

একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কতখানি অব্যবস্থাপনা বিরাজমান থাকলে প্রতিষ্ঠানটির একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীও মুমূর্ষু রোগীর অক্সিজেন মাস্ক খুলে নেওয়ার হিম্মত দেখাতে পারে, তার প্রমাণ খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল। অভিযোগ উঠেছে, চাহিদা অনুযায়ী বকশিশ না পেয়ে জব্বার নামে এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী ভুক্তভোগী রোগী শেখ সাইফুল ইসলামের মাস্ক খুলে নিলে কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। নিঃসন্দেহে এ ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। একই সঙ্গে উদ্বেগের। ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অনুশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সোমবার কালবেলায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ঘটনাটি গত রোববারের। সাইফুলের পরিবারের সদস্যরা জানান, কিডনি জটিলতা নিয়ে গত শনিবার সকালে তাকে খুমেক হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিট-১-এর ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। শনিবার সকালে ভর্তির পর সন্ধ্যায় সাইফুলের শ্বাসকষ্ট বেড়ে অবস্থার অবনতি হয়। স্বজনরা তখন অক্সিজেনের জন্য ডাক্তার, নার্সসহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ছোটাছুটি করে ব্যর্থ হন। পরে একজন ওয়ার্ডবয়কে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করা হয় অক্সিজেন। কিন্তু রোববার সকালে আরেকজন ক্লিনার সেই অক্সিজেন খুলে নিয়ে যায়। এ সময় রোগীর লোকজন বাধা দিলে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ক্লিনার জব্বার। এরপর মারা যান সাইফুল।
যতদূর জানা যায়, হাসপাতালটিতে অক্সিজেনের এমন কোনো অপ্রতুলতা ছিল না যে, একজন মুমূর্ষু রোগীর অক্সিজেন মাস্ক খুলে আরেকজনকে দিতে হবে। এর চেয়ে বড় প্রশ্ন, একজন ক্লিনার কি কোনো রোগীর চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? এটি কি তার দায়িত্ব? তার মানে, এটি শুধু একটি অনিয়ম নয়, বিরাট অপরাধ। কারণ, এতে একজন রোগীর মৃত্যু হতে পারে এবং বাস্তবে হয়েছেও তাই। তাহলে ওই ক্লিনার তার নিজের অবস্থান জেনেশুনেও কেন এরকমটা করতে গেল—এমন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এখানে এটা অনুমান করা খুব কঠিন নয়, ওই হাসপাতালে এসব কর্মীর মধ্যে হয়তো এ প্রবণতা বা চর্চা বহুদিন ধরেই রয়েছে। ফলে এরকম একটি ভয়ানক কাজ করতে তার দ্বিধা হয়নি। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত সাহায্যকারীদের মধ্যে রোগীদের উপকারের নামে এক ধরনের উৎপাতের কথা আমরা জানি। হাসপাতালে রোগীর জন্য শয্যার ব্যবস্থা করা, রোগীকে হুইলচেয়ারে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেওয়া; এমনটি বেডশিটের ব্যবস্থা করে দেওয়ার মতো নানা কাজ করে তারা বকশিশের বিনিময়ে। অথচ এসব সেবা রোগীর এমনিতেই প্রাপ্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা; যেখানে রয়েছে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার অভাব। কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের যোগসাজশও এসবের জন্য দায়ী—এমন অভিযোগ উঠেছে অহরহ। ফলে এসব কর্মকাণ্ড সেবাপ্রত্যাশীদের জন্য একপর্যায়ের ভোগান্তি। কিন্তু চিকিৎসকের কাজ বা সিদ্ধান্ত যদি ওয়ার্ডবয় দেয়, সেটা কোন পর্যায়ের ভয়াবহ প্রবণতা? রোগীর বড় ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী বোঝা যাচ্ছে, হাসপাতালে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে বাইরের ‘বড় ভাই’য়ের দ্বারস্থ হতে হয়েছে! এদিকে ঘাটতি নেই অক্সিজেনের। অর্থাৎ ব্যবস্থাপনার মধ্যেই রয়েছে চরম ফাঁকি।
আমরা মনে করি, একজন মুমূর্ষু রোগীর অক্সিজেন মাস্ক খুলে নেওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে অপরাধ। এ অপরাধ সত্যিকারই যদি সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে এর সুষ্ঠু তদন্ত দরকার এবং জড়িতের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি হাসপাতালটিতে বিরাজমান অব্যবস্থাপনার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক সেবাপ্রত্যাশী কোনোরকমের ভোগান্তি ও দুর্ভোগ ছাড়া সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন। আর তা পেতে যদি পদে পদে দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা।