বায়ুদূষণ যেন একটি স্থায়ী বিষয় হয়ে গেছে। কোনোমতেই এটা রোধ করা যাচ্ছে না। টানা তিন দিন ধরে বায়ুদূষণের শীর্ষে রাজধানী ঢাকা। সর্বোচ্চ মাত্রার দূষণ এ শহরের বাতাসে। তবে শুধু রাজধানী ঢাকা কিংবা বাংলাদেশ নয়, বায়ুদূষণ বিশ্ববাসীর জন্য এক বড় সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বায়ুদূষণের মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কারণে। অস্বাভাবিকভাবে বায়ুদূষণ বৃদ্ধিতে মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীর মৃত্যুঝুঁকি বেড়েই চলেছে। মাঝে বর্ষাকালে কিছুদিন ঢাকার বাতাসের মানের উন্নতি হলেও আবারও বায়ুদূষণ বাড়ছে। বিগত সরকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। মানুষ ভুগছে। নতুন সরকারকে এ বিষয়ে জোর দেওয়ার তাগিদ।
শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন সরকারি সব প্রতিষ্ঠান ও স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল। এমন দিনেও নিঃশ্বাসে বিষাক্ত বায়ু নিয়েছেন নগরবাসী। বিশ্বের ১০০ শহরের মধ্যে ঢাকা বুধ ও বৃহস্পতিবারও বায়ুদূষণে ছিল শীর্ষে। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে বিশ্বের অন্য দেশগুলো জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করে থাকে, বন্ধ করে দেওয়া হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বায়ুদূষণের কারণে কোনো সতর্কতা জারি করা হয়নি। রাজধানীর বায়ুদূষণের প্রধান উৎস যানবাহন ও কলকারখানার দূষিত ধোঁয়া আর ইটভাটা। এসব উৎস বন্ধে সরকারি উদ্যোগগুলো অকার্যকর বলেই মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের পর্যবেক্ষণে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল ঢাকা। আইকিউএয়ার বলছে, শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকার বাতাসের একিউআই ছিল ২৬৪। বায়ুমানের এ পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’। ফলে ঢাকা তখন ছিল দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেছেন, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, ফিটনেসবিহীন পরিবহন আর ইটভাটা ঢাকার বাতাস দূষিত করছে। ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পরিবহন, সেগুলো খুব একটা ওয়েল মেইনটেন্যান্স করা হয় না। ওয়েল মেইনটেইন না হলে এখান থেকে দূষণের বড় একটা সোর্স থাকবে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে সারা বছর বিভিন্ন এলাকাজুড়ে রাস্তাও কাটাকাটি চলতে থাকে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার পাশাপাশি নির্মাণকাজ তদারকি করা, সেখানে নিয়মিত পানি দেওয়া আর ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো সরানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ঢাকার বায়ুদূষণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসিব আহমেদ দেখেছেন, যেসব কারণে বায়ুদূষণ হচ্ছে সেগুলোর কার্যক্রম কম থাকায় করোনা মহামারির সময় ঢাকার বাতাস তুলনামূলক ভালো ছিল। তিনি বলেছেন, এরপর আবার আগের জায়গায় চলে আসছে। দিন দিন দূষণের মাত্রা বাড়ছে। এখন আগের চেয়ে যানবাহনের পরিমাণ বেশি, এটা বেশি ভূমিকা রাখছে বায়ুদূষণে। বর্ষাকালেও ঢাকার বাতাস অস্বাস্থ্যকরই থাকে। যদিও দূষণের মাত্রাটা তখন কম থাকে। শীতকালে সেটা বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে যায়। যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, এটা দেখা যাচ্ছে না—এটাই বড় সমস্যা।
এ কথা মিথ্যে নয় যে, সারা দেশেই বায়ুদূষণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীসহ সারা দেশের বায়ুদূষণ রোধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।