

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস শুক্রবার রাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যে ভাষণ দিয়েছেন, তা নানা কারণে প্রণিধানযোগ্য। তার এ বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতিত ফ্যাসিস্ট ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরও দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। দেশের মধ্যে বিরাজ করছে নানারকম অস্থিরতা। আগামী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান, নির্বাচন পদ্ধতি ও নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়েই গেছে। ফলে নির্বাচন দিয়ে সাধারণ মানুষের শঙ্কা কাটছে না। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির কথা জাতিসংঘকে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। পাশাপাশি অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপ, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমস্যা, যুদ্ধ-সংঘাতসহ নানা বিষয় তুলে ধরেছেন। তরুণদের জন্য কীভাবে নিরাপদ বিশ্ব গড়ে তোলা যায়, সে আকাঙ্ক্ষা এবং পথ নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।
বৈশ্বিক এই ফোরামে দাঁড়িয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, তার সরকারকে বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামোকে পুনর্গঠন করে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রয়োজন ছিল ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের। যে বিপুল জনসমর্থনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার দায়িত্ব পেয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটে সরকারের সহজ পথ ছিল নির্বাহী আদেশে সংস্কারকাজগুলো করা। কিন্তু সরকার বেছে নিয়েছে কঠিন পথ—অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই পথ। ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন ও তাদের সুপারিশ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে আর কোনো স্বৈরশাসকের আবির্ভাব হবে না। কোনো নির্বাচিত নেতা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্বরূপকে ক্ষুণ্ন করতে পারবের না, কিংবা রাষ্ট্র ও জনগণের রক্ষকরা ভক্ষকে পরিণত হতে পারবেন না।’
বর্তমানে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা এবং ঘৃণাত্মক বক্তব্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়ানো হয়েছে, যা এখনো চলমান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিকল্পিত মিথ্যা সংবাদ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ‘ডিপফেক’-এর প্রসার, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এসবের বিরুদ্ধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যাতে এসব বিকৃত কর্মকাণ্ড মানুষের ওপর মানুষের আস্থাকে বিনষ্ট না করে এবং সামাজিক সম্প্রীতিকে দুর্বল না করে।
অধ্যাপক ইউনূস গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, শিশুরা না খেয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করছে, বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে নির্বিচার হত্যা করা হচ্ছে। হাসপাতাল, স্কুলসহ একটি গোটা জনপদ নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হচ্ছে। জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সঙ্গে একমত যে সবার চোখের সামনেই একটি নির্বিচার গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। দুর্ভাগ্য যে মানবজাতির পক্ষ থেকে এর অবসানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও ইতিহাস ক্ষমা করবে না।
আমরা মনে করি, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ সমস্যার দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এখনই বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আর দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে যে সুচিন্তিত বক্তব্য রেখেছেন, তা বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। তবে এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐক্য।