দুর্গাপূজা ও লক্ষ্মীপূজার রেশ না কাটতেই দোরগোড়ায় হাজির জমজমাট পূজা-পার্বণের ছয় দিন। ধনতেরাস দিয়ে শুরু হয়ে ভ্রাতৃ দ্বিতীয়া দিয়ে শেষ। কার্তিক মাসে বিশ্বজুড়ে সনাতনী ভক্তরা ভগবৎচরণে শ্রদ্ধা নিবেদন ও আশীর্বাদ প্রাপ্তির মাধ্যমে এ সুযোগ পেয়ে থাকেন। ধনতেরাস দিয়ে এই ধর্মীয় উৎসবমালা শুরু হচ্ছে আগামী মঙ্গলবার থেকে। লাগাতার এই পূজা-পার্বণের তথ্য সমন্বিত আকারে নিচে উপস্থাপন করা হলো।
ধনতেরাস শব্দের উৎপত্তি ধন ও তেরাস থেকে। ধন অর্থ সম্পদ এবং তেরাস অর্থ কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশ দিবস। সনাতনী সংস্কৃতিতে স্বাস্থ্যকে সর্বদা সম্পদের চেয়ে উচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে। এই উক্তিটিতে তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, ‘প্রথম সুখ একটি সুস্থ শরীর, দ্বিতীয় সুখ ঘরে মায়া’। দীপাবলির শুভ উপলক্ষে ধনতেরাসকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শাস্ত্র অনুসারে, কার্তিক মাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশীর দিনে সমুদ্র মন্থনের সময় ভগবান ধন্বন্তরী এক হাতে অমৃত পাত্র ও অন্য হাতে আয়ুর্বেদের পবিত্র পাঠ নিয়ে আবির্ভূত হন। ধন্বন্তরী হলেন ভগবান বিষ্ণুর একজন অবতার, যিনি পৃথিবীতে চিকিৎসাবিজ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিবেদিত ছিলেন। ধনতেরাসের উৎসবটি তার ঐশ্বরিক চেহারাকে স্মরণ করার জন্য উদযাপিত হয়, যা আজও স্বাস্থ্য এবং সমৃদ্ধির প্রতীক।
ধনতেরাস উপলক্ষে যা কেনা শুভ:
পিতল, সোনা এবং রুপার জিনিস: ভগবান ধন্বন্তরীর কাছে পিতলের ধাতু প্রিয় বলে মনে করা হয়, তাই এই দিনে পিতলের বাসন কেনা শুভ। এ ছাড়া সোনা-রুপার গয়না ও বাসনপত্র ক্রয় করলে ঘরে সমৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য আসে।
ঝাড়ু: ঝাড়ুকে লক্ষ্মীর প্রতীক মনে করা হয়, তাই ধনতেরাসের দিন ঝাড়ু কেনাও শুভ বলে মনে করা হয়। বাড়িতে একটি নতুন ঝাড়ু আনার ফলে দেবী লক্ষ্মীর অধিবাস হয় বলে বিশ্বাস করা হয়, যা বাড়িতে আর্থিক সমৃদ্ধি এবং সম্পদ নিয়ে আসে।
তবে ধনতেরাসে নিচে বর্ণিত জিনিসপত্র কেনা অশুভ মনে করা হয়:
লোহার সামগ্রী: লোহাকে শনিদেবের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং ধনতেরাসে এটি কেনা অশুভ বলে মনে করা হয়। তাই এই দিনে লোহার তৈরি পাত্র বা অন্যান্য জিনিস কেনা থেকে বিরত থাকা উচিত।
চিনি বা মাটির তৈরি শোপিস: এই দিনে চিনি বা মাটির তৈরি শোপিস বা সাজসজ্জার জিনিস কেনাও শুভ বলে মনে করা হয় না। বিশ্বাস করা হয় যে, এতে দেবী লক্ষ্মী অসন্তুষ্ট হতে পারেন, যা বাড়িতে আর্থিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ভূত চতুর্দশী: ৩০ অক্টোবর ভূত চতুর্দশী। পরলোকগত ১৪ পুরুষের উদ্দেশ্যে আলোকবর্তিকা নিবেদন মূল উদ্দেশ্য। এদিনটি বাড়িতে সন্ধ্যায় ১৪টি প্রদীপ জ্বেলে, ১৪ ধরনের শাক খেয়ে পালন করা হয়। ভূত চতুর্দশীর তিথি ৩০ অক্টোবর দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে শুরু হচ্ছে। আর সেই তিথি শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ২২ মিনিটে। সেই তিথি অনুযায়ী, বহু বাড়িতেই ৩০ অক্টোবর দুপুরেই চৌদ্দশাক খাওয়ার পর্ব শুরু হতে চলেছে। এই ১৪ প্রকারের শাক হলো– ওল, কেও, বেতো, কালকাসুন্দা, নিম, সরষে শালিঞ্চা বা শাঞ্চে, জয়ন্তী, গুলঞ্চ, পলতা, ঘেঁটু বা ভাট, হিলঞ্চে শুষনি, শেলু। ঋতু পরিবর্তনের সময়ে এই শাক সবার শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এদিন সন্ধ্যায় দেওয়া হবে ১৪ প্রদীপ।
কালীপূজা ও দীপাবলি: দীপাবলির রাতে অনুষ্ঠিত হয় শ্যামা কালীপূজা। ‘দিওয়ালী’ নামেও পরিচিত দীপাবলি। অমাবস্যা রজনীর সমস্ত অন্ধকার দূর করে পৃথিবীকে আলোকিত করার অভিপ্রায়ে এই প্রদীপ প্রজ্বালন। পৃথিবীর সব অন্ধকারের অমানিশা দূর করতেই এই আয়োজন। অশুভ শক্তির হাত থেকে প্রতিনিয়ত পৃথিবীকে রক্ষা করতেই এই আলোকিত করা। অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করার প্রয়াস মানুষ সেই আদিকাল থেকেই করে আসছে।
দীপান্বিতা পার্বণ শ্রাদ্ধ: কার্তিক মাসের শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে ব্রহ্মপুরাণের উক্তি, ‘ন কর্তিক সমো মাসো ন কৃতেন সমং-যুগম্। ন বেদং সদৃশং শাস্ত্রং ন তীর্থং গঙ্গয়া সমম্।’ কার্তিক মাসে দীপদানের মতো পুণ্য আর নেই। এই বিশ্বাসে ভক্তরা বিশেষভাবে মা-বোনেরা মন্দিরে, তুলসীতলায় ও জলাশয়গুলোয় দীপ প্রদান করে থাকেন। শাস্ত্রে আছে কার্তিক মাস হমো মৃতের মাস। মৃত পিতৃ-পুরুষগণের গতিপথ আলোকিত করার জন্য ‘আকাশ প্রদীপ’ দেওয়ার রীতি আজও প্রতিপালিত হয়ে চলেছে। বিশেষত দীপান্বিতার দিনে। শাস্ত্র বলছে, এই আকাশ প্রদীপ দর্শন করলে গৃহস্থের সর্ববিধ মঙ্গল হয় ও সমস্ত পাপ
অন্তর্হিত হয়।
গোবর্ধন পূজা: শ্রীকৃষ্ণ ব্রজবাসীদের বললেন, আর ইন্দ্রের পূজার কোনো প্রয়োজন নেই। তাতে ইন্দ্র রেগে গিয়ে তুমুল বৃষ্টিতে ভাসিয়ে দিলেন ব্রজভূমি। তখন গোবর্ধন পর্বতকে আঙুলে তুলে শ্রীকৃষ্ণ ইন্দ্রের ক্রোধ থেকে ব্রজবাসী এবং সেই অঞ্চলের পশুপাখিদের রক্ষা করেছিলেন। গোবর্ধন পূজা অন্নকূট নামেও পরিচিত। এই দিন মহিলারা তাদের বাড়ির আঙিনায় গোবর্ধন পর্বতের আকৃতি তৈরি করে পূজা করেন। গোবর্ধন পূজার দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে নিতে হয়। অতঃপর ধূপ-প্রদীপ প্রভৃতি দিয়ে যথাযথভাবে পূজা করা রীতি। শ্রীকৃষ্ণকে দুধ দিয়ে স্নান করিয়ে তার পূজা করতে হয়। এরপর শ্রীকৃষ্ণকে ৫৬ ভোগ দিয়ে অন্নকূট নিবেদন করতে হয়।
ভ্রাতৃ দ্বিতীয়া: পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে, ভাইফোঁটার দিন যমরাজ তার বোন যমুনার বাড়িতে গিয়েছিলেন, তারপর থেকে ভাইফোঁটা বা ভ্রাতৃ দ্বিতীয়ার প্রথা শুরু হয়। সূর্যের পুত্র যম ও যমী ছিলেন ভাই-বোন। যমুনা তাকে কয়েক বার ডাকার পর একদিন যমরাজ যমুনার বাড়িতে পৌঁছান। এ উপলক্ষে যমুনা যমরাজকে খাবার পরিবেশন করেন এবং তাকে ফোঁটা দেন এবং তার সুখী জীবন কামনা করেন। ‘ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা, যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা। এটা তিনবার উচ্চারণ করে বোন ভাইকে চন্দনের ফোঁটা দেন এবং মিষ্টিমুখ করান। ভাইকে উপহার দেওয়া এবং ভোজে আপ্যায়নও বোন করে থাকেন। ভাই বোনকে এই উপলক্ষে উপহার দেয়।
লেখক: ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির কমিটির উপদেষ্টা পুরোহিত, সম্পাদক: জয় বাবা লোকনাথ পঞ্জিকা এবং অতিরিক্ত সচিব (অব.) বলতে হয়। বোন বা দিদিরা বাঁ হাতের কড়ে আঙুল দিয়ে ভাইয়ের কপালে টিকা দেয়।