

দুর্গা যখন আমাদের শক্তি, তখন আমরা ভয় পাই কেন? সহজ গল্পে তিনি মহিষাসুর বধ করেছিলেন। আসলে জীবনের সব অসুর বা আসুরিক শক্তি দমনের নামই দুর্গা। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তিনি ঘরে ঘরে বিরাজমান। আমাদের পরিবারে আমরা পাঁচ ভাইবোন ছিলাম। চার দিদি আর আমি। এই পাঁচজনের জন্য দুটি করে হাত থাকা আমার মা নিজেই একজন দশভুজা ছিলেন। বাঙালির পরিবারে এটাই সত্য।
বিশ্বাস আর শ্রদ্ধা মিলে দুর্গার যে পরিচয়, সেখানেই বাঙালি হিন্দুর শক্তি। হয়তো আমরা নানা কারণে তা বুঝি না। মনে করি, আমাদের জন্ম হয়েছে মার খাবার জন্য। এর কারণ রাজনীতি। একসময় বাঙালি হিন্দু কমিউনিস্ট হওয়ার জন্য পাগল ছিল। সাম্যবাদ আর সমাজতন্ত্রের জন্য যে ধর্ম বিসর্জন দেওয়ার দরকার নেই এটা বুঝতে না পেরে পশ্চিমবঙ্গের বামরা ভরাডুবির শিকার হয়েছিলেন। আর কোনোদিন মাথা তুলতে পারবেন বলে মনে হয় না। অথচ আপনি দেখবেন, ধর্মের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়েও ধর্ম পালন করে রাজনীতি করা যায়। যারা তা করেছেন তারা ব্যর্থ হননি।
যে কথা বলছিলাম আমাদের জীবনে এখন মাতৃশক্তির প্রয়োজন বেশি। ছেলেবেলায় আমরা ভয় পেলে কী করতাম? দৌড়ে গিয়ে মায়ের আঁচলতলে লুকিয়ে পড়তাম। এমন কোনো শিশু নেই যে ভূত দৈত্য বা দানবের ভয়ে মায়ের কোলে আশ্রয় নেয়নি। বড় হতে হতে আমরা জেনে যাই আমাদের সাধারণ মা আর যাই পারুক ভূত তাড়াতে পারে না। কিন্তু ততদিনে আমাদের ভূতের ভয় কেটে যায়। আসলে মনের ভূত সামাল দিতে মায়ের আঁচল হচ্ছে শ্রেষ্ঠ অস্ত্র। সেটাই বড় হতে হতে ভুলে যায় বাঙালি জনগোষ্ঠী।
এখন ভূত দৈত্যের ও আধুনিক রূপ। তারা দাঁত বের করে আসে না। আসে দিনে দুপুরে। হাতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। উদ্দেশ্য আমাদের পরাজিত করা। বলশালী না হলেও সংখ্যাগুরু হওয়ার কারণে তারা আক্রমণ করে। সে আক্রমণের শিকার যারা, তাদের কান্না কি বৃথা যায়? যায় না। গেলে পরাক্রমশালী সরকারপ্রধান পালিয়ে যেত না। মনে করুন বাংলাদেশে একবার অকারণে পূজা নষ্ট করে হামলা করার সময় এরা নীরবতা পালন করেছিল। সময় ছেড়ে কথা বলেনি। নিয়তির কী পরিহাস, এই হামলার হোতাকে আশ্রয় নিতে হয়েছে হিন্দু অধ্যুষিত এক রাজ্যে। এর চাইতে বড় শিক্ষা আর কী হতে পারে?
এমন ভূরি ভূরি উদাহরণ থাকার পরও আমাদের জাতির চোখ অন্ধ। বলছিলাম দেশ-বিদেশে এখন শক্তির আরাধনা প্রয়োজন। আমি যেটা পজিটিভ দেখি সেটা হচ্ছে তরুণ-তরুণী যুবশক্তি এখন পূজা করতে আগ্রহী। ভাববেন না, আমি অন্ধকার সাম্প্রদায়িকতার কথা বলছি। আমি বলছি আত্মসচেতনতা আর নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার কথা। সেটা রাখতে না পারলে আমাদের জীবন যেমন অন্ধকার, তেমনি ভবিষ্যতে বাঙালি হিন্দু বলেও কিছু থাকবে না।
এ কারণেই আমাদের উচিত সার্বজনীন পূজাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিদেশের নিরাপদ মাটিতে আরও কিছু কাজ করা দরকার। বিশেষ করে শিশু কিশোর-কিশোরী তারুণ্যকে সঙ্গে নিতে হবে। তারা হাল না ধরলে ভবিষ্যৎ অনিরাপদ। এই কাজটা করার জন্য আনন্দের সংযোগ জরুরি। বাদ্যবাজনা খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি নিষ্ঠা আর আচারকে তুলে ধরা জরুরি। পৃথিবীতে এখন আর কেউ ধর্ম পালন মানে সাম্প্রদায়িক—এটা মনে করে না। ফলে পালন করার ভেতর দিয়ে নিজেদের সংহত করার চর্চা এখন সময়ের চাহিদা।
মনে রাখতে হবে জননী জন্মভূমি আর সংস্কৃতি মানুষের মৌলিক অধিকার। সে জন্ম থেকে যা পায়, সেটা তার নিয়তি। এই নিয়তি বা নিজস্বতা নিজেদেরই ধরে রাখতে হয়। যারা তা পারছে তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে তারাই টিকবে। আমাদের মহাভারত বা রামায়ণ ও যুদ্ধে বিজয়ের গল্প। যে যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ নিজে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ধর্ম ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে বিজয় এনে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে রামায়ণে রামচন্দ্র একশ আটটি নীলপদ্ম দিয়ে দেবীকে আরাধনা করে শক্তি নিয়ে জয়ী হয়েছিলেন। এসব কাহিনি মূলত রূপক। যেগুলো আমাদের জীবন ও সংগ্রামকে জয়ী করার জন্য রচিত।
দুর্গাপূজার আরেকটা বিশেষ দিক হচ্ছে দুর্গার সঙ্গে বিদ্যা জ্ঞান ধন সিদ্ধি ও বীরত্বের দেবদেবীরা থাকেন। মাথার ওপর থাকেন ত্রিকালদর্শী মহাদেব। সংহার আর সংযোজনের এই অনুপম দৃষ্টান্ত থেকে আমরা যেন শিক্ষা নিতে পারি। তাহলেই শুধু দুর্গা আরাধনা সফল হবে। আজকাল বিলাস ব্যসনের যুগ। বিলাসের আড়ালে চাপা পড়ে যায় আসল রূপ। এটা থেকে মুক্তি পেতে নিষ্ঠার বিকল্প নেই। সেই নিষ্ঠা
দেশ-বিদেশে সবার জন্য দরকার।
দুর্গা পূজা নানা কারণে নানা ভাবে জীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে। আর কোনো পূজায় এত শিল্প-সংস্কৃতির রমরমা চোখে পড়ে না। গান লেখা নৃত্যসহ নানা অনুষঙ্গে এমন জমজমাট পূজা আর নেই। তাহলে আমরা কি এটা মানব না যে, এখানেই সব তীর্থের মিলন? মিলন মোহনায় আর কতকাল দাঁড়িয়ে থাকবে বাঙালি হিন্দু? এখন তার সব সংকীর্ণতা আর ভয় কাটানোর সময়। সত্যি এটাই আমাদের প্রজন্মের শেষ সুযোগ। একবার বুক বেঁধে দাঁড়াতে পারলে অপশক্তি মাথা নত করতে বাধ্য হবে।
আমি বিশ্বাস করি এবং জানি এ কাজ করা যায়। ঐক্য ভালোবাসা আর বিশ্বাস এক হলেই তা সম্ভব। এবারের শারদীয় উৎসব সবার জন্য উন্মুক্ত অথচ আমাদের প্রাণশক্তির বাহন হবে আসুক। মা দুর্গা আমাদের দুর্গতি নাশ করে শান্তি দিন।
লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী
ছড়াকার ও কলামিস্ট