

সাধারণভাবে মনে হতেই পারে যে, যে দেশ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা পৃথিবীর শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে একটি, যে দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ নিয়মিত খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং যে দেশের ১০ শতাংশেরও বেশি মানুষ চরম পুষ্টিহীনতার শিকার (জাতিসংঘ প্রতিবেদন, আগস্ট ২০২৫), সে দেশের সাধারণ মানুষ খাদ্যগ্রহণ সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে—সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও পুষ্টিঘাটতিতে ভোগা দেশগুলোরই বরং বেশি করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা উচিত, যেন কম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমেও তারা টিকে থাকতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান শুধু পশ্চাৎসারিতেই নয়; পশ্চাৎপদদের মধ্যেও আবার অধিকতর পশ্চাৎপদ। উদাহরণস্বরূপ স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার (ল্যাট্রিন) ব্যবহারের কথাই উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে যেটির অবস্থা বলতে গেলে এখনো অনেকটাই শোচনীয়। তার মধ্যে আবার অধিক শোচনীয় হচ্ছে গণশৌচাগার পরিস্থিতি।
ইউএসএআইডির ‘ফিড দ্য ফিউচার নিউট্রিশন অ্যাকটিভিটি’-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাত্র ৩৯ শতাংশ মানুষ নিরাপদ টয়লেট ব্যবহার করে। অর্থাৎ, এখনো এ দেশের ৬১ শতাংশ মানুষ নিরাপদ টয়লেট ব্যবহার সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ খোলা আকাশের নিচে মলত্যাগকারী মানুষের সংখ্যা দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে গেছে। প্রথম তথ্য, অর্থাৎ, দেশের ৬১ শতাংশ মানুষের নিরাপদ টয়লেট সুবিধার বাইরে থেকে যাওয়াটা শুধু উদ্বেগজনকই নয়—একটি অতি অনুন্নত পশ্চাৎপদ আর্থসামাজিক অবস্থা ও অতিদুর্বল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থারও পরিচায়ক। এটি বাংলাদেশের মাথাপিছু গড় আয়ের সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় যে গতিতে বাড়ছে, সে তুলনায় নিরাপদ শৌচাগার ব্যবহারের সুবিধা মোটেও সে হারে বাড়েনি। শেষোক্ত এ সুবিধা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে না পারলে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির ফল অনেকটাই ফ্যাকাসে হয়ে থাকবে বৈকি!
অন্যদিকে উপরোক্ত দ্বিতীয় তথ্য, অর্থাৎ, খোলা আকাশের নিচে মলত্যাগের হার ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে আরও অধিক উদ্বেগের। কারণ, এ স্বাস্থ্যবিধিটি মেনে চলার ক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতি স্থিতিশীল হতে না হতেই তা আবার উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। অতএব বুঝতে হবে যে, এতদসংক্রান্ত উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কোথাও কোনো গলদ আছে অথবা নতুন এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা আগের পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে নতুনভাবে সমীক্ষা ও গবেষণা পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায় যে, এটি হয়তো অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সে নগরায়ণের গতি রাতারাতি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ারই অনিবার্য ফলশ্রুতি। তবে সৃষ্ট এ পরিস্থিতিকে আপাতদৃষ্টে যতটা নাজুক বলে মনে হচ্ছে, আনুষঙ্গিক তথ্যাদি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এতদসংক্রান্ত প্রকৃত অবস্থা তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল, করুণ ও ভয়াবহ।
২০১১ সালে বাংলাদেশে শহরভিত্তিক জনসংখ্যার হার যেখানে ছিল ৩১ দশমিক ১৬ শতাংশ, মাত্র এক যুগের ব্যবধানে ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ২৩ শতাংশে। কিন্তু বাংলাদেশের শহরগুলো এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে অনেকটা হঠাৎ করেই একসঙ্গে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না বা সে প্রস্তুতি তাদের এখনো নেই। এমতাবস্থায় শহরগুলো উল্লিখিত বাড়তিসংখ্যক মানুষের আবাসন, যানবাহন, পানি, জ্বালানি, পয়ঃনিষ্কাশন ইত্যাদি চাহিদা মেটাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। আর তারই প্রাকারান্তরিক ফল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রের সীমাহীন অবনতি; যার মধ্যে অত্র নিবন্ধের শিরোনামের আওতাধীন শৌচসুবিধার ক্ষেত্রে বিরাজমান দুরবস্থার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশের শহরগুলোতে গণশৌচাগার ব্যবস্থা আগেও ছিল না। ফলে এ ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে না বলে বরং বলা যেতে পারে যে, ব্যবস্থাটি কখনো গড়েই ওঠেনি; যা জনসংখ্যার মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধির ফলে সমস্যা হিসেবে এখন প্রকটরূপে আবির্ভূত হয়েছে।
দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৩২৮টি পৌরসভা এলাকা মিলেই বস্তুত বাংলাদেশের শহর, যেখানে এখন দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪২ শতাংশের বসবাস—সংখ্যার হিসাবে যা প্রায় সাড়ে সাত কোটি। শহরগুলোতে অস্থায়ী ভিত্তিতে যাতায়াতকারী মানুষের কথা বিবেচনায় নিলে এসব এলাকায় নিত্যদিনের মনুষ্য-উপস্থিতি আরও প্রায় দেড় কোটি যুক্ত হবে। অর্থাৎ, শহরগুলোর দৈনন্দিন উপস্থিত জনসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটি। এর মধ্যে রাস্তাঘাটে চলাচলকারী মানুষের সংখ্যা যদি মোট উপস্থিত জনসংখ্যার অর্ধেক; অর্থাৎ, সাড়ে চার কোটিও হয়, তাহলেও সেটি এক বিশাল সংখ্যা। কিন্তু নিত্যদিন পথেঘাটে চলাচলকারী এ সাড়ে চার কোটি মানুষের শৌচাগার সুবিধার কথা নিয়ে দেশের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো কি সত্যি সত্যি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে কিছু ভাবছে? বড় শহরগুলোতে মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গণশৌচাগার তৈরি করা হয়েছে বটে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা এতটাই অপ্রতুল এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা এতটাই দুর্বল যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো থাকা বা না থাকার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য তৈরি করতে পারছে না। বরং, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলো নতুন করে রাস্তাঘাটকে দূষিত ও স্বাভাবিক চলাচলের অযোগ্য করে তুলছে।
আসলে গণশৌচাগার নির্মাণ ও তা রক্ষণাবেক্ষণের ধারণাটি বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনাবিদ, নগর প্রশাসক ও জনপ্রতিনিধিদের চিন্তার সংস্কৃতিতে সেই আদি থেকেই নেই। সে ধারায় এখনো সেটি প্রায় একইভাবে অনুপস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি নির্মিত মেট্রোরেলের কথাই ধরা যাক। মেট্রোরেলের স্টেশন সন্নিহিত এলাকাগুলোতে গণশৌচাগার নির্মাণের চিন্তা না ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড করেছে, না এ নিয়ে সিটি করপোরেশন কিছু ভেবেছে! সিটি করপোরেশন বা পৌরসভাগুলো নতুন সড়ক নির্মাণের সময় যেমন এ নিয়ে ভাবে না, তেমনি ভাবে না বিদ্যমান সড়কের পাশে এগুলো নতুন করে নির্মাণ করার সময়ও। এ ক্ষেত্রে দুটি প্রধান সমস্যার একটি হচ্ছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রে শহরভিত্তিক সমাজের অভিজ্ঞতা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে একটি নগররাষ্ট্রে কী ধরনের নাগরিক সুবিধাদি গড়ে তুলতে হয় এবং কীভাবে সেগুলো কাজ করতে পারে, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত প্রণেতাদের চিন্তায় তা একেবারেই নেই। দ্বিতীয়ত, এসব বিষয়ে আবদ্ধ কক্ষ বসে যারা নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, পথেঘাটে চলাচলকারী নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের ন্যূনতম পর্যায়ের কোনো মমতাও নেই।
নইলে ভাবুন তো নিত্যদিন যারা গ্রাম থেকে বাসে-ট্রেনে-ট্রাকে-ভ্যানে চড়ে শহরে এসে পণ্য বিক্রি করে সন্ধ্যায় গ্রামে ফিরে যান—এই মধ্যবর্তী সময়ে তারা তাদের শৌচাগারের প্রয়োজনগুলো কোথায় কীভাবে সারবেন? দূর-দূরান্ত থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তার অভিভাবক, চাকরিপ্রার্থী যুবক, অফিস-আদালতে তদবির করতে বা হাজিরা দিতে আসা ব্যক্তি, রিকশা ও অনুরূপ যানবাহনের চালক—ঘরের বাইরে থাকা এসব মানুষইবা উল্লিখিত প্রাকৃতিক প্রয়োজনগুলো মেটাবেন কেমন করে? আসলে আমরা এমন এক অমানবিক সমাজের মধ্যে বসবাস করছি, যেখানে অধিকতর অমানবিক হচ্ছে আমাদের শহরগুলো। আর সে অমানবিক শহরের নিষ্ঠুরতম মানুষগুলো হচ্ছে আমাদের নীতিনির্ধারক ও সিদ্ধান্ত প্রণেতারা, যারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের বাইরে আর কিছুই দেখতে পান না—সাধারণ মানুষের ন্যূনতম প্রাকৃতিক প্রয়োজনের মতো বিষয়গুলো তো নয়ই।
তারপরও ওই শহরগুলোর পথেঘাটে চলাচলকারী নিম্নবিত্ত মানুষের ন্যূনতম মানবিক প্রাকৃতিক প্রয়োজনের কথা ভেবে এখানে স্বল্পব্যয়ী কতিপয় প্রকল্প ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রস্তাব তুলে ধরছি। এক. ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ১৩টি সিটি করপোরেশন এলাকার প্রতিটিতে ২০০ করে মোট ২ হাজার ৬০০ আধুনিক শৌচাগার নির্মাণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর কর্তৃক এখনই একটি ডিপিপি প্রণয়ন করে তার অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু করা হোক। দুই. একইভাবে একই অর্থবছরের আওতায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ৩২৮টি পৌরসভা এলাকার প্রতিটিতে ২০টি করে মোট ৬ হাজার ৫৬০টি শৌচাগার নির্মাণের লক্ষ্যে অন্য একটি ডিপিপি প্রণয়নের কাজ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু করা হোক। তিন. ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন এলাকায় মানুষ যাতে উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগ না করে, তজ্জন্য ব্যাপক জনসচেনতা তৈরি করতে হবে এবং সেখানকার হাটবাজার ও অন্যান্য জনঘনত্বপূর্ণ এলাকায় গণশৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। চার. উল্লিখিত প্রতিটি প্রকল্পের নির্মাণোত্তর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য রাজস্ব বাজেটের আওতায় প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান রাখতে হবে। পাঁচ. ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে জনগণের মধ্যে ব্যাপকভিত্তিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
সামনেই সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সে নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের যে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করবে, সেখানে অন্য অনেক বিষয় থাকলেও নিম্নবিত্ত মানুষের স্বার্থানুকূল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে তেমন কিছু থাকবে কি না, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তারপরও কোনো কোনো রাজনৈতিক দল যদি সাধারণ মানুষের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে সেটি করে, তবে তার আওতায় তারা গণশৌচাগার নির্মাণের মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করবে বলে আশা রাখি। আসলেই বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যকাঠামো একেবারেই নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের স্বার্থের অনুগামী নয়। তারপরও যদি এসব লেখালেখি ও জনমতের চাপে সে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও বদলায়, তাহলে সেটিই হবে আপাতত অভাবী দুঃখী মানুষের ন্যূনতম সান্ত্বনা।
লেখক: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি এবং বিসিকের সাবেক পরিচালক