হলো জনতার মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা, আরেকটি হলো সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা যেন গুজব না ছড়ায়। এ দুটি কাজ অবিলম্বে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করতেই হবে।

বাংলাদেশের মানুষ অনেক রক্ত দিয়েছে। অনেক মায়ের বুক খালি করে সন্তানরা শহীদ হয়েছেন। এরকম সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে এমন নিরস্ত্র গণঅভ্যুত্থান। কোথাও নেই! যে জাতির সন্তানরা হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে ও বলছে—স্বৈরাচারীর পতন হয়েছে? আমাদের কি মুক্তি হয়েছে? সে জাতি কখনো পরাজিত হতে পারে না। আমরা এই স্বাধীনতা ধরে রাখবই। শুধু তিনটি মূলনীতি দরকার; একটি হলো—এক জাতি হিসেবে; বাংলাদেশি হিসেবে সবাইকে এক হতে হবে; দ্বিতীয়টি হলো—বৈষম্যবিরোধী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা আর তৃতীয়টি হলো— প্রতিষ্ঠানগুলোকে সার্বিকভাবে দলীয়করণ থেকে নিস্তার দেওয়া, প্রয়োজনে সংবিধান সংস্কার করে হলেও।

প্রসঙ্গক্রমে এ অংশে এসে যায়, সংবিধানের মূল যে অংশগুলো একজন শাসককে স্বৈরাচার করে তোলে, তার পরিবর্তন, কিংবা একটি নতুন সংবিধান। সেটি অনেক ভাবেই করা যায়। আমি আইনজ্ঞ নই, কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে আমিও দাবি করছি—গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার নিরিখে একটি সংবিধান।

একজন নাগরিক হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে কিছু উল্লেখযোগ্য ও সময়োপযোগী প্রস্তাবনা—

l অন্তর্বর্তী সরকারের এখনই একটি গণভোটের আয়োজন করা এবং তার মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সব ধরনের সংস্কার বাস্তবায়ন করা।

l যত দ্রুত সম্ভব এই সংবিধান বাতিল করে ছয়-আট মাসের মধ্যে একটি গণতান্ত্রিক, মানবাধিকার সম্মত, রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্যমূলক একটি সংবিধান প্রণয়ন। সেজন্য একটি গণপরিষদ (Constituent Assembly) আগামী এক মাস কিংবা দ্রুততম সময়ে গঠন।

l সরকারের মেয়াদ থাকবে চার বছর। নির্বাচন কমিশনসহ নির্বাচনকালীন সময়ে রাষ্ট্রের আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে।

l আর কখনো যেন কোনো শাসক দানব হয়ে উঠতে না পারে, সাংবিধানিকভাবে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

l দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা প্রণয়ন। দুবারের বেশি একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারবেন না।

l রাষ্ট্রের সব স্তরে বিকেন্দ্রীকরণ যেন কোনো ধরনের বৈষম্যের আবির্ভাব না ঘটে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি লেজুড়বৃত্তি না করা হয়, সেজন্য নতুন করে আইনের সংস্কার খুব জরুরি।

l বিচার বিভাগ, প্রশাসন থেকে শুরু করে সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠান যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সেভাবে আইনের সংস্কার।

বাংলাদেশের নিরীহ, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা তাদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে এক দানবের সঙ্গে যুদ্ধ করে সুমহান বিজয় অর্জন করেছে। সেই দানবের ত্রাস থেকে শিশুরাও রক্ষা পায়নি। এই মহান ত্যাগ কখনোই বিফলে যেতে দেওয়া হবে না আর একটিও প্রাণ যেন এভাবে অকাতরে ঝরে না যায়, তার জন্য যত ধরনের সংস্কার আবশ্যক, তাই করতে হবে।

সবশেষে বিদ্রোহী কবি, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ থেকে একটি পঙক্তি উল্লেখ করতে চাই—আমি চির-বিদ্রোহী বীর—বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কালবেলায় সংবাদ প্রকাশ, ফুটো পাইপ মেরামতে নেমেছে ওয়াসা

একটি গোষ্ঠী নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে : মির্জা ফখরুল

আল্লাহ ছাড়া ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারোর নেই : সালাহউদ্দিন

নুরের ওপর হামলায় কোন দল কী প্রতিক্রিয়া জানাল

বর্ণাঢ্য আয়োজনে জবির লোকপ্রশাসন বিভাগের যুগপূর্তি উদযাপিত

ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির ২০টি থানায় নতুন আহ্বায়ক কমিটি 

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আরও ৩৬৭ জন

গণঅধিকার পরিষদের বিক্ষোভ মিছিল, পুলিশের লাঠিচার্জে নেতা আহত

পাকিস্তানি পুলিশকে গুলি করে হত্যা

সন্ধ্যার পর জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ

১০

চাপে নেদারল্যান্ডস, দারুণ বোলিং বাংলাদেশের

১১

ইংল্যান্ডের যে ক্রিকেটারের সঙ্গে দেখা করতে চান তামিম

১২

জিএম কাদেরের বাসভবনের সামনে কুশপুত্তলিকা দাহ

১৩

উত্তাল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ, প্রাদেশিক পার্লামেন্টে আগুন

১৪

‘মন্ত্রীদের চেয়ারটা নির্লজ্জদের জন্যই’ নুর ইস্যুতে আসিফ আকবর

১৫

গণঅধিকার পরিষদের সিএমপি কার্যালয় ঘেরাও

১৬

জাতীয় পার্টিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিষিদ্ধের দাবি রাশেদের

১৭

কাজের সুযোগ দিচ্ছে ওয়ার্ল্ড ভিশন, বেতন ৮০ হাজার

১৮

‘চিরকাল বন্ধু বা শত্রু থাকে না, স্থায়ী শুধু স্বার্থ’: ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী

১৯

হাসপাতালে নুর, সমালোচনার মুখে জয়

২০
X