

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক অনেকটাই বদলে গেছে। এই পরিবর্তনের একটা স্পষ্ট চিত্র ধরা পড়ে গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যে তার রাষ্ট্রীয় সফরের সময়। সেই সফরের ছবি যেন ছিল সিনেমার মতো—ঘোড়ার গাড়ি টানছে রাজসভার ছায়ায়, সাজানো-গোছানো সৈনিকের কুচকাওয়াজ, সোনালি আলোয় ঝকঝক করা ডিনারের আয়োজন আর পুরো আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
এই সফরের মাধ্যমে ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ও যুক্ত হলো। ট্রাম্পই প্রথম নির্বাচিত মার্কিন নেতা, যিনি দ্বিতীয়বার যুক্তরাজ্যে রাষ্ট্রীয় সফরের সম্মান পেলেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার নিজেই হোয়াইট হাউসে গিয়ে ট্রাম্পকে আমন্ত্রণপত্র দিয়েছিলেন। এই আমন্ত্রণ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সফরের আয়োজন নয়; বরং ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বয়ে এনেছে।
তবে এই পথচলার শুরুটা মোটেই এমন মসৃণ ছিল না। ট্রাম্প যখন প্রথমবার হোয়াইট হাউসে এসেছিলেন, ইউরোপের অনেক নেতাই তাকে ভালো চোখে দেখেননি। প্রকাশ্যেই কেউ কেউ তাকে ব্যঙ্গ করেছেন, সামাজিক মাধ্যমে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। জবাবে ট্রাম্পও ছেড়ে কথা বলেননি। কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন ইউরোপীয় নেতাদের। সেই সময় হাতেগোনা কিছু নেতা ছিলেন যারা ট্রাম্পের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন ন্যাটোর তৎকালীন মহাসচিব ইয়েন্স স্টোলটেনবার্গ। এমনকি তিনি ‘দ্য ট্রাম্প হুইসপারার’ নামে পরিচিতিও পান। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁও তখন ট্রাম্পের সঙ্গে এক ধরনের কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ইউরোপের অধিকাংশ নেতা বরং দিন গুনছিলেন কখন ট্রাম্প হোয়াইট হাউস ছাড়বেন।
কিন্তু এবারে দৃশ্যপট একেবারেই আলাদা। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইউরোপের রাজনৈতিক নেতারা তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অনেক বেশি সচেষ্ট। আগের তুলনায় তারা এবার বুঝতে পেরেছেন—প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের চাবিকাঠি শুধু পদ বা নীতিতে নয়, বরং ব্যক্তিত্বে। ব্যক্তিকে বোঝা, তার পছন্দ-অপছন্দ, ভাবনা ও অভ্যাস বোঝার মাধ্যমেই সম্পর্ক সহজ হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার সেটা ভালোভাবে বুঝেছেন। তিনি জানেন ট্রাম্প ব্রিটিশ রাজপরিবারকে পছন্দ করেন। তাই রাজা চার্লসের হাতে লেখা আমন্ত্রণপত্র দিয়ে তিনি ট্রাম্পের মন জয় করতে পেরেছেন।
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব্ব ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেন ইস্যুতে বেশ প্রভাবশালী যোগাযোগকারী হয়ে উঠেছেন। তিনি এই সম্পর্ক গড়েছেন কূটনৈতিক চ্যানেলে নয়, বরং গলফ মাঠে—কারণ একসময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কলেজ পর্যায়ে গলফ খেলেছেন।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্টজও ট্রাম্পের পারিবারিক শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তার পূর্বপুরুষের জন্মসনদ উপহার দিয়েছেন প্রথম সাক্ষাতে। আর ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, যিনি আদর্শিকভাবে ট্রাম্পের অনেক কাছাকাছি, সার্বভৌমত্ব ও অভিবাসন ইস্যুতে তাদের মিলের জায়গা থেকেই আলোচনা এগিয়ে নিতে পেরেছেন।
এটাই হয়তো কূটনীতির সবচেয়ে মানবিক দিক—বড় বড় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত আর বৈশ্বিক রাজনীতির অঙ্ক কখনো কখনো গড়ে ওঠে একান্ত ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার ওপর। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইউরোপ যেটা ধরতে পারেনি, এখন সেটা তারা বুঝেছে এবং সে অনুযায়ী নিজেদের আচরণও বদলেছে এবং এই নতুন আচরণ, নতুন কৌশল হয়তো ভবিষ্যতের ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের ভিত্তি রচনা করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সম্প্রতি এক ঐতিহাসিক বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যেটিকে কেউ কেউ বলছেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যচুক্তি। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এমন কিছু কল্পনাও করা যেত না।
ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলোও প্রতিরক্ষা খাতে তাদের জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, ইউক্রেন বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একসময় তিনি ইউক্রেনে মার্কিন সামরিক সহায়তার প্রবল সমালোচক ছিলেন। এখন ইউরোপীয় অর্থায়নে তৈরি হওয়া মার্কিন অস্ত্রের বড় বড় সহায়তা প্যাকেজও তার প্রশাসনের হাত দিয়েই পাস হচ্ছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যেখানে ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েই তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ইউরোপীয় নেতারা যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কায় ভুগতেন, সেখানে এই পরিবর্তন যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
২০২৫ সালের জানুয়ারির আগেই কেউ যদি এসব সম্ভাবনার কথা বলতেন, তা নিছক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু ট্রাম্প নিজেই তো একজন চুক্তিপ্রেমী মানুষ। দর কষাকষি করতে তিনি ভালোবাসেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে তার আনন্দ। ইউরোপের নেতাদের শক্ত অবস্থান ও কঠিন আলোচনা কৌশল তিনি সম্মান করেন।
এই প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উদাহরণটি উল্লেখযোগ্য। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ইউরোপের সব নেতার মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পেরেছেন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা থেকে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করতে শিখেছেন। এর ফলেই সম্ভব হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন মিনারেলস চুক্তি, যার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের কঠিন আলোচনা, এমনকি হোয়াইট হাউসে প্রকাশ্য মতবিরোধও।
জেলেনস্কি পরে এমন অবস্থানে পৌঁছান যে, তিনি ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবের সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হন। আর এই অবস্থানে গিয়ে ক্রেমলিন হয়ে ওঠে প্রতিবন্ধকতা। ফলাফল হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা।
এই পরিবর্তন শুধু ইউরোপের জন্য ভালো তা নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও লাভজনক। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু অংশ বিশ্বরাজনীতিতে নিরপেক্ষ বা একাকী পথের পক্ষে, ইউরোপের গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। ইউরোপ হলো আমেরিকার সবচেয়ে বড় একক বাণিজ্যিক অংশীদার, রপ্তানির বৃহত্তম বাজার এবং সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগের উৎস।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতি ও নিরাপত্তা বহু দিকেই ইউরোপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে—বিশ শতকের ইতিহাস তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে ইউরোপ নিয়ে মাঝেমধ্যে সমালোচনা শোনা গেলেও, মনে মনে সবাই জানেন ইউরোপ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও, যিনি ইউরোপের নানা রাজনৈতিক ইস্যু বিশেষ করে বাকস্বাধীনতা নিয়ে অনেকবার প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন, সম্প্রতি নিজের পরিবার নিয়ে যুক্তরাজ্যে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন।
এই ভ্রমণের প্রতীকী তাৎপর্য ছোট নয়। এটি বোঝায়—সব কথার বাইরে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক কতটা গভীর।
এ কারণেই হয়তো ইউরোপীয় নেতারা এবার নিজেদের কৌশল বদলেছেন। ট্রাম্পের চিন্তা ও মনের জায়গাগুলো বুঝে তারা যে সহনশীলতা ও শ্রদ্ধা দেখাচ্ছেন, তাতে একটি সুস্থ ও বাস্তববাদী সম্পর্ক গড়ে উঠছে।
ট্রাম্পও এসব বন্ধুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতের প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন সহযোগিতার মাধ্যমে, বিরোধিতার মাধ্যমে নয়। এই গল্প আমাদের একটিই সহজ বার্তা দেয়—সবসময় নীতিই নয়, কূটনীতির মূলে থাকে মানুষ। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় নেতারা বুঝে গেছেন, নীতির পেছনের মানুষটিকে বুঝলেই শুধু সম্পর্ক টিকে থাকে, ভালোও থাকে।
লেখক: হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো। আরব নিউজের মতামত বিভাগ থেকে ভাষান্তর করেছেন তারেক খান