কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৯:০৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

চলনবিল বাঁচলে কার লাভ, কার ক্ষতি

মোনছেফা তৃপ্তি
চলনবিল বাঁচলে কার লাভ, কার ক্ষতি

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা থেকে মাত্র ২০ মিনিট দূরের জেরাবম্বেরা স্পোর্টস কমপ্লেক্সে ফুটবল ম্যাচ স্থগিত করা হয়েছে। কারণ, মাঠের মাঝখানে প্লোভার পাখি ডিম দিয়েছে। স্থানীয় সংস্থা ওয়াইল্ডকেয়ারের পরামর্শে খেলা পাশের মাঠে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং বলা হয়, সর্বোচ্চ ২৮ দিন পর্যন্ত খেলা বন্ধ রাখতে হতে পারে। কাউন্সিল জানিয়েছে, দেশি প্রজাতির পাখি রক্ষায় ডিম সরাতে হলে বিশেষজ্ঞের সহায়তা ও অনুমতি প্রয়োজন। জানা যায়, প্লোভার সাধারণত ডিম ফোটানোর সময় আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং বাসা রক্ষায় তীব্র আচরণ প্রদর্শন করে। এ পাখির চোখের চারপাশে হলুদ বৃত্ত থাকার কারণেই এর নামকরণ। আমাদের দেশেও এই পাখির দেখা মেলে—স্থানীয়ভাবে একে বলা হয় ছোট নথজিরিয়া বা ছোট জিরিয়া। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি এমন ঘটনা বাংলাদেশে ঘটত, তবে একটি মা ছোট জিরিয়ার ভাগ্যে কী জুটত? যেখানে মানুষ মা প্রজাতির জীবনই নিরাপদ নয়, সেখানে একটি পাখি ও তার ডিমের রক্ষা করা আকাশ কুসুম কল্পনা।

অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় বাংলাদেশ প্রায় ৪০০ গুণ ঘনবসতিপূর্ণ। তাই এখানে একটি ছোট পাখির ডিম রক্ষার জন্য খেলা স্থগিত রাখা অনেকের কাছেই অযৌক্তিক মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি যদি চলনবিল হয়? যেখানে রয়েছে ১০৫ প্রজাতির দেশি মাছ, ৩৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৭ প্রজাতির উভচর, ৩৪ প্রজাতির পাখি এবং অসংখ্য জলজ ও স্থলজ উদ্ভিদ। প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পুকুর, ৩০০টির বেশি খাল, ৪৭টি নদী ও ১৬৩টি বিল নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল শুধু উত্তরাঞ্চলের নয়, গোটা দেশেরই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। ভরা মৌসুমে পদ্মা ও যমুনার পানি বাড়লে চলনবিল হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা পানি ধারণ করে। কমে এলে সেই পানি আবার নদীগুলোতে সরবরাহ করে।

চলনবিল দেশের জলাধার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষাকারী অঞ্চল। প্রস্তাবিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের স্থান বুড়িপোতাজিয়া এ চলনবিলেরই অংশ। জায়গাটি বড়াল ও গোহালা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত এবং বছরের প্রায় চার মাস পানির নিচে থাকে। পুরো প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে বিল ভরাট ও বাঁধ নির্মাণে এবং ৫১৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে ভবন নির্মাণে। বাজেট থেকেই স্পষ্ট, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে জোরপূর্বক ব্যয়ই এখানে বড় অংশ। প্রস্তাবিত স্থানে ১০০ একর জমি ৯-১৪ মিটার উঁচু করতে প্রয়োজন হবে প্রায় ৩.৬ মিলিয়ন ঘনমিটার বালু। এরই মধ্যে মাত্র চার একর ভরাট করতেই নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। পুরো জায়গা ভরাট করা হলে যমুনা থেকে চলনবিলে পানি আসা এবং চলনবিল থেকে যমুনায় পানি যাওয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এর ফলে কৃষি ও উন্মুক্ত মৎস্যচাষ সংকটে পড়বে, দেশীয় মাছের প্রজনন নষ্ট হবে এবং বিলের ওপর নির্ভরশীল জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে। মৌসুমি বন্যার ধরনও বদলে যাবে।

অর্থনীতিতেও এর প্রভাব ভয়াবহ। বড়াল ও গোহালা নদী দিয়ে উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য ও দুধ বাঘাবাড়ী মিল্কভিটাসহ বিভিন্ন স্থানে যায়। আবার হুরসাগর নদীপথ দিয়ে পেট্রোল-ডিজেল বাঘাবাড়ী বন্দরে এসে উত্তরবঙ্গে সরবরাহ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণে এসব পথ ব্যাহত হলে বন্দর ও উত্তরাঞ্চলে তীব্র সংকট দেখা দেবে। অন্যদিকে বাপা, চলনবিল রক্ষা আন্দোলন ও বড়াল রক্ষা আন্দোলনের চাপের কারণে সম্প্রতি বড়াল নদীতে নতুন প্রাণ ফিরেছে। স্লুইসগেট অপসারণের পর পদ্মা-যমুনার পানির প্রবাহ আংশিকভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ আবারও চলনবিল ও পদ্মা-যমুনার সংযোগে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে, যা পুরো অঞ্চলের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলবে।

বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩-এর ২০ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা আছে—কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া জলাধার ভরাট, স্রোতের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি বা গতিপথ পরিবর্তন করতে পারবে না। চলনবিল ভরাট করে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ আইন ও আদালতের রায় উভয়কেই অমান্য করছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা উপপরিচালক দাবি করছেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েই পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং প্রতিটি ধাপে অনুমোদন নেওয়া হবে। তার যুক্তি, ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি’ নিয়েই প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু অনুমোদন নিলেই কি পরিবেশ ধ্বংস বৈধ হয়ে যায়?

একনেক সভায়ও কয়েকজন উপদেষ্টা চলনবিলের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, আমরা সংবাদপত্রের মাধ্যমে তা জেনেছি। তারা প্রকল্পের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষ ছাড়পত্রের মাধ্যমে অর্থ ছাড়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে স্পষ্ট, পরিবেশ রক্ষার দায় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে উন্নয়নের নামে দেশের বৃহত্তম মিঠাপানির জলাধার ধ্বংসের পথ তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হবে।

চলনবিল রক্ষার দাবিতে পরিবেশবিদ ও কর্মীরা নানা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। ১০ আগস্ট চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের পক্ষ থেকে পরিবেশ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়। একনেকে অনুমোদনের পরও দেশের ২২টি পরিবেশ ও সামাজিক সংগঠন সংবাদ সম্মেলন করে বিকল্প স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের দাবি জানায়। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিবাদ জানালে গালি, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

গত ১৬ আগস্ট প্রথম আলোতে চলনবিলে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ নিয়ে একটি ফিচার প্রকাশিত হলে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অনশনকারী শিক্ষার্থীরা তীব্র ক্ষোভে সংবাদপত্র পুড়িয়ে ফেলে, সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে। নানা আন্দোলনের মুখে একনেকে প্রকল্প অনুমোদন হয়। স্থানীয় শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও সংগঠনগুলো এ আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে। এতে প্রশ্ন জাগে—পরিবেশ রক্ষার দায় কি শুধু পরিবেশকর্মীদের? চলনবিল বাঁচলে কার লাভ? কার ক্ষতি?

বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ আমরা অবশ্যই চাই কিন্তু চলনবিলের মতো স্বতন্ত্র জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্ন করার জায়গাও ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। বাংলাদেশে উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংসের ঘটনা নতুন নয়। অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দলীয় রাজনীতি, টেন্ডারবাজি, ঠিকাদার ও নানা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। এ মহল খুবই সুসংগঠিত এবং সবাই নিজ স্বার্থ খোঁজে, পরিবেশের কোনো তোয়াক্কা করে না। বরং তারা এমনভাবে প্রচার চালায় যে, পরিবেশ কর্মীদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ একই পৃথিবীতে একটি ছোট পাখি ও একটি চলনবিলের গল্প সমান গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়া যেমন একটি প্লোভার পাখির ডিম রক্ষায় খেলা স্থগিত করতে পারে, বাংলাদেশ কি চলনবিলের মতো বিশাল জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একই দায়িত্বশীলতা দেখাতে পারবে না?

লেখক: পরিবেশ ও নারী অধিকারকর্মী

প্রকাশিত নিবন্ধের বক্তব্য ও দায়িত্ব লেখকদের নিজস্ব

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গোপালগঞ্জে আওয়ামীলীগ নেতার পদত্যাগ

নিখোঁজের ৪ দিন পর প্রবাসীর হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার

ক্যানসার শনাক্তে দেশে প্রথম রোবটিক প্রোস্টেট বায়োপসি হলো স্কয়ারে

আমার কথা বলে তাহেরী হুজুর আলোচনায় থাকতে চান : সামান্তা

অভিষেক ম্যাচেই ৪৭ বছরের রেকর্ড ভাঙলেন ভারতীয় ক্রিকেটার 

হার্ট ভালো রাখতে প্রতিদিন খাবেন যে পাঁচ খাবার

৩৪ তলার ফ্ল্যাট কেনার পর জানতে পারলেন ভবনটিই ৩২ তলা

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

১০

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

১১

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

১২

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

১৩

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

১৪

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

১৫

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

১৬

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

১৭

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

১৮

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১৯

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

২০
X