

ফুটপাত হলো রাস্তার পাশের সেই নির্দিষ্ট অংশ, যা মূলত পথচারীদের নিরাপদে হাঁটার জন্য তৈরি করা হয়। শহরের মানুষ যেন সহজে ও নিরাপদে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে, সে জন্য ফুটপাতের ব্যবস্থা। কিন্তু দেখা যায়, ফুটপাতে বসে ব্যবসা করা বা দোকান করার সুযোগ দেওয়ার নামে অবৈধভাবে টাকা আদায় করে একটি চক্র। হকার বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জীবিকার তাগিদে ফুটপাতে দোকান বসান। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা চক্র তাদের ভয় দেখিয়ে, উচ্ছেদ করার হুমকি দিয়ে কিংবা নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলে নিয়মিত টাকা আদায় করে। এ টাকা কোনো বৈধ ফি নয়; বরং চাঁদাবাজি। এতে করে বাধাগ্রস্ত ও ভোগান্তির শিকার হতে হয় সাধারণ পথচারীকে।
ফুটপাতে চাঁদাবাজি মূলত নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, দারিদ্র্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ফল। আইন প্রয়োগ ও তদারকির ঘাটতির কারণেও ফুটপাতে চাঁদাবাজি বাড়ে। নিয়মিত নজরদারি না থাকলে বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকলে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড সহজেই গড়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি বা রাজনৈতিক প্রশ্রয় চাঁদাবাজদের আরও শক্তিশালী করে তোলে। এ ছাড়া শহরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় গ্রাম থেকে আগত দরিদ্র মানুষ ফুটপাতকেই জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়। ফুটপাতে চাঁদাবাজি ধীরে ধীরে একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশে পরিণত হয়, যেখানে আইন ও নৈতিকতার বদলে শক্তি ও প্রভাবই নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ফুটপাতে চাঁদাবাজি হয় সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্মিলিত ফল হিসেবে।
চাঁদাবাজি বন্ধে সাধারণ নাগরিক ও সরকারের সম্মিলিত দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এককভাবে কোনো পক্ষের উদ্যোগে এ সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। সাধারণ নাগরিকদের প্রথম দায়িত্ব হলো সচেতন হওয়া এবং অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা। ফুটপাতে চাঁদা আদায় বা অবৈধ দখলদারি দেখেও নীরব থাকা চাঁদাবাজদের সাহস বাড়িয়ে দেয়। তাই নাগরিকদের উচিত এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিবাদ গড়ে তোলা, স্থানীয় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দেওয়া এবং সম্ভব হলে গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। পাশাপাশি হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে চাঁদা না দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে এবং আইনি সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
সরকারের দায়িত্ব আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করা। ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় উচিত সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা যেন হকারদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা ও বৈধ লাইসেন্স ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সক্রিয় ও জবাবদিহির আওতায় এনে চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে কোনো দুর্নীতি বা প্রশ্রয়ের সুযোগ থাকলে তা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনমূলক কর্মসূচি জোরদার করাও সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যেন মানুষ বাধ্য হয়ে ফুটপাতে অনিয়মিতভাবে জীবিকা নির্বাহে না নামে। সরকারের কঠোর আইন প্রয়োগ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা কার্যকর হলে ফুটপাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব।
মাহমুদুল হাসান শোভন
শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ