

বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা বরগুনার তালতলী উপজেলায় অবস্থিত টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (Tengragiri Wildlife Sanctuary) দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ বনাঞ্চল। প্রায় ৪০৪৮ হেক্টর আয়তনের এ অভয়ারণ্য ২০১১ সালে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। এটির প্রচলিত নাম ‘ফাতরার বন’ বা ‘টেংরাগিরি ইকোপার্ক’। একদিকে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি, অন্যদিকে গড়ে ওঠা ঘন সবুজ অরণ্য—এই অনন্য সমন্বয়ে টেংরাগিরি বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের ভান্ডার হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। টেংরাগিরির বনভূমি মূলত ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বৃক্ষ দ্বারা গঠিত। সুন্দরবনের নিকটবর্তী হওয়ায় এখানকার অনেক গাছপালা ও প্রজাতির সঙ্গে সুন্দরবনের মিল দেখা যায়। গেওয়া, কেওড়া, সুন্দরী ও ফাতরা গাছ এবং গোলপাতা জাতীয় উদ্ভিদ এ বনে দেখা যায়। বনটির ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগরের ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সম্মুখে প্রাকৃতিক বেষ্টনী হিসেবে এটি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে।
এ অভয়ারণ্যে রয়েছে অসংখ্য বন্যপ্রাণী ও পাখি। এখানে শিয়াল, বনবিড়াল, বানর, মেছো বিড়ালসহ নানা স্তন্যপায়ী প্রাণীর বসবাস রয়েছে। পাখির মধ্যে শামুকখোল, সাদা বক, মাছরাঙা, কাকাতুয়া, শকুনসহ বিভিন্ন প্রজাতি দেখা যায়। শীতকালে পরিযায়ী পাখিরাও এখানে আশ্রয় নেয়। বনের খাল-নদী মাছ, লাল কাঁকড়া ও চিংড়ির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আবাসস্থল। কার্বন শোষণের ক্ষমতার কারণে বিজ্ঞানীরা টেংরাগিরিকে একটি ‘কার্বন সিংক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার সঙ্গে এ বনের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। এ বন থেকে সাধারণ মানুষ কাঠ, মধু, মাছ ও গোলপাতা সংগ্রহ করে। পাশাপাশি এটি একটি সম্ভাবনাময় ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র। প্রতি বছর শীতকালে হাজারো ভ্রমণপিপাসু এখানে ঘুরতে আসেন। পর্যটন খাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা হলে এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে। কিন্তু টেংরাগিরি বর্তমানে নানা সংকটের মুখে। অসাধু ব্যবসায়ীরা নিয়মিত বনভূমির গাছ কাটছে। এতে বন ধ্বংসের পাশাপাশি প্রাণীর আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইকোপার্ক হিসেবে ঘোষণার পরও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত কয়েক দশকে এ অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ বন ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। অবকাঠামোর জীর্ণতা, নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভাঙন, পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব এবং বনরক্ষীদের সীমিত জনবল—এসব অভয়ারণ্যের জন্য বড় সমস্যা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বৃদ্ধি এ বনকে বড় হুমকির মুখে ফেলছে। দারিদ্র্য ও জীবিকার তাগিদে অনেক মানুষ বনজ সম্পদ নির্বিচারে আহরণ করছে। সরকার এবং এনজিওগুলোর পক্ষ থেকে টেংরাগিরি রক্ষার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ‘নিসর্গ’ প্রকল্পের আওতায় এখানে কো-ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাতে বন বিভাগ ও স্থানীয় জনগণ একসঙ্গে কাজ করছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বিকল্প জীবিকা সৃষ্টি এবং পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
টেংরাগিরিকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অবৈধ গাছ কাটা রোধে নিয়মিত টহল ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বিকল্প আয়ের পথ যেমন—পর্যটন সেবায় যুক্ত করতে হবে। পরিকল্পিত অবকাঠামো ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে বনভূমির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করতে হবে। স্যাটেলাইট মনিটরিং ও ড্রোন জরিপ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। টেংরাগিরি শুধু একটি বনভূমি নয়, এটি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের অবলম্বন। দেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য এ অভয়ারণ্যকে রক্ষা করা অপরিহার্য। নীতিনির্ধারক, গবেষক, সাংবাদিক, পরিবেশকর্মী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় টেংরাগিরি আবারও হয়ে উঠতে পারে সবুজের সমুদ্র; যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে প্রকৃতির অমূল্য উপহার হিসেবে টিকে থাকবে।
মো. তাহাসিনুল ইসলাম, শিক্ষার্থী
পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়