

২০২৪-এর জুলাইয়ে যে অবিস্মরণীয় ঘটনাটি ঘটে গেল—তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা, লেখালেখি, টকশোসহ সর্বত্রই আলোচনা চলছে। তবে এসব আলোচনা বা বাহাস হচ্ছে এর সফলতা বা ব্যর্থতা নিয়ে। মনে হয়—আসল বাদ দিয়ে এর উপসর্গ নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। আসল রোগটি কোথায়, তার অনুসন্ধান বাদ দিয়ে রোগী কখন দৌড়াতে শুরু করবে—ঠিক তেমনি। মনে হচ্ছে, জুলাইয়ের আন্দোলন-সংগ্রামের মূল অর্থ বা সমার্থক শব্দটি হচ্ছে ‘সংস্কার’। আমাদের গোড়ায় অর্থাৎ মূলে যেতে হবে।
এক, জুলাই কি গণঅভ্যুত্থান না বিপ্লব, অথবা বিপ্লবের প্রথম ধাপ? দুই, জুলাই কি শুধুই ছাত্র বা শহুরে তরুণ জনগোষ্ঠীর; না সর্বস্তরের অর্থাৎ শ্রমজীবী, কৃষক, মধ্যবিত্তের এবং অভিযুক্ত উচ্চবিত্তের একাংশের? তিন, জুলাই কি শুধুই সংস্কার এবং ‘রিফর্ম’-এর জন্য? এ ধরনের নানা প্রশ্নের জবাব না পেলে বা অমীমাংসিত রেখে জুলাই সম্পর্কে কোনো অঙ্কই মিলবে না এবং মেলানো যাবে না। এ ধরনের সংকট ১৯৪৭ থেকে এ পর্যন্ত বহুবার হয়েছে। আমাদের ‘তথাকথিত বানোয়াট ইতিহাসের’ লেখক বা ফরমায়েশি ইতিহাসবিদ অথবা জনগণের সঙ্গে সম্পর্কহীন বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠী সব সময় এ বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। মনে হয়, বাংলাদেশের ইতিহাস শুরু হয়েছে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর থেকে। এখানে ১৯৪৭ নেই; ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৯, ৭০ এবং মুক্তিযুদ্ধের আলোচনা অনুপস্থিত।
আমরা আলোচনা করছি ২০২৪-এর জুলাই নিয়ে। বহু মানুষের এমনকি, আমিও মনে করি—২০২৪-এর জুলাই একটি বিপ্লব। হতে পারে বিপ্লবের সূচনা বা প্রথম ধাপ। এটা শুধু অন্যান্য সাধারণ গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে তুলনা করাটা কোনোক্রমেই উচিত হবে না। দ্বিতীয় বিষয় হলো, এটি কেন বিপ্লব, তার কারণ ব্যাখ্যা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-শ্রমজীবী-কৃষক-গ্রামীণ মানুষসহ সর্বস্তরের অর্থাৎ অধিকাংশ জনগোষ্ঠীই অংশগ্রহণ করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলতে চাই, জুলাই বিপ্লবে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ২৮৪ জন শ্রমজীবী শহীদ হয়েছিলেন। শিক্ষার্থী বা ছাত্র ২৬৯ জন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ১২০ জন, চাকরিজীবী ১০৮ এবং অন্যান্য ২৯ জন। (প্রথম আলো, ২০ জুলাই ২০২৫)। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৮৪৪ জন শহীদ হয়েছেন; কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। শুধু ১৩৩টি শিশু নিহত হয় এই জুলাইয়ে।
তাহলে যারা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে (পতিত ফ্যাসিবাদ ও বড় একটি রাজনৈতিক দল) শুধু ছাত্র ও তরুণদের ‘লাফালাফি’ বলে জুলাই বিপ্লবকে ছোট করে, হেলা করছে—সে তারাই ইতিহাস বিকৃতির ‘মহাধান্ধাবাজ’ ও ‘মহামানব’।
এক কথায় বলা প্রয়োজন যে, জুলাই বিপ্লবে বিএনপিসহ কোনো দল সরাসরি যুক্ত হয়নি, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই বলেছেন—“আমরা খুব দ্ব্যর্থ কণ্ঠে বলতে চাই, এই আন্দোলনের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা সরাসরি জড়িত। আমরা এই আন্দোলনের সঙ্গে কখনোই সরাসরি জড়িত নই। আমরা তাদের নৈতিক সমর্থন দিয়েছি। সেই সমর্থন আমরা দিয়েই যাব।” (প্রথম আলো অনলাইন, ১৭ জুলাই ২০২৪)
এখানে এ-ও বলা প্রয়োজন যে, ফরাসি বিপ্লবের যে তাত্ত্বিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তিভূমি ছিল—দুর্ভাগ্যক্রমে জুলাই বিপ্লবে সে ধরনের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক আনুষ্ঠানিক সমর্থন বা ভিত্তিভূমি ছিল না। ফরাসি বিপ্লবে যেমন ভলতেয়ার, জ্যঁ জঁ রুশো, মতোকুর মতো দার্শনিকদের অবদান ছিল। ঠিক উল্টোটা ঘটেছে বাংলাদেশে। একজন অতি বিশালকায় অধ্যাপক এবং বুদ্ধিজীবী জুলাই ২০২৪-এর ঠিক আগেই বললেন, ‘ছাত্র-জনতার এই আন্দোলন সফল হবে না।’ কিন্তু মানুষ তাদের কথা গ্রাহ্য করেনি। সামনে এগিয়ে গেছেন। এটাই দুর্ভাগ্য এই বুদ্ধিজীবীদের।
এখানে শিক্ষার্থী বা ছাত্রদের ও তরুণদের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা খুবই প্রাসঙ্গিক। শিক্ষার্থী ও তরুণরা ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছেন। তারা জোরালো এবং দৃঢ়ভাবে না দাঁড়ালে জুলাই বিপ্লব সফল হতো না—এটাও ঠিক। কিন্তু সর্বস্তরের জনগণ তাদের বিশ্বাস করেছেন, আস্থায় নিয়েছেন। এখানে অবশ্যই বলা প্রয়োজন যে, যাদের ওপরে বা বড় দলটির ওপরে মানুষের সীমাহীন আস্থা ছিল; কিন্তু তারা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা রাখেতে পারেনি। এর কারণও আছে। তারা আন্দোলনকে সুসংগঠিত করতে পারেনি। দলীয় প্রধান ব্যক্তি খালেদা জিয়াকে যেভাবে হেনস্তা করেছে ফ্যাসিস্ট সরকার, তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ২০১৪ ও ২০১৮-তে কার্যকর প্রতিরোধের জন্য ঢাকা ও তৃণমূল নেতৃত্ব ও কর্মীরা প্রস্তুত থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি। আর অন্যান্য দল হয় নিশ্চুপ থেকেছে অথবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে। এই বিশাল শূন্যতার ঘাটতি পূরণ করেছেন শিক্ষার্থী তরুণরা। কারণ তাদের ক্ষোভ ছিল ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়’ তাদের ওপরে কী আচরণ করা হয়েছিল? ওই সময়েও কোনো রাজনৈতিক দল এতে কার্যকর সমর্থন দেয়নি। আর বাম নামধারী দলগুলো ফ্যাসিস্ট সরকারের সঙ্গে ১৪ দলের নামে আঁতাত করেছে। আর জামায়াতও কার্যত নিরুত্তাপ ছিল। ইসলামী দলগুলো শাপলা চত্বরের ধাক্কা এবং জঙ্গিবাদের বয়ান দিয়ে ফ্যাসিস্ট অত্যাচারে একেবারে চুপচাপ হয়ে পড়েছিল।
আমরা ছাত্র ও তরুণদের বিষয়ে আলোচনা করে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি—তা হচ্ছে, জুলাই বিপ্লবে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল ‘অনুঘটকের’। তাদের ওপর নীরব জনগোষ্ঠী, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাই বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন করতে পেরেছিলেন—এটাই জুলাই বিপ্লবের বড় এবং প্রথম সাফল্য। এখানে জুলাই হত্যাকাণ্ডের আরেকটি দিকের প্রতি দৃষ্টি দিতে পারি। তা হলো, জুলাই বিপ্লবে শুধু ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই নন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই একপর্যায়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামকের কাজটি করেছিলেন। যে হিসাবটি দেওয়া হয়েছে—তাতে ২৬৯ জন ছাত্র বা শিক্ষার্থী শহীদ হন, যাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, জুলাই ২০২৪ বিপ্লবে সত্যিকার অর্থে কতজন জীবন দিয়েছেন, তার সঠিক কোনো তথ্য নেই। সরকারি গেজেটে ৮৪৪ জন বলা হলেও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী শহীদের সংখ্যা ৯৮৬ জন। যাদের মধ্যে ১১৮ জন অজ্ঞাতপরিচয়। (তথ্যটি প্রকাশিত হয় ২৪ অক্টোবর ২০২৪)। তাদের মধ্যে সাংবাদিক, নারী, শিশুও রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের স্বাস্থ্য সাব-কমিটি জুলাই বিপ্লবে ১৫৮১ জনের মৃতের তালিকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এসব তালিকা সঠিকভাবে ছাত্র, শ্রমিক, চাকরিজীবীদের হিসেবেই প্রাধান্য পেয়েছে। নারী ও সাধারণ মানুষের সংখ্যা এখানে প্রায় অনুল্লেখ্য। এসব হিসাব এ কারণেই দেওয়া হয়েছে যে, কতটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছে এবং হচ্ছে জুলাই ২০২৪ নিয়ে। পরিষ্কার করা দরকার, জুলাই ২০২৪ অর্থ জুলাই ও আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত।
জুলাইয়ের যে মূল আলোচনা—তার আগে দীর্ঘ ভূমিকা এখানে জরুরি এবং প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে, এর ইতঃপূর্বেকার গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লবগুলোকেও ‘হত্যা’ করে সামান্য বিষয় বলে হেলাফেলা করা হয়েছে বারবার। রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক দল, সুবিধাভোগী সামরিক-বেসামরিক আমলা গোষ্ঠী এবং পরজীবী করপোরেট এবং সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী—যাকে ‘অলিগার্কি’ (Oligarchy) বা গোষ্ঠীতন্ত্র বা মুষ্টিমেয়তন্ত্র বলা হয়, তারা বারবার বিপ্লবকে হত্যা করেছে এবং জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। এবারও তার অন্যথা হয়নি। জুলাই ২০২৪ এখন ‘নিহত বিপ্লব’, পূর্বের অনেকবারের মতো। সবচেয়ে বিপজ্জনক হচ্ছে—এই বয়ানে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র; আর অন্য গোষ্ঠীগুলো তো আছেই। বিশ্বখ্যাত মার্কসীয় রাজনৈতিক চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির মতে, ‘আমলাতন্ত্র সবচেয়ে বিপজ্জনকভাবে লুকিয়ে থাকা রক্ষণশীল শক্তি। গণসদস্যদের থেকে নিজেদের স্বাধীন মনে করা আমলাতন্ত্র যদি একটি আঁটসাঁট চক্র গড়ে তুলতে পারে, তাহলে দল হয়ে ওঠে খাপছাড়া অতীতমুখী। প্রচণ্ড সংকটের সময়ে দল তার সামাজিক বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সমস্যাগুলো ছেড়ে যায় মাঝ আকাশে।... মানুষ সাধারণত আমলাতান্ত্রিক উপাদানের প্রতি গুরুত্ব এড়িয়ে যায়। বেসামরিক-সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই।... একই সঙ্গে তারা সামাজিক স্তরের কথাও ভুলে যায়। (আন্তোনিও গ্রামসি; রাষ্ট্র ও জনসমাজ: Antonio Gramsci; state and civil society) বাংলা ভাষান্তর, গৌরাঙ্গ হালদার, page-19)
বাস্তবে অলিগার্কিকে একটি গভীর সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আর এটি ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদকে একটি অতিক্ষুদ্র বা মুষ্টিমেয়—যারা কি না এলিট শ্রেণি—তাদের হাতে কেন্দ্রীভূত করে। এরা সমাজে বৈষম্য এবং গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ন করে। আর এরাই নীতিনির্ধারক এবং বিপ্লবসহ জনআকাঙ্ক্ষাকে হত্যা করে ও কবর দেয়। (চলবে)
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক