

গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির নথিতে স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে স্বাক্ষর করেছে মিশর, কাতার ও তুরস্কও। সোমবার লোহিত সাগরের তীরবর্তী মিশরের শারম আল শেখে আয়োজিত আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে নথি স্বাক্ষরের পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়। শান্তি সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন। শারম আল শেখে আয়োজিত এ শান্তি সম্মেলনে ২৮টি দেশ এবং তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার নেতা ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন। গাজায় যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হলেও এতে ইসরায়েল ও হামাসের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। তবে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে বন্দিবিনিময় হয়েছে। সোমবার জীবিত জিম্মিদের ইসরায়েলের হাতে তুলে দিয়েছে হামাস। মৃত জিম্মিদের মরদেহও ফেরত দেওয়া শুরু হয়েছে। এদিন ইসরায়েলও চুক্তি অনুযায়ী ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকায় নির্বিচার হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে গত দুই বছরে ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। ফিলিস্তিনি বন্দিদের একাংশকে মুক্তি দেওয়া হয় ইসরায়েলের ওফের কারাগার থেকে। বছরের পর বছর ধরে বন্দি থাকা প্রিয়জনকে ঘরে ফেরাতে এ সময় কারাগারটির আশপাশে ভিড় করেন অনেক ফিলিস্তিনি। তাদের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস। অনেকের হাতে ছিল ফিলিস্তিনের পতাকা। কারাগার থেকে বাসে করে বেরিয়ে আসা বন্দিদের মধ্যেও ছিল মুক্তির আনন্দ।
বন্দিদের মুক্তি উপলক্ষে গাজার দক্ষিণে খান ইউনিসের একটি চত্বর সাজানো হয় পতাকা ও ব্যানার দিয়ে। সন্তান মোহাম্মদের মুক্তির খবরে উচ্ছ্বসিত ছিলেন গাজার বাসিন্দা ইয়াসির আবু আজুম। তিনি বলেছেন, ২০২৩ সালে তার ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুই বছর তাকে দেখেননি। তিনি এত খুশি যে, কথা বলতে পারছেন না। জিম্মি মুক্তি উদযাপনে ইসরায়েলের তেল আবিবের ‘হোস্টেজ স্কয়ারে’ জড়ো হয় হাজার হাজার মানুষ। গাজা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর জিম্মিদের নেওয়া হয় ইসরায়েলের রেইম সেনাঘাঁটিতে। সেখানে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হন তারা। এমন এক জিম্মি নিমরোদ কোহেনের মা ভিকি হোসেন জানান, তিনি খুবই উচ্ছ্বসিত। খুবই খুশি। এই মুহূর্তটা যে কেমন, তা কল্পনাও করা কঠিন।
ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি থাকা ফিলিস্তিনিদের নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েল থেকে মুক্তি পেয়েছেন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আলারিমায়ি। আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গত দুই বছরের বন্দিজীবনের কথা তুলে ধরেছেন তিনি। আলারিমায়ি বলেছেন, ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনিদের অনাহারে রাখা এবং নিপীড়ন করা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বন্দি থাকার সময় তার ওজন ৫০ কেজি কমেছে। মুক্তি পেয়ে মেয়েকে যখন জড়িয়ে ধরেছিলেন, তখন তার মেয়ে বলেছিল, ‘বাবা তুমি আমাকে ব্যথা দিচ্ছ।’ আসলে অনাহারে তার শরীর থেকে হাড় বেরিয়ে এসেছে।
গণমাধ্যমে ইসরায়েলিদের নির্মম নির্যাতনের খবর পড়ে অনেকেই অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলিরা নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আসছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির কারণে ফিলিস্তিনের ধ্বংসস্তূপের ওপর সব হারানো মানুষ যেন আবার বেঁচে থাকার এবং মুক্তির দিশা খুঁজে পেয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, এ মুক্তির আনন্দ স্থায়ী হবে। বন্ধ হবে মানুষের জীবন নিয়ে খেলার রাজনীতি।