

সম্পদের পাহাড় থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর বুকে মুসলমান অধ্যুষিত বহু দেশ আজ যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের অভিশাপে জর্জরিত। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সম্পদ দিয়েই একটি শক্তিশালী বহুজাতিক ও অপ্রতিরোধ্য প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়া সম্ভব, যা প্রয়োজনে যে কোনো দেশের পাশে দাঁড়াতে পারে এবং যে কোনো আক্রমণের দাঁতভাঙা জবাব দিতে পারে। অথচ কেবল নিজেদের মধ্যে অনৈক্য, পশ্চিমা বিশ্বের ওপর আস্থা, নিজস্ব রাজপরিবার, বিনিয়োগ ও সম্পদের নিরাপত্তার হীনস্বার্থে বৃহত্তর মুসলমানদের সম্মিলিত স্বার্থকে বিলিয়ে দেওয়ার কারণে আরব নেতারা বরাবরই সাধারণ মুসলমানদের দ্বারা প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে ধিক্কৃত হয়েছেন। তথাপি তারা জেগেও ঘুমিয়ে থাকার ভান করছেন বলেই বিশ্বের বুক থেকে ফিলিস্তিন হারিয়ে যেতে বসেছে। নারী, শিশু, হাসপাতালের রোগী, আশ্রয় শিবিরের শরণার্থীসহ ৬৫ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির অকালমৃত্যু এবং লক্ষাধিক মানুষের পঙ্গুত্ব ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকায় নামাতে পারেনি মুসলমানদের। এর বিপরীতে ইউরোপের দেশগুলো গড়ে তুলেছে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন সংক্ষেপে ন্যাটো জোট।এই জোটের একটি দেশে বহিঃশত্রুর আক্রমণ সব দেশের ওপর আক্রমণ বলে বিবেচিত হয় এবং সম্মিলিতভাবে তা মোকাবিলা করতে সব সদস্য রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ।
আজ থেকে ৫৬ বছর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিত মুসলিম বিশ্বের নেতাদের সম্মেলনের মাধ্যমে জন্ম নেয় অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি)। এর আগের মাসে অর্থাৎ আগস্ট মাসের ২১ তারিখে জেরুজালেমে মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ আল-আকসা ইহুদিদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ২৪টি মুসলমানপ্রধান দেশের নেতা একজোট হয়ে ওআইসি গঠন করেন। মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এ সংগঠনটির জন্ম হলেও অনেকের দৃষ্টিতে আজ তা একটি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ। সংগঠনটির সনদে সৌদি আরবের জেদ্দায় প্রাথমিকভাবে সদর দপ্তর খোলার পরিকল্পনা করা হয় এবং প্রত্যাশা করা হয়েছিল যে, একদিন জেরুজালেম মুক্ত হলে সেখানেই ওআইসির সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু ৫৬ বছরেও তা হয়নি বলে জেদ্দা থেকেই সংগঠনটি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ধারণা করা হয় যে, আরব নেতাদের অনৈক্য, লোভ ও রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার নেশা এই সংস্থাকে অকার্যকর করে রাখার জন্য দায়ী। এমনি এক প্রেক্ষাপটে গত ১৭ সেপ্টেম্বর এক ব্যতিক্রমী সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হলো পাকিস্তান ও সৌদি আরব।ন্যাটোর আদলে এই দুটি দেশ ও অঙ্গীকার করল যে, যে কোনো দেশে শত্রুর আক্রমণ উভয় দেশের ওপর আক্রমণ বলে বিবেচিত হবে এবং সম্মিলিতভাবে তা মোকাবিলা করা হবে।
উল্লেখ্য, সৌদি আরবের সম্পদ আর পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা এই চুক্তিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। পাকিস্তানের মূল প্রতিপক্ষ ভারত। আর সৌদি আরব বরাবরই ভয় পেত নিজ দেশে রাজতন্ত্রবিরোধীদের উত্থানকে এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে। ইরান গোপনে পারমাণবিক ও রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের সক্ষমতা অর্জন করে বলে বিশ্বাস করে সৌদি আরব ও তার পশ্চিমা মিত্ররা। তাই এমন একটি চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে গোটা বিশ্ব।
অতিসম্প্রতি তথাকথিত হামাস বিদ্রোহীদের প্রতিহত করার নামে হঠাৎ কাতারে ড্রোন মারফত বোমা বর্ষণ করে ইসরায়েল। কতিপয় হামাস নেতা এসময় কাতার সরকারের মধ্যস্থতায় আয়োজিত শান্তি আলোচনায় যোগ দিতে কাতারে অবস্থান করছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দাবি করা হয়। ইসরায়েলের এমন একপেশে ও নির্লজ্জ আক্রমণ সৌদি আরবসহ বিশ্বের বহু দেশকে দুশ্চিন্তায় ফেলে।এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলো।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সখ্য নতুন কিছু নয়। একসময় পাকিস্তানি বৈমানিকরাই সৌদি জঙ্গি বিমান চালাতেন। ১৯৭৯ সালে মক্কায় একদল চরমপন্থি মুসলমান নভেম্বরের ২০ তারিখে পবিত্র কাবায় অবস্থান নেয়। তারা মক্কা শরিফ দখল করে এবং সৌদি রাজতন্ত্রবিরোধী স্লোগান দিতে থাকে। তখন সৌদি আরবের অনুরোধে পাকিস্তান একদল চৌকস কমান্ডো সেনা দল পাঠিয়ে কাবাঘরকে অবমুক্ত করে। মক্কায় বিশেষত পবিত্র কাবা চত্বরে রক্তপাত নিষিদ্ধ হলেও এই অভিযানে অনেকেই প্রাণ হারায় বলে জানা যায়। একসময় সৌদি রাজপ্রাসাদ এবং উল্লেখযোগ্য সৌদি স্থাপনা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছে পাকিস্তানি সৈন্যরা।তাই আসন্ন বিপদ বা ধারণাপ্রসূত ভবিষ্যৎ বিপদের কথা ভেবেই সৌদি আরব এমন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বলে ধারণা করা যায়।
অন্যদিকে পাকিস্তান নিমজ্জিত নানাবিধ সমস্যায়, যার অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রার স্বল্পতা ও বেকারত্ব। সৌদিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি বাবদ পাকিস্তান যদি সৌদি আরব থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর নামে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান পায় এবং সৌদি সরকার যদি প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে পাকিস্তানের বেকার যুবকদের সৌদি শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার দেয়, তা হবে উভয় দেশের জন্য মঙ্গলজনক। পাকিস্তান যে কোনো সময় ভারত এমনকি চীনের দিক থেকে আক্রমণের শিকার হলে এখন সৌদি আরবের মতো সম্পদশালী দেশকে পাশে পাবে। আর সৌদি আরব তার বিপদে পাশে পাবে অঘোষিত পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তানকে। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে বা গোপনে তৎপরতা চালালেও পাকিস্তানি কমান্ডোরা সেখানে ছুটে যাবে। এই চুক্তিকে তাই আপাতদৃষ্টিতে উইন উইন সিচুয়েশন বা উভয়ের জন্য কল্যাণকর বলে আখ্যা দেওয়া যায়।
তবে এই চুক্তির ঝুঁকির দিকও কম নয়। সৌদি আরবের রাজতন্ত্রবিরোধী সব পক্ষ বিশেষত ইরান এমন চুক্তির পর পাকিস্তানকেও শত্রু ভাবতে পারে। ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথে সৌদি আরব পাকিস্তানের পক্ষ নিলে সৌদি আরবসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যের কর্মরত লাখ লাখ ভারতীয় শ্রমিক, কারিগর ও পেশাজীবী অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষত সৌদি আরবের নিরাপত্তার একক খবরদারি করা বা গ্যারেন্টর হওয়ার প্রবল আগ্রহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।নিরাপত্তার নামে সমরাস্ত্র বিক্রি করে বরাবরই সমৃদ্ধ হয়েছে পশ্চিমা অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। এখন পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তি পশ্চিমাদের কানে বেসুরো লাগাই স্বাভাবিক। বিশেষত পাকিস্তান যদি চীন, ফ্রান্স কিংবা রাশিয়ার মতো দেশ থেকে সমরাস্ত্র এবং যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করে, তবে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হবে। সৌদির বিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী সব শক্তি বিশেষত ইয়েমেনভিত্তিক ও ইরানসমর্থিত যোদ্ধা বা গেরিলারা পাকিস্তানের যে কোনো স্থাপনাকে এমনকি কোনো বিমান বা জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।আবার ইয়েমেন সীমান্তের ভয়ংকর মৃত্যু উপত্যকায় ডাক পড়তে পারে পাকিস্তানি সৈন্যদের, যা সাধারণ পাকিস্তানি জনগণ এমনকি সেনাবাহিনীও অপছন্দ করতে পারে।
বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রবাসী শ্রমিকের গন্তব্য সৌদি আরব। মূলত সৌদি আরব থেকে আসা বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। ১৯৯০ সালে ইরাককর্তৃক কুয়েত দখল এবং সম্ভাব্য সৌদি আরব দখলের প্রকাশ্য হুমকির প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবে সৈন্য পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ। বৃহত্তর নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ যদি সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশ থেকে প্রস্তাব পায়, তবে আমাদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত, তা ভাবা প্রয়োজন। এরই মধ্যে কাতারে বাংলাদেশি সেনাদের মোতায়েনের খবর প্রকাশিত হয়েছিল, যা ইদানীং আর শোনা যাচ্ছে না। তবে মুসলমান জনসংখ্যার বিচারে চতুর্থ বৃহৎ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উচিত ন্যাটোর আদলে বৃহৎ কলেবরে মুসলমানদের রক্ষার জন্য একটি ইসলামিক সামরিক জোট গঠনের দিকে এগিয়ে যাওয়া বা এমন কোনো উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত মেজর, গবেষক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
ইমেইল: [email protected]