

প্রখ্যাত বাউলশিল্পী কারাবন্দি আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে তার ভক্ত-অনুরাগীরা মানববন্ধনের সময় যে সহিংস হামলা এবং শারীরিক নিপীড়নের শিকার হন, তা অত্যন্ত হতাশার ও উদ্বেগের। বাউল-ফকিরদের মতো নিরীহ-নিভৃতচারীদের ওপর সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়।
কালবেলাসহ অপরাপর গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, রোববার বেলা ১১টার দিকে মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার দক্ষিণ সেওতায় শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের সামনে ‘তৌহিদী জনতার’ ব্যানারে বের করা মিছিল থেকে এ হামলা হয়। এতে একাধিক ব্যক্তি আহত হন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বেশ কিছু ভিডিও। লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল দিয়ে নির্মমভাবে চড়াও হতে দেখা যায় শিল্পীর মুক্তির দাবিতে আসা অনুসারীদের ওপর একটি গোষ্ঠীর। প্রাণ বাঁচাতে একসময় তারা পানিতে ঝাঁপ দেন। সাঁতরে পার হওয়ার চেষ্টা করেন। ওই অবস্থায়ও হাতের কাছে যা পাওয়া গেছে তাই দিয়ে তাদের নিক্ষেপ করা হয়। আরও হতাশার দৃশ্য, এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে ঘটেছে। এর আগে ‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয় বাউল আবুল সরকারকে। রোববারের ঘটনার পর দেশের সব মহলে নিন্দার ঝড় ওঠে। খোদ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগের কথা জানান। গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে আবুল সরকারের মুক্তির দাবি জানান নিজ নিজ পেশায় সুপরিচিত দেশের ২৫৮ নাগরিক। তারা ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, মব সন্ত্রাস, ভাঙচুর ও গ্রেপ্তারেরও তীব্র সমালোচনা করেন। এর আগে শুক্রবার শিল্পীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘সম্প্রীতি যাত্রা’। গতকাল সোমবার ঘটনার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করে সাধুগুরুভক্ত ও ওলি-আউলিয়া আশেকান পরিষদ।
আমরা মনে করি, কোনো অপরাধের বিচারের দায়িত্ব আম-জনতা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে তুলে নেওয়া অপরাধ। স্মরণে রাখতে হবে, যে কোনো অপরাধের জন্য দেশে আইন-আদালত-বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। সবার উচিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্মান করা। পরিতাপের বিষয়, সম্প্রতি দেশে একটি গোষ্ঠী সংগীত, নারীর পোশাক নিয়ে হেনস্তা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করা, মাজার-দরগা-বাউল-ফকিরদের আখড়া-আস্তানার ওপর সহিংস হয়ে উঠেছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় ধরলে দেশে বিরাটসংখ্যক মাজার-দরগা ভাঙচুর, তথা ধ্বংস করা হয়েছে। এ প্রবণতা যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পথে প্রতিবন্ধক—তা বলাই বাহুল্য। কেননা, গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই ভিন্ন মত ও পথের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন, বৈচিত্র্যকে ধারণ করা। জুলাই অভ্যুত্থানে ছিল সমাজের এ বহুত্বকে ধারণ করার স্পিরিট। অত্যন্ত বেদনার বিষয়, একটি গোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে সে স্পিরিটের বিরুদ্ধতা করে চলেছে। উল্লেখ্য, এসব ঘটনায় অপরাধীদের কারও বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির এখন অবধি নেই। বরং, হামলার শিকার ব্যক্তিরাই উল্টো হয়রানি ও মিথ্যা মামলার মুখোমুখি হয়েছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে। আমরা বিস্মৃত হইনি, এসব নিপীড়নের ঘটনা আগেও ঘটেছে। বিগত সময়, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনেও তাদের ওপর নানা অত্যাচার এবং গ্রেপ্তারের ঘটনা রয়েছে।
আমাদের প্রত্যাশা, সহিংস হয়ে ওঠা এ গোষ্ঠীর তৎপরতা থামাতে কঠোর অবস্থান নেবে সরকার ও সংশ্লিষ্টরা। এটা শুধু আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থেই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে দেশে সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতেই সরকারকে এ অবস্থান নিতে হবে। পাশাপাশি শিল্পী আবুল সরকারকে ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি যেন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছে, সে বিষয়ে হতে হবে আন্তরিক।